১৯ অগাস্ট ২০২৬, বুধবার, ০৫:৪১:০৪ অপরাহ্ন


দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি নিরাপত্তার পথনকশার চ্যালেঞ্জসমূহ
সালেক সুফী
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৯-০৮-২০২৬
দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি নিরাপত্তার পথনকশার চ্যালেঞ্জসমূহ


এসডিজি ৭ সংজ্ঞায়িত হয়েছে ‘সবার জন্য ২০৩০ নাগাদ সহনীয় মূল্যে, নির্ভরযোগ্য দীর্ঘস্থায়ী, সার্বক্ষণিক এবং আধুনিক জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ অধিকার নিশ্চিত করা’। সাধারণ গ্রাহকরা যদি প্রশ্ন করা বাংলাদেশের জ্বালানি বিদ্যুৎ মূল্য কি সবার জন্য সহনীয়? জ্বালানি, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা কি মানসম্পন্ন, নির্ভরযোগ্য? জ্বালানি বিদ্যুৎ সরবরাহ কি সার্বক্ষণিক বা নির্ভরযোগ্য? জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা কি আধুনিক? ২০২৬ শেষ প্রান্তিকে এসে কোনো প্রশ্নের কিন্তু ইতিবাচক জবাব মিলবে না। জ্বালানি সরবরাহ এবং তৎপরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতিতে চলছে সরব দুর্ভিক্ষ। অথচ প্রতিদিন প্রিন্ট আর ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় তথাকথিত জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের নানা অম্ল মধুর বয়ান। সরকারের মন্ত্রী, সাংসদরা নানা আশ্বাস।

দেশের গ্রিড সংযুক্ত বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা কাগজে কলমে ২৯, ৫৯৩ মেগাওয়াট। এ ক্ষমতা প্রকৃতপক্ষে প্লেট সক্ষমতার যোগফল মাত্র কখনো পরীক্ষা করে প্রমাণ করা হয়নি, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ওয়েব সাইটের তথ্য অনুযায়ী গ্রিড নন গ্রিড মিলিয়ে মোট ক্ষমতা ৩৩ হাজার ৯২ মেগাওয়াট। এই যাবৎ ২০ মে রাতে কয়েক ঘণ্টার জন্য সর্বোচ্চ উৎপাদন রেকর্ড করা হয় ১৭ হাজার ২০১ মেগাওয়াট। ভর গ্রীষ্মে গড় চাহিদা থাকে ১৭০০০-১৭৫০০ মেগাওয়াট। তাপ দাহ হলে চাহিদা ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট পৌঁছে। কিন্তু দীর্ঘদিন থেকেই শুনে আসছি প্রাথমিক জ্বালানি বিশেষত গ্যাস, কয়লা তরল জ্বালানি সরবরাহ সংকটে এবং ক্ষেত্রবিশেষে বিদ্যুৎ সঞ্চালন এবং বিতরণ ব্যাবস্থার কারিগরি সীমাবদ্ধতায় কখনো বাংলাদেশ সুনিশ্চিত টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তার ছিটেফোঁটাও অর্জন করতে পারেনি? বর্তমানে নানা কারণে প্রাথমিক জ্বালানি সংকট চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ার আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। দেশের প্রধান প্রাথমিক জ্বালানি প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রমাণিত মজুত দ্রুত নিঃশেষ হতে চলেছে। জাতীয় সংসদে বেশ কয়েক বছর আগেই ঘোষণা করা হয়েছে দ্রুত কোনো বড় ধরনের গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে উৎপাদনে আনা না গেলে ২০৩১ নাগাদ প্রমাণিত গ্যাস মজুত সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যাবে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী গ্যাসের বর্তমান দৈনিক সরবরাহ (১১-১২ আগস্ট) ছিল ২১০৯,৬০ মিলিয়ন ঘনফুট। ওইদিন গ্যাস চাহিদা যদি পেট্রোবাংলার সংরক্ষণবাদী তথ্যকেই মেনে নিই ছিল ৩৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সবাই জানে ওইদিনে দুর্ঘটনার কারণে কারিগরি ত্রুটি হওয়ায় কক্সবাজার উপকূলে থাকা দুটি ভাসমান টার্মিনালের একটি থেকে সরবরাহ স্থগিত ছিল। জানা আছে, দুটি ভাসমান টার্মিনালের একসঙ্গে সক্রিয় থাকলেও ১০৫০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ সম্ভব। সেই ক্ষেত্রে পেট্রোবাংলার পক্ষে সর্বোচ্চ ২৬৫০-২৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা সম্ভব। প্রতিবেদক বাংলাদেশ গ্যাস সরবরাহ চেনের হাড়ির খবর জেনে নিশ্চিত করতে পারি গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা কোন অবস্থায় ২০৩০-এর আগে উন্নত করার সম্ভাবনা নেই। সে ক্ষেত্রে ২০২৭-২০৩০ বাংলাদেশ গ্যাস বিদ্যুৎ চলমান সংকট থেকে মুক্তির কোনো উপায় দেখছি না।

