১৭ এপ্রিল ২০২৬, শুক্রবার, ০২:৩৭:৬ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
টাইম ম্যাগাজিনে বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খালেদা জিয়া সহ দেশের ১৫ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও পাঁচ প্রতিষ্ঠানকে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার-২০২৬’ পদক প্রদান যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েল নিয়ে জনমত বদলাচ্ছে টেক্সাসে পাঠ্যক্রমে ইসলাম ও সংখ্যালঘু ইতিহাস পরিবর্তন ঘিরে তীব্র বিতর্ক ট্রাম্প অ্যাকাউন্টস : চার মিলিয়নের বেশি শিশু নিবন্ধিত নিউ ইয়র্কে ২-কে চাইল্ড কেয়ার হবে পূর্ণ দিবস ও বছরব্যাপী ফিলিস্তিনপন্থী শিক্ষার্থীদের ডিপোর্টেশন ঠেকানোর রায় দেওয়ায় দুই অভিবাসন বিচারককে বরখাস্তের অভিযোগ ইমিগ্রেশন আপিল বোর্ডে মাহমুদ খলিলের আপিল খারিজ লংআইল্যান্ডে মসজিদ সম্প্রসারণে প্রশাসনিক বাধা নাটক-সিনেমা দেখে কি বার্তা দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী?


বিপদে জোটসঙ্গীকে পাশে পেলো না জামায়াত
সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৫-০৪-২০২৬
বিপদে জোটসঙ্গীকে পাশে পেলো না জামায়াত


বিপদে জামায়াতে ইসলামীর পাশে পেলো না জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)কে। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দিতে জাতীয় সংসদের বিল পাস করতে গিয়ে এমন দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে। জামুকা সংশোধনে বিল নিয়ে জামায়াতের আপত্তি ছিল। তবে এনসিপি সমর্থন দিয়েছে। আর এধরনের ঘটনার সময়ে এনসিপিরকে জামায়াত তাদের সাথে পায়নি। বিষয়টি রাজনৈতিক মহলে বেশে আলোচিত হচ্ছে। একিই সাথে বগুড়া-৬ ও শেরপুর-৩ আসনের উপনির্বাচনে জামায়াতের পক্ষ থেকে তোলা অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ নিয়েও এনসিপি সংসদের ভেতরে বাইরে শক্ত অবস্থান নেয়নি। তবে ওইদিন পুরো বিরোধী দলের আপত্তির মুখে মানবাধিকার অধ্যাদেশ বাতিল করে নতুন বিল পাস করা সম্ভব হয়। 

কি হয়েছে সংসদে

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে দেখা যায় মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলাম পার্টির নাম বহাল রেখে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দিতে বিল পাস করেছে জাতীয় সংসদ। বৃহস্পতিবার (০৯-০৪-২৬) সংসদের অধিবেশনে বিলটি উত্থাপন করেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। এই বিলের বিষয়ে জামায়াতের পক্ষ থেকে আপত্তি জানান জামায়াতের সংসদ সদস্যরা। দলের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান এব্যাপারে দলের অবস্থান তুলে ধরে বক্তব্য দেন। তবে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের অন্যতম শরিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এই বিলের ওপর কোনো আপত্তি নেই বলে স্পিকারকে সাফ জানিয়ে দেন। আর এতেই বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়। বিরোধীদলীয় নেতা বিলের ওপর আপত্তি জানিয়ে বক্তব্য দেন। কিন্তু ‘বিরোধী দলের নেতা কোনো আপত্তি করেননি’ উল্লেখ করে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ আপত্তির বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে ভোট দেননি এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীও কোনো জবাব দেননি।

