দ্রুতই রাজনীতিতে ফিরতে চায় আওয়ামী লীগ। এমুহূর্তে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় চাপ সৃষ্টি করে দলকে বাংলাদেশের ভেতরে প্রকাশ্যে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনতে দেশী-বিদেশী নানামুখী তৎপরতা চালাচ্ছে দলটি। বেশি আশাবাদ রাখছে প্রতিবেশী দেশ আওয়ামী লীগের অন্যতম ঘনিষ্ঠ বন্ধু রাষ্ট্র বলে পরিচিত দিল্লির প্রতি। তবে বর্তমানে সার্বিক পরিবেশ পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক তৎপরতা বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশ দিল্লি কতটা ভালো ফল এনে দেবে সেব্যাপারে আওয়ামী লীগ ভরসা পাচ্ছে না। এসব খবর মিলেছে রাজনৈতিক মাঠ থেকে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠদের কয়েকজনের সাথে আলাপ করে।
কার্যক্রম নিষিদ্ধই থেকে গেলো
সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত কোনো সত্ত্বার যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছে জাতীয় সংসদ। গত বছর ওই অধ্যাদেশের বলে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। গত বুধবার (৮ এপ্রিল) দুপুরে জাতীয় সংসদে এ-সংক্রান্ত ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল’ পাস হয়। পাস হওয়া বিলে অধ্যাদেশের বিষয়বস্তুতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। ফলে কোনো সত্ত্বাকে নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি তার কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার ক্ষমতাও এই আইনে থাকছে। আগে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে কোনো ব্যক্তি বা সত্ত্বাকে নিষিদ্ধ করার বিধান থাকলেও কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান ছিল না। ওই অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দিতে ওইদিন জাতীয় সংসদে বিল পাস হলো। ফলে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকল। অন্তর্বতী সরকার ২০২৫ সালের ১১ মে অধ্যাদেশ জারি করে এই আইনে কোনো কোনো সত্তার যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করে। এর ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তার নেতাদের বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দলটির যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে অন্তর্বর্তী সরকার। ওই অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দিতে জাতীয় সংসদে বিল পাস হলো। ফলে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকল।
নিষিদ্ধ হলো ঠিক এমন সময়ে
তবে রাজনৈতিক বিশ্বেষকদের মতে, সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত কোনো সত্তার যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ অনুমোদন হওয়ার সময় ও তারিখ সবার নজর কেড়েছে। কেননা ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটে গেলো যখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি ঘটনা বিভিন্ন মহলে নজরে এসেছে। খবরে দেখা গেলো ৭ এপ্রিল বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সভাকক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মা। সেখানে পারস্পরিক স্বার্থ ও দ্বিপক্ষীয় লাভের ভিত্তিতে বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের সঙ্গে ইতিবাচক, গঠনমূলক এবং দূরদর্শী পন্থায় একত্রে কাজ করার বিষয়ে ভারতের প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা। আবার দেখা গেলো প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির সভাপতি নিতিন নবীনের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। দিল্লি সফররত প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির ওই চিঠি বিজেপির আন্তর্জাতিক শাখার প্রধান বিজয় চোথাউওয়ালের কাছে হস্তান্তর করেন।
এব্যাপারে একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিজয় চোথাউওয়ালে লিখেছেন, ‘বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। এ সময় তিনি আমার হাতে একটি চিঠি তুলে দিয়েছেন। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিজেপির জাতীয় সভাপতি নিতিন নবীনকে ওই চিঠি লিখেছেন। আমাদের আলোচনার সময় বিজেপি নেতা শিশির বাজুরিয়া উপস্থিত ছিলেন। এই চিঠি যখন হস্তান্তর হয় তখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দিল্লিতে ছিলেন। তিন দিনের শুভেচ্ছা সফরে খলিলুর রহমান ভারতে ছিলেন আর সফরসঙ্গী হিসেবে ছিলেন হুমায়ুন কবির। আর এই বৈঠকে প্রতিবেশী দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলোর পাশাপাশি আঞ্চলিক বিষয় নিয়ে কথা বলেন।
জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরও ছিলেন। পারস্পরিক মর্যাদা ও আস্থার ভিত্তিতে দীর্ঘ মেয়াদে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বার্তা নিয়ে ভারতে যাওয়ার প্রথম দিনেই দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে বৈঠক করেন খলিলুর রহমান। এইসব বৈঠকের মধ্যে খবর বের হয় যে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশিদের জন্য ভারতীয় ভিসা, বিশেষ করে চিকিৎসা ও ব্যবসায়ী ভিসা সহজ করার আশ্বাস দিয়েছে ভারত।
তাহলে আ.লীগের কি হবে?