অনেকেই বলছে আইএসও ভেসেল নামের ক্রায়োজেনিক ভেসেল দিয়ে আপাত কালীন ব্যবস্থা গ্রহণ। এ ব্যবস্থা বিষয়ে কম বেশি ধারণা থাকায় নিশ্চিত করতে পারি বাংলাদেশের চলমান গ্যাস সংকট মোকাবিলায় এটি কোনোভাবেই মোক্ষম দাওয়াই নয় আর বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান আর উপকূলের অগভীরতার কারণে একমাত্র মহেষখালী আর মাতারবাড়ী ছাড়া দ্রুত (অন্তন্ত তিন বছর) নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করে গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ নেই। সরকার দেখলাম মোংলা, হিরণ পয়েন্ট এবং পায়রায় টার্মিনাল স্থাপনের কথা ভাবছে। পায়রায় সাগর চ্যানেলে গভীরতার অপর্যাপ্ততার কারণে কয়লা পরিবহনে সংকট হচ্ছে। মাঝারি ক্ষমতার কয়লার জাহাজ অর্ধেক পূর্ণ করে আমদানি করায় বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এক্সসেলারেট এনার্জি পায়রা উপকূল থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে ভাসমান টার্মিনাল (এফএলএনজি) টার্মিনাল স্থাপন করে সাবসি পাইপলাইনের মাধ্যমে আর এলএনজি সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছিল। ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার অগ্রবর্তী অবস্থায় থাকা সেই প্রস্তাব বাতিল করে দিয়েছিল। সামিট এনার্জির সঙ্গে তৃতীয় ভাসমান টার্মিনাল স্থাপন চুক্তি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে বাতিল না হলে ২০২৭ মাঝামাঝি নাগাদ ৫০০ মিলিয়ন অতিরিক্ত আর এলএনজি জাতীয় গ্রীডে সঞ্চালিত হতো। এখন একটি চীনা কোম্পানির সঙ্গে একটি এফেসারু স্থাপনের প্রাথমিক চুক্তি করার সিদ্ধান্ত মিলেছে। ২০২৬ শেষ বা ২০০২৭ বাস্তবায়ন শুরু হলেও ২০২৯ শেষ অথবা ২০৩০ শুরু ছাড়া এলএনজি পাওয়া সম্ভব বলে মনে হয় না। আর চাইলেই নানা কারিগরি পরীক্ষা ছাড়া যেখানে সেখানে ভাসমান অথবা ভূমিভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সুযোগ নেই। তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম পায়রা, মোংলা বা হিরণ পয়েন্টে দৈব দক্ষতায় এলএনজি টার্মিনাল স্থাপিত করা, সেখান থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ অবকাঠামো গড়ে তোলার অর্থ, সামর্থ্য বর্তমান মুহূর্তে নেই বাংলাদেশের। তাই উচিত সঠিক যাচাই-বাছাই করে মহেশখালী মাতারবাড়ী চ্যানেলে দক্ষ অভিজ্ঞ বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে অন্তত দুটি এফেসারু স্থাপন চুক্তি সম্পাদন এবং জিটিসিএলের মাদ্ধমে ২০৩০ নাগাদ মহেশখালী থেকে তৃতীয় সমান্তরাল গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণ।