কি ছিল জামায়াতের ব্যাখ্যা

এর আগে সংসদের বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে এ বিলের ক্ষেত্রে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (ভিন্নমত)‌ জানিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরা বলেছিলেন, ‘অধ্যাদেশটি বর্তমান অবস্থায়, কোনো পরিবর্তন ছাড়া পাস হলে দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামের মতো দলগুলো পাকিস্তানের হিসেবে বিদ্যমান থেকে যাবে, যা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। এই অধ্যাদেশের “বীর মুক্তিযোদ্ধা” এবং মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞা পরিবর্তনের দাবি রাখে।’ কমিটির প্রতিবেদনে জামায়াতের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, ২০০২ সালে খালেদা জিয়ার সরকার আমলে আইনে দলগুলোকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী বলা হয়নি। রাজনৈতিক দলকে সশস্ত্র বাহিনী চিহ্নিত করা ফ্যাসিবাদী রাজনীতির সমর্থন।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা এই অধ্যাদেশে ‘মুক্তিযুদ্ধ’, ‘মুক্তিযোদ্ধা’, ‘মুক্তিযোদ্ধা সহযোগী’, ‘মুক্তিযোদ্ধা পরিবার’ এবং ‘মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্যের সংজ্ঞা’ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অধ্যাদেশে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় বলা হয়, ‘১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন এবং যেসব ব্যক্তি যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ভারতের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন এবং যাঁরা স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে হানাদার ও দখলদার পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস, মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন, এমন বেসামরিক নাগরিকেরা (ওই সময়ে যাঁদের বয়স সরকার-নির্ধারিত সর্বনিম্ন বয়সের মধ্যে ছিল) মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাবেন। এর পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী, মুক্তিবাহিনী, বিএলএফ ও অন্যান্য স্বীকৃত বাহিনী, পুলিশ বাহিনী, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর), নৌ কমান্ডো, কিলো ফোর্স ও আনসার সদস্যরাও বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য হবেন।’

জারি করা অধ্যাদেশে ‘মুক্তিযুদ্ধ’র সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্খায় হানাদার ও তাদের সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস, তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধ।

আল্লাহ ভালো জানেন

এদিকে বিলটির ওপর আপত্তি জানিয়ে বিরোধী দলের নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা চেয়েছিলেন দেশটা মানবিক হবে এবং সমাজের সর্বক্ষেত্রে ন্যায়বিচার সুপ্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু স্বাধীনতার পরে তার পুরাটাই উল্টোটা হয়েছিল। জামুকা আইনের সংজ্ঞার বিষয়ে জামায়াতের আমির বলেন, এ জিনিসটা স্বাধীনতার পরে তখনকার সরকার আনেনি। জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সরকার আনেনি। এ জিনিসটা সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন ফ্যাসিস্টের বিকৃত প্রতীক শেখ হাসিনা। পরবর্তী পর্যায়ে অন্তর্বর্তী সরকার ধারাবাহিকতা রেখেছে সামান্য পরিবর্তন করে। সেখানে তৎকালীন তিনটি সংগঠনের নাম নেওয়া হয়েছে-তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলাম পার্টি। পাকিস্তানি বাহিনী ও তার সহায়ক শক্তির সঙ্গে তিনটি রাজনৈতিক দলের নাম এসেছে। বর্তমান উপস্থাপনায় তৎকালীন সংগঠনের কথা বলা হয়েছে। এরপর জামায়াত আমির আরও বলেন, ‘আল্লাহ ভালো জানেন, একাত্তর সালের সেই চরম সময়ে কার কী ভূমিকা ছিল। আল্লাহই পূর্ণাঙ্গ একমাত্র সাক্ষী। বাকি আমরা যারা আছি, তারা আংশিক সাক্ষী। 

তবে এতে কাজ হয়নি

সংসদের ওই দিনের ঘটনায় জামায়াতের আমিরের এই বক্তব্যে কাজ হয়নি। কেননা স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল বিল সম্পর্কে এনসিপির কোনো আপত্তি নেই বলে সংসদের নজরে আনার জন্য সংসদকে অনুরোধ করেছেন। এরপর তিনি বিলটি ভোটে দেন। এ সময় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বক্তব্য দিতে চাইলে স্পিকার বলেন, বিরোধী দলের নেতা তো কোনো আপত্তি করেননি। তবু আপনি কিছু বলতে চান? তখন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার, উত্থাপিত আকারে বিলটি তোলার জন্য অনুরোধ করছি।’ পরে বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়।

