১৭ এপ্রিল ২০২৬, শুক্রবার, ০২:৩৭:৪৬ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
টাইম ম্যাগাজিনে বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খালেদা জিয়া সহ দেশের ১৫ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও পাঁচ প্রতিষ্ঠানকে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার-২০২৬’ পদক প্রদান যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েল নিয়ে জনমত বদলাচ্ছে টেক্সাসে পাঠ্যক্রমে ইসলাম ও সংখ্যালঘু ইতিহাস পরিবর্তন ঘিরে তীব্র বিতর্ক ট্রাম্প অ্যাকাউন্টস : চার মিলিয়নের বেশি শিশু নিবন্ধিত নিউ ইয়র্কে ২-কে চাইল্ড কেয়ার হবে পূর্ণ দিবস ও বছরব্যাপী ফিলিস্তিনপন্থী শিক্ষার্থীদের ডিপোর্টেশন ঠেকানোর রায় দেওয়ায় দুই অভিবাসন বিচারককে বরখাস্তের অভিযোগ ইমিগ্রেশন আপিল বোর্ডে মাহমুদ খলিলের আপিল খারিজ লংআইল্যান্ডে মসজিদ সম্প্রসারণে প্রশাসনিক বাধা নাটক-সিনেমা দেখে কি বার্তা দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী?


আ.লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, শিরিনের জামিনে ম্যাসেজ কী
মাসউদুর রহমান
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৫-০৪-২০২৬
আ.লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, শিরিনের জামিনে ম্যাসেজ কী সাবের হোসেন চৌধুরী ও শিরীন শারমিন চৌধুরী


অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম দিকেই গ্রেফতার করা হয়েছিল আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি ও নেতা সাবের হোসেন চৌধুরীকে। বেশ নাটকীয়তার সঙ্গে দ্রুত জামিন হয়ে বাসায় ফেরেন তিনি। এরপর সাবের হোসেনকে নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আর কোনো উচ্চবাচ্য ছিল না। সাবের যে সুযোগ পেয়েছেন সেটা লাভে ব্যর্থ শেখ হাসিনার উপদেষ্টা বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমান, আইনমন্ত্রী আনিসুলসহ এক ঝাক আটকৃত নেতা। 

ত্রয়োদশ নির্বাচনের পর বিএনপি সরকারের আমলে আটক হয়েছিলেন সাবেক স্পিকার শিরিন শারমিন চৌধুরি। দীর্ঘ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তার খোঁজ পেতে ব্যর্থ বাংলাদেশের আইনশৃংখলাবাহিনী। এ নিয়ে বেশ আলোচনাও হয়। কোথায় শিরিন শারমিন। সবশেষে, ৭ এপ্রিল ধানমন্ডিস্থ তার নিজ বাসা থেকে তাকে আটক করে আইনশৃংখলাবাহিনী। সাবের হোসেন চৌধুরীর মত তিনিও অতি দ্রুত জামিনে মুক্ত হন হত্যাচেষ্টা মামলার আসামী হওয়া স্বত্ত্বেও। ১২ এপ্রিল জামিনে মুক্তিলাভ করেন তিনি। 

আওয়ামী লীগের এ দুই নেতার অতি দ্রুত জামিন নিয়ে নানা মহলে বেশ সরব। কী হচ্ছে তাহলে? নতুন ব্যানারে কী আসছে আওয়ামী লীগ? এ প্রশ্ন সর্বত্র। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। যেখানে আওয়ামী লীগের কর্মকান্ড নতুন আইনের আওতায় নিষিদ্ধ, সেখানে রিফাইন আওয়ামী লীগের স্বপ্ন জিইয়ে থাকে কিভাবে? বিষয়টা ঠিক অমন না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন এটা একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এর সঙ্গে আওয়ামী লীগের জেগে ওঠার কোনো সম্ভাবনা মেলানো যাবে না। সাবেক স্পিকার নিখাদ একজন ভদ্র মহিলা। পড়াশুনায় তিনি দুর্দান্ত। কিন্তু রাজনীতিতে তিনি কতটুকু বা তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের কোটি কোটি নেতাকর্মী মেনে নেমে এটা অসম্ভব। সাবের হোসেনের বেলায়ও অনেকটা এরকম। ফলে রিফাইন আওয়ামী লীগ নামে কোনো কিছু কেউ যদি কোনো এক সময় চিন্তা করেও থাকে সেটা আর সেই প্রেক্ষাপটে নেই। আওয়ামী লীগের কর্মকান্ড নিষিদ্ধ হওয়ার পর ওইসব সম্ভাবনায় গুড়েবালি। 

