হিলসাইড ইসলামিক সেন্টার ও বেথপেজের মসজিদ আল-বাকির প্রস্তাবিত নতুন ভবন
নিউ ইয়র্কের লংআইল্যান্ডে দুটি মসজিদের সম্প্রসারণ পরিকল্পনা ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র বিতর্ক, আইনি সংঘাত, বৈষম্যে এবং সামাজিক উত্তেজনা। নিউ হাইড পার্কের ৩০০ হিলসাইড অ্যাভিনিউয়ে অবস্থিত হিলসাইড ইসলামিক সেন্টার এবং বেথপেজে অবস্থিত মসজিদ আল-বাকি এ দুটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ প্রস্তাব স্থানীয় টাউন প্রশাসন প্রত্যাখ্যান করার পর বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। এতে করদাতাদের কোটি কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা বনাম স্থানীয় প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রশ্নটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
রমজান মাসের প্রতিটি শীতল রাতে, তাপমাত্রা যখন হিমাঙ্কের কাছাকাছি, তখন পাফার জ্যাকেট ও টুপি পরিহিত মুসল্লিরা একে একে একটি অস্থায়ী সাদা তাঁবুতে প্রবেশ করেন। জুতা খুলে তারা ঠান্ডা মাটিতে বিছানো মাদুরে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করেন। তিনটি হিটার থাকা সত্ত্বেও ২৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট ঠান্ডা কাটানো কঠিন হয়ে পড়ে। এ তাঁবুটি শুধু একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা নয়, বরং এটি হিলসাইড ইসলামিক সেন্টারের দীর্ঘদিনের সংগ্রামের প্রতীক। মসজিদের মূল ভবনে জায়গা না হওয়ায় অনেক মুসল্লিকে বাইরে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে হয়, যেখানে ভেতরের ইমামের কণ্ঠস্বর লাইভ সম্প্রচারের মাধ্যমে শোনা যায়। নামাজ পড়তে আসা মুসল্লিরা বলেন, আমাদের সত্যিই জায়গা দরকার। এভাবে বাইরে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়া খুব কষ্টের। প্রায়ই নামাজ পড়তে আসা অনেক বয়স্ক মুসল্লিরা ঠান্ডাজনিত রোগে ভোগেন।
২০২৪ সালে টাউন অব নর্থ হেম্পস্টেড হিলসাইড ইসলামিক সেন্টারের সম্প্রসারণ পরিকল্পনা বাতিল করে। এর পরপরই মসজিদ কর্তৃপক্ষ স্টেট ও ফেডারেল আদালতে মামলা দায়ের করে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে একটি স্টেট আদালত মসজিদের পক্ষে রায় দিয়ে টাউন বোর্ডের সিদ্ধান্তকে ‘অযৌক্তিক ও খামখেয়ালি’ বলে আখ্যায়িত করে। তবে টাউন কর্তৃপক্ষ এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে। একই ধরনের ঘটনা ঘটে টাউন অব অয়েস্টার বে-তে অবস্থিত মসজিদ আল-বাকির ক্ষেত্রে। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে ২০২৫ সালের অক্টোবরে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো হয়, যেখানে মসজিদটিকে মূল পরিকল্পনার তুলনায় ছোট আকারে সম্প্রসারণের অনুমতি দেওয়া হয়।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের বিরোধের মূল কারণ হলো স্থানীয় জোনিং আইন, যা অনেক ক্ষেত্রে অস্পষ্ট এবং প্রশাসনকে অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রদান করে। ট্রাফিক, পার্কিং এবং নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্প্রসারণ আটকে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আইন রিলিজিয়াস ল্যান্ড ইউজ অ্যান্ড ইনস্টিটিউশনালাইজড পারসন্স অ্যাক্ট (আরএলইউআইপিএ) অনুযায়ী, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেক্যুলার প্রতিষ্ঠানের মতো সমানভাবে বিবেচনা করতে হয়। কিন্তু মসজিদগুলোর আইনজীবীরা অভিযোগ করেছেন যে নর্থ হেম্পস্টেড এবং অয়েস্টার-বে উভয় টাউনই এ আইন লঙ্ঘন করেছে। আইনজীবী মুহাম্মদ ফারিদি বলেন, প্রশাসন সাধারণত ট্রাফিক ও নিরাপত্তার মতো বিষয় তুলে ধরে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আবেদন বাতিল করে। এটি একটি জাতীয় পর্যায়ে ব্যবহৃত কৌশল।