শেষ কথা

তবে মজার ব্যাপার ছিল জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দিতে জাতীয় সংসদের বিল পাস করতে এনসিপি সংসদ সদস্যরা পুরোপুরি রাজিই ছিলো । বা বলা চলে জোর সম্মতি ছিল। আর ওইদিন বিরোধী দলের আপত্তির মুখে মানবাধিকার অধ্যাদেশ বাতিল করে নতুন বিল পাস করতে হয়। আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করতে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ বাতিল করে ২০০৯ সালের আইন পুনঃপ্রচলন করতে বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন। সেটি সেভাবেই পাস হয়। অথচ একসময়ের্ ্কমান এলজিআরডিমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেছিলেন, এটা “বিরোধী দল দমন কমিশন” হিসেবে ফাংকশন করে। মানবাধিকার কমিশন যখন বিরোধী দল ও মত দমন কমিশন হিসেবে ফাংশন করে, আমরা যদি দেখি আদতে মানবাধিকার যেসব ক্ষেত্রে ক্ষুণ্ন হয়েছে, তা সরকারি সংশ্লিষ্ট সংস্থা করেছে। সেখানে বিডিআর, র‍্যাবসহ বিভিন্ন বাহিনী সরাসরি সংযুক্ততা আমরা দেখেছি। মানবাধিকারকে তারা ক্ষুণ্ন করেছে।’

উপ-নির্বাচন নিয়েও এনসিপির তোড়জোর নেই 

এদিকে ৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত শেরপুর-৩ আস‌নের নির্বাচন এবং বগুড়া-৬ আস‌নে উপ‌নির্বাচ‌নের ভোটগ্রহ‌ণে অনিয়ম ও জা‌লিয়া‌তির অভিযোগ জামায়াতে ইসলামী জোরালো অভিযোগ করে। কিন্তু দলটির নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোটের অন্যতম সঙ্গী এনসিপি সংসদে কিংবা মাঠে ময়দানে জোরালো ভূমিকা নেয়নি। যদিও কারচুপি, জাল ভোট প্রদান, প্রভাব বিস্তার, হামলা, এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া এমন নানা অনিয়মের অভিযোগ এনে শেরপুর -৩ আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেয়। অনিয়মের অভিযোগ তুলে জামায়াতের নেতৃত্বে ১১দলীয় জোটের এনসিপির বা কেউ ব্যবস্থা নিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) হন্তক্ষেপও চায়নি। রাজধানীর মগবাজারে দলটির কে›ন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার নানা অভিযোগ তুলে ধরলেও সেখানে ১১দলের কাউকে সাথে দেখাও যায়নি। অথচ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের নেতৃত্বে ১১দলীয় জোটের অন্যতম শরিক ছিল এনসিপি। 

তবে আন্দোলনে মাঠে আছে এনসিপি

জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দিতে জাতীয় সংসদের বিল পাসে এনপিসি জামায়াতের সাথে থাকেনি। কিন্তু গণভোটে অনুমোদিত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের দাবিতে এখনো নিজেদেরকে ১১দলের সাথে রেখেছেন। গত ৯ এপ্রিল বৃহস্পতিবারে এই ইস্যুতে আন্দোলনে নামছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। এদিন শুরু করে সপ্তাহব্যাপী গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরণ। ১১ এপ্রিল শনিবার দেশের সব মহানগরে এবং পরের দিন সব জেলায় বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। কারো কারো মতে, জুলাই সনদ নিয়ে সরকারের সাথে এনসিপির একধরনের দফা-রফা হয়ে গেলো এনসিপিকে আর জামায়াত কি বলে কাছে রাখবে বা জোট সঙ্গী বলে মনে করবে তা সময় বলে দেবে। ইতোমধ্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন অধ্যাদেশ- ২০২৬ জাতীয় সংসদে পাশ করা হয়েছে। তা-ই সময়ই বলে দেবে জোট সঙ্গী এনসিপি ভবিষ্যতে জামায়াতের সাথে সর্ম্পক কতদূর টেনে নেয়।

শেয়ার করুন