তাহলে সাবেক স্পিকার শিরিন শারমিনের দ্রুত মুক্তিলাভের রহস্য? এটা বিএনপি তাদের কোনো একটা চিন্তাভাবনার অংশ হিসেবে একটা গেম প্লান বাস্তবায়ন করতেও পারে। যেমনটা আওয়ামী লীগ একটা বিশাল রাজনৈতিক দল। এ দলের সবাই যে অপরাধী সেটা তো বলা যাবে না। তেমনি দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব যে সবাই দুর্নীতিগ্রস্থ তাও না। ফলে শিরিন শারমিন বাস্তবাবিক অর্থেই একজন কলংকমুক্ত মানুষ। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও, মামলা থাকলেও তিনি সম্ভবত ওইসবের সঙ্গে জড়িত নন। শেষ জামিনটা এমন এক প্রেক্ষাপট থেকেই দিয়েছে আদালত। বিএনপি বলতে পারবে, তারা আওয়ামী লীগের সবাইকে ঢালাও অভিযুক্ত করছে না। যারা সত্যিকার অর্থে দুর্নীতিবাজ, হত্যাকান্ডে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুসারে ব্যবস্থা নিচ্ছে। 

তাছাড়া রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিন চুপ্পু ও স্পিকার শিরিন শারমিন দুই সাংবিধানিক দায়িত্বে ছিলেন। স্পিকার যদিও পদত্যাগ করেছিলেন, তবু তার সঙ্গে হয়তো অন্তর্বর্তী সরকার পজেটিভ বিহেইভ করেছে। যার ধারাবাহিকতায় বিএনপিও। যেমনটা অন্তর্বর্তী সরকার সাবের হোসেন চৌধুরীর বেলায়ও করেছেন। বিএনপি তো রাষ্ট্রপতি চুপ্পুকেও যথার্থ সম্মান দিয়েই যাচ্ছেন সবস্থানে। 

তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে উপরোক্ত দুইজনই আওয়ামী প্রডাক্ট। তাদের সঙ্গে এতো ভাল ব্যবহার করে আবার আওয়ামী লীগের কর্মকান্ড নিষিদ্ধের আইন কেন পাস করলো বিএনপি?

আসলেই বরাবরই আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল বিএনপি। সেটা কারোর অজানা নয়। মির্জা ফখরুল বারবার বলেছেন, বিএনপি বহুদলীয় রাজনীতির পক্ষে। সে যে দলই হোক, তাদের রাজনীতি করার অধিকার আছে। সেটাতে বঞ্চিতকরণ বিএনপির নীতিতে নেই। সে সময় বিএনপির এমন অবস্থানের কারণে অন্তর্বর্তী সরকারও এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে গড়িমসি করে। দূরে থাকে। কিন্তু সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ চৌধুরীর বিদেশ যাত্রাকে কেন্দ্র করে এনসিপি যেভাবে সোচ্চার হয় আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণে, সেটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য ছিল বিরাট চাপ। বারবার অবস্থান কর্মসূচির পর যমুনা অভিমুখেও কর্মসূচি দিয়েছিল হাসনাত আব্দুল্লাহরা। আর এর সঙ্গে যুক্ত হয় জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ। ফলে আন্দোলনের মাত্রা দুইয়ে দুইয়ে চার হয়ে যায়। এরপরও বিএনপি তাদের অবস্থানে অনড় থাকার পরও অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। ওই সংক্রান্ত এক অধ্যাদেশও জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার সংসদে আইন করে এ নিষিদ্ধকরণের প্রক্রিয়া পোক্ত করার জন্য। অন্তর্বর্তী সরকারের দেয়া মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৭টি অপরিবর্তিত অবস্থায় পাস হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিত সংসদে। ১৩টি সংশোধন করে পাস করা হয়েছে এবং সাতটি রহিতকরণ ও হেফাজত বিলের মাধ্যমে অনুমোদন পেয়েছে। বাকি ১৬টি অধ্যাদেশ উপস্থাপন করা হয়নি। সব মিলিয়ে ৯১টি বিলের মাধ্যমে ১১০টি আইন পাস হয়েছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধকরণেরটাও অন্যতম। প্রশ্ন আসতে পারে বিএনপি কেন এ আইন পাস করতে গেল। বরাবর তো তারা ছিল এর বিরুদ্ধে। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাস্তবিক অর্থেই বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ। তাই তারা এ প্রক্রিয়ায় সায় দিয়ে আওয়ামী লীগকে কোনঠাসা করার সুযোগ হাত ছাড়া করেনি। তাছাড়া তারা বলতেই পারে এ আইন তো তারা নিজ থেকে করেনি। অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ তারা পাস করেছে। তাও সংসদে বিরোধী দলের আসনে এমন দুই দল বসে রয়েছেন যারা বহু আন্দোলন করে অন্তর্বর্তী সরকারকে বাধ্য করেছিল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধকরণে। 