অন্যদিকে স্থানীয় প্রশাসন তাদের সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে দাবি করেছে। নর্থ হেম্পস্টেডের এক মুখপাত্র বলেন, আমরা এলাকার বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার মান বজায় রাখতে কাজ করছি। ট্রাফিক, নিরাপত্তা ও পার্কিং এসব বিষয় বিবেচনায় রেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অয়েস্টার বে প্রশাসনও জানিয়েছে, তাদের জোনিং কোড লাইব্রেরি, থিয়েটার, জাদুঘর ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সব ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রয়োগ করা হয়।
হিলসাইড ইসলামিক সেন্টার ২০১৪ সালে নির্মিত হয়, যখন মুসল্লির সংখ্যা দ্রুত বাড়ছিল। প্রথমে এটি ছিল মাত্র ১ হাজার বর্গফুটের একটি ছোট জায়গা। বর্তমানে প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ মুসল্লি নিয়মিত জুমার নামাজে অংশ নেন, যেখানে এক দশক আগে এই সংখ্যা ছিল ২০০ থেকে ৩০০। নাসাউ কাউন্টিতে দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা গত দুই দশকে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। ফলে ধর্মীয় স্থানের চাহিদাও বেড়েছে।
মসজিদের সম্প্রসারণ নিয়ে অনুষ্ঠিত জনশুনানিতে অনেক স্থানীয় বাসিন্দা আপত্তি জানান। তারা অভিযোগ করেন, মসজিদের কারণে ট্রাফিক জ্যাম, অবৈধ পার্কিং, শব্দদূষণ এবং আশেপাশে আবর্জনার সমস্যা তৈরি হচ্ছে। তবে মসজিদ কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, তারা নিয়ম মেনে চলার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এমনকি কিছু তরুণ স্বেচ্ছাসেবক নামাজের সময় আশেপাশের রাস্তায় নজরদারি করে যাতে কেউ অবৈধভাবে গাড়ি পার্ক না করে।
গবেষণা অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ৩৫ শতাংশ মসজিদ নির্মাণ বা সম্প্রসারণে বাধার সম্মুখীন হয়েছে, যেখানে ১৯৮০ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে এই হার ছিল ২৫ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ইসলামভীতির বৃদ্ধির একটি ইঙ্গিত। কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (কেয়ার) জানিয়েছে, ২০২৫ সালে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের অভিযোগ রেকর্ড সংখ্যায় পৌঁছেছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পর্যায়েও মুসলিমবিরোধী বক্তব্য বেড়েছে।
লংআইল্যান্ডের বিভিন্ন শহরে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা আলাদা নিয়ম রয়েছে। কোথাও বিশেষ অনুমতি নিতে হয়, কোথাও পার্কিংয়ের জন্য আলাদা মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। এই বৈচিত্র্যময় এবং অনেক ক্ষেত্রে অস্পষ্ট নিয়ম প্রশাসনকে ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেয় বলে মনে করেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
বেথপেজের মসজিদ আল-বাকি বহু বছর ধরে সম্প্রসারণের চেষ্টা করে আসছে। ২০১০ সালে রমজানের ঠিক আগে একটি হঠাৎ পরিদর্শনের মাধ্যমে মসজিদটি বন্ধ করে দেয় অয়েস্টার বে প্রশাসন। পরে জানা যায়, একটি নতুন আইন অনুযায়ী কমপক্ষে ১ একর জমি না থাকলে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান চালানো যাবে না, যেখানে মসজিদের জমি ছিল সামান্য কম। পরবর্তীতে মসজিদ কর্তৃপক্ষ পাশের জমি কিনে নেয়, যার জন্য তাদের ১ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়।
বর্তমানে হিলসাইড ইসলামিক সেন্টারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। মামলার রায়, আপিল এবং নতুন আইনি প্রক্রিয়াসহ সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল। অন্যদিকে মসজিদ আল-বাকির মুসল্লিরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে আর কোনো বাধার সম্মুখীন হতে হবে না।
লংআইল্যান্ডের এ দুটি ঘটনা শুধু স্থানীয় বিরোধ নয়; এটি বৃহত্তর একটি জাতীয় সমস্যার প্রতিফলন। ধর্মীয় স্বাধীনতা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।