১৯ অগাস্ট ২০২৬, বুধবার, ০৬:৬:১১ অপরাহ্ন


বিএনপি সরকারের প্রথম ৬ মাসের হালখাতা
বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৯-০৮-২০২৬
বিএনপি সরকারের প্রথম ৬ মাসের হালখাতা


দীর্ঘ দেড় দশকের রাজনৈতিক পরিবর্তন ও রূপান্তরের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত বিএনপি সরকারের প্রথম ১৮০ দিন বা ৬ মাস পূর্ণ হয়েছে। এ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও প্রেস উইংয়ের উদ্যোগে ‘জনগণের সরকারের ১৮০ দিন’ শীর্ষক একটি তথ্যনির্ভর ই-বুক প্রকাশিত হয়েছে। এই ছয় মাসের কার্যক্রম, সাফল্য-ব্যর্থতা, জনসন্তুষ্টি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনের মূল্যায়ণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। 

এ সরকারের প্রথম ৬ মাসে যে হালখাতা তৈরি হয়েছে, এরমধ্যে যেটা ছিল লক্ষ্যণীয় তা হলো- দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে একটি গণতান্ত্রিক ধারা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদীহী ফেরানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চা এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা প্রদর্শনেরে ক্ষেত্রে সরকার কিছু ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ বাহিনী পুনর্গঠন, চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান এবং সুনির্দিষ্ট কিছু চাঞ্চল্যকর মামলার দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা স্পষ্ট। 

মাঠপর্যায়ে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ এবং বিগত আমলের প্রভাবশালীদের পুনর্বাসন ঠেকানো অনেক ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পুরোপুরি গুণগত পরিবর্তন আনতে দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজন, যা এই স্বল্প সময়ে পুরোপুরি দৃশ্যমান নয়।

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণসাফল্য

অর্থনীতিকে গতিশীল করতে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় সরকার কিছু সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে। ই-বুকের তথ্য অনুযায়ী, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড চালুর মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী জোরদার করা হয়েছে। কৃষিঋণ মওকুফ এবং নবম জাতীয় বেতন স্কেলের ঘোষণা সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে স্বস্তি এনেছে। ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং পুরোনো সিন্ডিকেট ভাঙতে কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন আয়ের সাথে ব্যয়ের সামঞ্জস্য বিধান করা এখনো একটি বড় সংকট। শিল্পকারখানায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি এবং কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নতুন বিনিয়োগ না হওয়ায় অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার গতি মন্থর রয়েছে।

বৈদেশিক সম্পর্ক ও কূটনীতিসাফল্য

বৈদেশিক সম্পর্কে ভারসাম্য এবং সমতার নীতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে সরকার পরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছে। আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষা, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং পুশ-ইন প্রতিরোধের ক্ষেত্রে কঠোর কূটনৈতিক অবস্থান (যেমন কূটনৈতিক নোট বা ডেমার্শ প্রেরণ) নেওয়া হয়েছে। পশ্চিমা বিশ্ব ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সাথে আস্থার সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে সরকারের তৎপরতা দৃশ্যমান। 

ভূ-রাজনৈতিক জটিলতার এই সময়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের যে গতি প্রত্যাশা করা হয়েছিল, বিশ্ববাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে তা অর্জন করা বেশ দূরূহ প্রমাণিত হচ্ছে। জনসন্তুষ্টির মূল্যায়ণ চল্লিশ বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে বলা চলে, সাধারণ মানুষের সন্তুষ্টির চিত্রটি মিশ্র। দীর্ঘদিনের দুঃশাসন ও অনিশ্চয়তার পর একটি নির্বাচিত সরকারের অধীনে স্থিতিশীলতা দেখতে পাওয়ায় সাধারণ মানুষ স্বস্তি প্রকাশ করেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি এবং সামাজিক সুরক্ষা কার্ডের মতো জনমুখী উদ্যোগগুলো নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মনে আশার সঞ্চার করেছে। 

তবে বাজারের লাগামহীন দ্রব্যমূল্য এবং জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় সাধারণ মানুষকে এখনো অস্বস্তিতে রাখছে। তরুণ সমাজ ও সাধারণ ভোটাররা রাতারাতি বড় ধরনের সংস্কার ও দৃশ্যমান পরিবর্তনের যে উচ্চাশা পোষণ করেছিলেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে তা পুরোপুরি পূরণ না হওয়ায় কিছুটা আক্ষেপ ও আংশিক অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক মহল ও উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি বেশ ইতিবাচক ও আস্থার। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় উত্তরণ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংস্কারের সদিচ্ছা এবং দুর্নীতি রোধে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হচ্ছে। বিশেষ করে বৈদেশিক বাণিজ্যের সম্প্রসারণ, শ্রমবাজারের সুরক্ষা এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সরকারের স্বচ্ছ ও পরিপক্ব অবস্থান বহুজাতিক সংস্থা ও বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলোকে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। 

সবশেষ 

বিএনপি সরকারের প্রথম ১৮০ দিনকে একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের কাল হিসেবে দেখা যেতে পারে। এটি কোনো যাদুকরী পরিবর্তনের সময় ছিল না, বরং দীর্ঘ জট ছাড়িয়ে সঠিক পথে হাঁটার প্রাথমিক পর্যায়। সরকার যদি তাদের ঘোষিত সংস্কারমূলক নীতিগুলো কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আরও দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে, তবে আগামী দিনে জনসন্তুষ্টির মাত্রা আরও অনেকদূর বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায়।

শেয়ার করুন