১৯ অগাস্ট ২০২৬, বুধবার, ০৫:৪০:৪৩ অপরাহ্ন


ঢাকায় বসবাসযোগ্যতার অধঃপতন দিনান্তর
বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৯-০৮-২০২৬
ঢাকায় বসবাসযোগ্যতার অধঃপতন দিনান্তর ঢাকা


ঢাকা বর্তমানে বাসযোগ্যতার নিম্নতম পর্যায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হলেও তার যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়া এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও সমন্বয়হীনতার কারণে নগরের বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)-এর উদ্যোগে “ঢাকা শহরের বাসযোগ্যতা: চ্যালেঞ্জ ও পরিকল্পিত সমাধানের পথরেখা” শীর্ষক একটি সংবাদ সম্মেলনে এই বক্তব্য উঠে আসে। 

রাজধানীর প্ল্যানার্স টাওয়ারে অবস্থিত বিআইপি কনফারেন্স হলে অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিআইপি’র সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম, বিআইপি’র উপদেষ্টা পরিষদের আহ্বায়ক এবং সাবেক সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান, স্থানিক পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ পরিকল্পনাবিদ এ. কে. এম. রিয়াজ উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান এবং বোর্ড সদস্য (ন্যাশনাল এন্ড ইন্টারন্যাশনাল লিয়াজোঁ) পরিকল্পনাবিদ তালহা তাসনিম। 

বিআইপি এর সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান ঢাকার বর্তমান বাসযোগ্যতার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ঢাকা বর্তমানে বাসযোগ্যতার নিম্নতম পর্যায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হলেও তার যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়া এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও সমন্বয়হীনতার কারণে নগরের বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বিআইপি’র সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, ঢাকার বাসযোগ্যতা নিয়ে আলোচনা করার প্রধান কারণ হলো বৈশ্বিক বাসযোগ্যতা সূচকে ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং ঢাকার নগরজীবনে এর প্রতিফলন স্পষ্ট। পরিবহন, বায়ু ও শব্দদূষণ, জলাবদ্ধতা, সবুজ ও উন্মুক্ত স্থান, জনস্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তি- এসব বিষয় সরাসরি নগর পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পর্কিত। দ্রুতনগরায়ণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিকল্পিত অবকাঠামো ও সেবা নিশ্চিত না হওয়ায় ঢাকা ক্রমেই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। পরিবহন সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যানজটে ঢাকায় প্রতিবছর প্রায় ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, যার আর্থিক ক্ষতি প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি দূর করে পুনর্ব্যবহার ও বর্জ্য থেকে শক্তি উৎপাদনের মাধ্যমে নতুন ব্যবসায়িক ক্ষেত্র সৃষ্টির সম্ভাবনা কাজে লাগানোর আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন, প্রতিদিন প্রায় ১,৭৬৫ টন (মোট উৎপাদনের প্রায় ২৭ শতাংশ) বর্জ্য সংগ্রহ ও নিষ্পত্তির বাইরে থেকে যাচ্ছে, যা রাস্তায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি এবং মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। নারী, শিশু, প্রবীণ ও ভিন্নভাবে সক্ষম মানুষের জন্য নিরাপদ ও সহজগম্য নগরসেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ঢাকার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এসময় তিনি বিআইপি’র পক্ষ থেকে সাতটি সুপারিশে বলেন, নৈতিক বা প্রশাসনিক পরিবর্তন যাই হোক না কেন, চলমান পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা রক্ষা করে তার পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক বা ব্যক্তিস্বার্থে অনুমোদিত পরিকল্পনার মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন বা বাতিল করা যাবে না। মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অক্ষুণ্ন রেখে প্রতি পাঁচ বছর পরপর পরিকল্পনাবিদ, বিশেষজ্ঞ, সরকারি সংস্থা ও স্থানীয় অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে পরিকল্পনার অগ্রগতি ও প্রতিবন্ধকতা পর্যালোচনা করতে হবে। খন্ডিত এলাকাভিত্তিক, একক খাতভিত্তিক বা স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার পরিবর্তে ভূমি ব্যবহার, পরিবহন, পরিবেশ, আবাসন ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডকে একীভূত করে সমন্বিত জাতীয় ও আঞ্চলিক স্থানিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট অনুমোদিত পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য নিশ্চিত না করে জলাভূমি, কৃষিজমি, জলাধার বা অন্যান্য পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকায় কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা যাবে না। যে কোনো উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের আগে সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনার সঙ্গে তার সামঞ্জস্যতা যাচাই করে একটি সংক্ষিপ্ত ‘পরিকল্পনা সামঞ্জস্যতা প্রতিবেদন’ (চষধহহরহম ঈড়সঢ়ষরধহপব জবঢ়ড়ৎঃ) বাধ্যতামূলকভাবে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

উন্নয়ন কার্যক্রমকে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আগামী কয়েক দশকের নগর ও আঞ্চলিক চাহিদা, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনাভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।

পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, গত ছয় মাসে নগরের বাসযোগ্যতা উন্নয়নে সরকার কার্যকর ও দৃশ্যমানভাবে কতটুকু উদ্যোগ নিয়েছে, তা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তিনি ঢাকার ফুটপাত দখল, অবৈধ ব্যবসা, চাঁদাবাজি এবং নগর ব্যবস্থাপনায় রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। খাল খনন কর্মসূচির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, খাল পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও প্রথমে খালগুলো কারা দখল করেছে এবং কীভাবে দখল হয়েছে, তা চিহ্নিত করা প্রয়োজন। তিনি ড্যাপ বাস্তবায়নে ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান এবং এ বিষয়ে পরিকল্পনাবিদদের সঙ্গে কার্যকর আলোচনা না করার বিষয়টি তুলে ধরেন। ড্যাপের ধারাবাহিকতা, পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কার্যকর নগর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, নগরের পার্ক ও খেলার মাঠ সংরক্ষণ ও উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে বাস্তব উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। তিনি বলেন, সরকারকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে, তারা এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নিয়েছে এবং ভবিষ্যতে কী পদক্ষেপ নেবে। পাশাপাশি, সরকারকে পেশাজীবী ও কল্যাণমুখী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনায় আসার আহ্বান জানান। 

পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান বলেন, গাজীপুর-ঢাকা বিআরটি দ্রুত চালু করা প্রয়োজন এবং ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থায় আরও বিআরটি রুট সংযোজন করা যেতে পারে। তিনি অন্যান্য শহরের গণপরিবহণ ব্যবস্থার উদাহরণ উল্লেখ করে বলেন, বড় ও ব্যয়বহুল প্রকল্পের পাশাপাশি ছোট কিন্তু জরুরি নগর সমস্যাগুলো সমাধানে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, বিআইপি চায় সরকার সফল হোক এবং নগরের বাসযোগ্যতা উন্নয়নে সরকারের উদ্যোগগুলো বাস্তব ফল বয়ে আনুক। তিনি আগামীতে আন্তর্জাতিক বাসযোগ্যতা সূচকে ঢাকার অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নীত করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

পরিকল্পনাবিদ এ. কে. এম. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, ঢাকার বাসযোগ্যতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেশের অন্যান্য শহরের সমস্যাগুলোকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। ঢাকার বাসযোগ্যতা কমে গেলেও মানুষ ঢাকামুখী হচ্ছে, কারণ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে কর্মসংস্থান, সেবা ও সুযোগের ঘাটতি রয়েছে। তিনি বলেন, ঢাকার সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হলে পুরো বাংলাদেশকে একটি সমন্বিত স্থানিক পরিকল্পনার আওতায় এনে স্থানিক পরিকল্পনা আইন বাস্তবায়ন করতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি বদ্বীপ রাষ্ট্র এবং দেশের বিপুল প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক সম্পদ রয়েছে। এসব সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে বিভিন্ন অঞ্চলে পরিকল্পিত উন্নয়ন ঘটাতে হবে। তিনি আরও বলেন, বৃহত্তর ঢাকার জন্য সমন্বিত নগর নেতৃত্ব প্রয়োজন, যা ঢাকাকে একটি অভিন্ন নগর হিসেবে বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিশ্চিত করবে। তিনি বলেন, অর্থনীতি ও পরিকল্পনা পরস্পরবিরোধী নয়, বরং সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমেই ব্যবসা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করা সম্ভব। তিনি উল্লেখ করেন, নগর সমস্যার সমাধানে বিআইপি’র কাছে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনাগত জ্ঞান ও সমাধানের কাঠামো রয়েছে।

পরিকল্পনাবিদ তালহা তাসনিম বলেন, পরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে একই ধরনের তথ্য বারবার সংগ্রহ করতে হয়, ফলে সময় ও সম্পদের অপচয় হয়। একটি সমন্বিত জাতীয় ডেটাবেজ থাকলে পরিকল্পনা প্রণয়ন আরও কার্যকর, দ্রুত ও কম ব্যয়বহুল হবে। তথ্যের সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ও বৃদ্ধি করা সম্ভব।

সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নোত্তর পর্বে পান্থকুঞ্জ পার্ক এলাকায় উন্নয়ন প্রকল্প বাতিল করা হলে ঢাকার বাসযোগ্যতা কতটা বাড়বে, এমন প্রশ্নের উত্তরে বিআইপি’র সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, পান্থকুঞ্জের বিষয়টি একটি বৃহত্তর পরিকল্পনাগত সমস্যার উদাহরণ মাত্র। সবুজ ধ্বংস করে উন্নয়ন করাকেই যদি উন্নয়নের স্বাভাবিক পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে ঢাকার বাসযোগ্যতা আরও কমবে। অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, মূল প্রশ্ন হলো নাগরিকদের সঙ্গে যথাযথ পরামর্শ ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করে কেন এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হচ্ছে। পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান ঠিকাদারদের সঙ্গে আলোচনা করে অল্প কিছু নীতিনির্ধারকের অনুমোদনের ভিত্তিতে প্রকল্প গ্রহণ করাকে ‘প্ল্যানিং ফ্যাসিজম’ হিসেবে উল্লেখ করেন। পরিকল্পনাবিদ এ. কে. এম. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, ঢাকার কার্যকর ও জনবান্ধব গণপরিবহণ ব্যবস্থা উন্নত করা গেলে বড় ও ব্যয়বহুল সড়ক অবকাঠামো প্রকল্পের প্রয়োজন কমে আসত। 

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, ঢাকার বাসযোগ্যতা সংকট পরিবেশ, ভূমি ব্যবহার, পরিবহন, জনস্বাস্থ্য, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নগর পরিচালনার পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত সমস্যার ফল। তাই দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় ও আঞ্চলিক স্থানিক পরিকল্পনার আওতায় সমন্বিতভাবে এসব সমস্যার সমাধানের পাশাপাশি পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা, জবাবদিহিতা, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা নিশ্চিত করতে হবে।

শেয়ার করুন