ফলে এটা যদি বিএনপি এড়িয়ে যায় বাদ দেয়, তাহলে রাজনীতির বাইরে এ দুই দল গলা ফাটিয়ে প্রচার করবে, আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করতে, ভারতের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধকরণ বিল পাস করেনি। ফলে এরা (বিএনপি) মূলত ভারতেরই দালাল। এদের বিরুদ্ধে আবারও রাজপথে নামতে হবে। এবং যেভাবে আওয়ামী লীগকে তাড়ানো হয়েছে, সেভাবে বিএনপিকেও তাড়াতে হবে। বিএনপি সম্ভব্য এসব হুমকি ধমকি তথা জামায়াত এনসিপির প্রপাগান্ডা বা রাজনীতির মাঠ গরমের যেন সুযোগ না পায়, সে জন্য সে জন্য ওই অধ্যাদেশ পাস করেছে। 

এখানে বিএনপি সবদিক বিবেচনা করেই হয়তো ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অনেকেই বিএনপির এমন উল্টোমুখী সিদ্ধান্তকে ভালোচোখে দেখছে না। কিন্তু এখানে বিএনপির কিছু করার নেই। বিএনপি দীর্ঘ ১৭ বছর পর ক্ষমতায়, দলটি দেশের বিভিন্ন সেক্টরে কাজ করে নিজেদের সামর্থ প্রমাণ দিতে সময়ের প্রয়োজন। ফলে বিরোধী দলের ঝুট ঝামেলা এড়াতে ও নিজেদের স্বার্থে এ কাজটা তারা করেছে। হয়তো এ ব্যাপারে বৈদেশিক চাপ আসতেও পারে। কিন্তু এটাও ঠিক, আইন করে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধকরণের ইতিহাস বিশ্বের বড় বড় বা প্রভাবশালী দেশে ঢের রয়েছে। তাছাড়া আইসিটি কোর্টে এ সংক্রান্ত অভিযোগও রয়েছে। 

আইসিটি কোর্টে অভিযোগ ও তদন্ত প্রসঙ্গ 

গত ৫ অক্টোবর তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেছিলেন দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে অপরাধী সংগঠন হিসেবে বিচারের মুখোমুখি করার লক্ষ্যে প্রাথমিক তদন্ত শুরু করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন তিনি। সেসময় মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম) নামে একটি দল আগেই অভিযোগ দিয়েছিল। আমরা সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করছি। সুতরাং বলা যেতে পারে, এই মুহূর্তে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অপরাধী সংগঠন হিসেবে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য প্রাথমিক তদন্ত শুরু করতে যাচ্ছি। সেটা পুরোদমে শুরু হলে আমরা বলতে পারবো, বিষয়টি কতদূর পর্যন্ত যেতে পারে।

এর আগে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন নির্মূলের সরাসরি হুকুমদাতা হিসেবে আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের শরিকদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে বিচার চাওয়া হয়েছে। গত ২ অক্টোবর এনডিএম-এর চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর বরাবর অভিযোগ জমা দিয়েছেন। ববি হাজ্জাজের উপস্থিতিতে এ সংক্রান্ত ব্রিফিংয়ে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামিম ও প্রসিকিউটর বিএম সুলতান মাহমুদ উপস্থিত ছিলেন।

অভিযোগে বলা হয়েছে, গণহত্যার সরাসরি হুকুমদাতা আওয়ামী লীগ এবং ১৪ দলের শরিক রাজনৈতিক দল-সাম্যবাদী দল, গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি, জাসদ (ইনু), বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি (মেনন), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল, তরিকত ফেডারেশন, গণতন্ত্রী পার্টি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), গণআজাদী লীগ, কমিউনিস্ট কেন্দ্র, বাসদ ও জাতীয় পার্টি-জেপির বিরুদ্ধে দল হিসেবে গণহত্যার অভিযোগ গঠন করে তদন্ত পূর্বক আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের ব্যবস্থা করা হোক।

শেয়ার করুন