স্মরণে রাখতে হবে চালু গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইনের পাশে উচ্চচাপ পাইপলাইন নির্মাণ করতে হলে ন্যূনতম ১০ মিটার ব্যাবধান রাখা গ্যাস নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক। ২০৩০ নাগাদ প্রস্তাবিত এলএনজি টার্মিনাল ব্যবস্থা থেকে সুফল পেতে হলে এখনই এই কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার ভিত্তিক জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের স্বীকৃতি দিয়ে ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম শুরু করা উচিত। পাইপলাইনের পথস্বত্ব অধিগ্রহণ, অধিযাচনের সমান্তরালে চলতে পারে নির্মাণ উপকরণ ক্রয় এবং ঠিকাদার নিয়োগ পরিকল্পনা। আর কাজটি অত্যাবশ্যকীয়ভাবে সম্পাদন করতে হবে জিটিসিএলের মাধ্যমে। উচ্চচাপ গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণ এবং অপারেশন ছেলে খেলা নয় যে, রাম শ্যাম যদু মধুদের দায়িত্ব দেওয়া হবে। এটি ভাবনারও কোনো সুযোগ নেই।

আমি বর্তমান সরকারকে পরামর্শ দেবো গ্যাস ব্যবহারের কৌশলে কিছু সাহসী, কিন্তু অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের। বর্তমানে ১২-১৩ শতাংশ গ্যাস রান্নার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। ১ বছর সময় দিয়ে গৃহস্থালি কাজে গ্যাস ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে হবে আর এ সময়ে দেশব্যাপী বিকল্প জ্বালানি এলপিজি, বিদ্যুৎ চুলা, সৌর চুলা ব্যবহারে সরকার কর্তৃক প্রণোদনা দিতে হবে। আমি সুপারিশ করবো যানবাহনে সিএনজি ব্যবহার নিরুৎসাহিত করে বিকল্প জ্বালানি অটোগ্যাস ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি। ২০৩০ থেকে যানবাহনে সিএনজি ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

দেশে তরল জ্বালানি ব্যবহার কমানোর জন্য বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে, সড়ক পরিবহনে বৈদ্যুতিক বাহন এখন বাস্তবতার খাতিরে অপরিহার্য। এ ব্যাপারে দ্রুত আইন প্রণয়ন করে বিদ্যুৎচালিত যানবাহনগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। দেশব্যাপী সৌর বিদ্যুৎভিত্তিক চার্জিং স্টেশন স্থাপন করে ২০৩০ নাগাদ ৩০ শতাংশ এবং ২০৪০ নাগাদ ৭০ শতাংশ যানবাহনকে বৈদ্যুতিক বাহনে পরিবর্তন করার টার্গেট নির্ধারণ করতে হবে। মেট্রোরেলের মতো সব রেল চলাচল ২০৩৫ নাগাদ বিদ্যুতে রূপান্তর করা যেতে পারে। একটি সঠিক বিজনেস মডেল তৈরি করে ১০ বছর মেয়াদে সেচপাম্প সৌরবিদ্যুতে রূপান্তর করা সম্ভব।

উপরের প্রস্তাবগুলো প্রণয়ন যত সহজ বর্তমান আমলা নিয়ন্ত্রণে দূষিত জ্বালানি বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় ততই কঠিন। ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক সংস্কার করে সঠিক ব্যক্তিদের সঠিক স্থানে পদায়ন করে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ নিশ্চিত না হলে বাংলাদেশ জ্বালানি বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা এসডিজি টার্গেট অর্জন দূরের কথা অচিরে মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। সেক্ষেত্রে বিব্রত সরকারের পক্ষে ক্ষমতায় টিকে থাকা দুরূহ হয়ে পড়বে।

আমি সরকারের ১০ বছরব্যাপী সমন্বিত জ্বালানি বিদ্যুৎ পরিকল্পনা সংসদে আলোচনার মাদ্ধমে অনুমোদন চিন্তাকে সাধুবাদ জানাই। 

শেয়ার করুন