ভারত বাংলাদেশের মধ্যে একটি নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পর এধরনের বৈঠক নিয়ে কূটনৈতিক সুত্রগুলোর বিশ্লেষণ আছে। এতে বলা হয় থাকে বা ধরে নেওয়া যায় যে একটি নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে সাধারণ আওয়ামী লীগ এখনই যা আশা করে বসে আছে তা হবে না। এসব ক্ষেত্রে আসলে পুরো রাষ্ট্রীয় বিষয়াদি ছাড়া অন্য বিষয়গুলো খুব একটা প্রাধান্য পায় না। যদিও বলা হয় যে, জুলাই অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরাতে ভারতের কাছে আবারও আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। তবে অভিজ্ঞ কূটনীতিকরা একে উড়িয়ে দিয়ে বলেন, একটি নির্বাচিত সরকারের প্রতিধিদের সাথে বৈঠকে এমন বিষয়টি ভারতের মতো কৌশলী দেশ তুলবে না, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সরকারও না। কেননা এই বৈঠকের মাত্র কয়েকদিন আগে আওয়ামী লীগ যদি আবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ পায়, সেক্ষেত্রে শেখ হাসিনাকে আর দলের নেতৃত্বে নাও দেখা যেতে পারে-এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়। কয়েকদিন অর্থ্যাৎ পররাষ্ট্র মন্ত্রী দিল্লী সফরের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার সঙ্গে এক বৈঠক হয়। বৈঠকের পরে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ূন কবির প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ সময় দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক আরও জোরদার করার ওপরও গুরুত্ব দেন। বৈঠকে শেখ হাসিনাকে ফেরানোর বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে হুমায়ূন কবির বলেন, শেখ হাসিনা বাংলাদেশে রাজনৈতিকভাবে মরে গেছেন। তার আওয়ামী লীগ বলতে বাংলাদেশে এখন আর কিছু নেই। তবে বৈঠকে শেখ হাসিনাকে নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়নি জানিয়ে দেশের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট সব বিষয়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত থাকবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
শেষ কথা
ছাত্র-জনতার বিক্ষোভের মুখে ২০২৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। অন্যদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদন্ডেরর রায় দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বর্তমানে ভারতের দিল্লিতে রয়েছেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। যে সময়ে তিনি ভারতে আশ্রয় নেন, ঠিক ওই সময়ে দেশটির সংসদে পেশ করা এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রসঙ্গে কিছু মন্তব্য করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল যে, তার বিষয়ে ভারতের সিদ্ধান্ত ‘মানবিক দৃষ্টিকোণ’ থেকে নেওয়া এবং দেশটির ঐতিহ্য ও পরম্পরাকে বিবেচনায় রেখেই এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, অর্থ্যাৎ রাজনৈতিক নয়। কিন্তু তারপরেও ২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় বসলে ঢাকা-দিল্লি সম্পকে ভয়াবহ টানাপোড়েন তৈরি হয়। কিন্তু ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর সম্পর্কের সেই বরফ গলার ইঙ্গিত এখন সর্বত্র। এর ধারাবাহিকতায় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের প্রথম মন্ত্রী হিসেবে ভারত সফরে গিয়েছিলেন খলিলুর রহমান। এই ‘শুভেচ্ছা’ সফরে মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দলের পক্ষে কেউ ঢুকে গিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি করতে পারবে কি-না? কবে আ.লীগকে রাজনীতিতে করার সুযোগ দেওয়া হবে? এসব বিষয় নিয়ে কোনো সুরাহা হওয়ার আপাতত সুযোগ নেই বলে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহল মনে করেন। তাছাড়া ভূ-রাজনৈতিক ইস্যুতে ভারত অনেক কোনঠাসা অবস্থায় রয়েছে যখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনা ইস্যুর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠে পাকিস্তানের ইসলামাবাদ।
এমন ভূ-রাজনৈতিক চাপে থাকা ভারত বাংলাদেশের সাথে অন্য ইস্যুতে কথা বলবে তা অবাস্তবিকই মনে করেন। তাছাড়া অনেক কূটনীতিক দেশ প্রতিনিধিকে জানিয়েনে যে, ভারত সাধারণতা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত জনগণের সরকারের প্রতি অনেক দক্ষতার সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক মনে চলে। এছাড়া একটি দেশের আইন-কানুন, বিচার-আচার বা চুক্তিকে সম্মান দেখিয়ে থাকে। এর পাশাপাশি সৌজন্যবোধ প্রখর যা-কে অনেকে বলে থাকেন ভারত অনেকটা ‘ট্রাডিশনাল’। এখন প্রশ্ন হচ্ছে সেক্ষেত্রে আ.লীগের রাজনীতিতে ফিরে আসা কে ম্যানেজ করবে? আ.লীগকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে ভারতই একমাত্র কূটনৈতিক নিরাপদ টুল বা মাধ্যম বলা যায়। সে-ই টুল-ই যদি ক্ষমতাসীন বিএনপি কোনোভাবে ম্যানেজ করে ফেলে বা ফেলেছে, তাহলে আ.লীগের পাশে থাকবে কে? বিএনপি যদি পুরোপুরি আওয়ামী লীগের মতো না হলেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পাশাপাশি আসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ ধরে রাখার ব্যাপারে বদ্ধপরিকর থাকে? কিংবা এখন ও ভবিষ্যতে ভারতের সাথে সু-সম্পর্ক রেখে সামনের দিনগুলিতে পা ফেলে? তাহলে পুরোনো মিত্র আওয়ামী লীগকে আপাতত দিল্লি কাছে টেনে নেবে বলে মনে করেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ফলে এ-মুহূর্তে আ.লীগকে রাজনীতিকে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক বিশেষ করে ভারতের তৎপরতা নিয়ে দলটির পক্ষে আসলে সন্দিহান থাকাই স্বাভাবিক বলেই বিশ্লেষকরা মনে করেন।