১৯ অগাস্ট ২০২৬, বুধবার, ০৬:৪৩:২২ অপরাহ্ন


নন সিটিজেনদের ভোট নিয়ে ভিন্ন চিত্র
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৯-০৮-২০২৬
নন সিটিজেনদের ভোট নিয়ে ভিন্ন চিত্র ভোট


যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে নন সিটিজেন বা মার্কিন নাগরিক নন এমন ব্যক্তিদের ভোট দেওয়া নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আবারও তীব্র হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন, বিপুলসংখ্যক অবৈধ অভিবাসী যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন। এ কারণে তিনি কংগ্রেসকে কঠোর ভোটার যাচাই আইন পাসের আহ্বান জানিয়েছেন। তবে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, নন সিটিজেনদের ভোট দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল এবং এটি জাতীয় পর্যায়ে বড় ধরনের নির্বাচনী সংকট তৈরি করছে এমন শক্ত প্রমাণ নেই। এ বিতর্কে রক্ষণশীল গবেষণা প্রতিষ্ঠান হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের তথ্য বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি নির্বাচনী অনিয়মের একটি জাতীয় ডাটাবেস পরিচালনা করে এবং নির্বাচনী আইন কঠোর করার পক্ষে এই তথ্য ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু সেই ডাটাবেসের তথ্য বিশ্লেষণ করলেও নন সিটিজেনদের ব্যাপক হারে ভোট দেওয়ার চিত্র পাওয়া যায় না।

২০০০ সাল থেকে হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের ডাটাবেসে নন সিটিজেনদের ভোট দেওয়ার প্রমাণিত ঘটনা ছিল ৬৮টি। পরে আরো ২১টি ঘটনা যুক্ত হওয়ায় মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৯টি। ডাটাবেসে থাকা মোট ১ হাজার ৬১৯টি নির্বাচনী অপরাধ বা অনিয়মের ঘটনার মধ্যে নন সিটিজেন ভোটের ঘটনা মাত্র ৫.৫ শতাংশ। গত কয়েক দশকের বিপুলসংখ্যক ভোটের তুলনায় এ সংখ্যা আরো নগণ্য। ২০০০ সাল থেকে অনুষ্ঠিত সাতটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট পড়েছে কোটি কোটি। এমনকি ৮৯টি ঘটনাকে একই নির্বাচনে ঘটেছে বলে ধরলেও মোট ভোটের তুলনায় এর হার এক লাখ ভাগের এক ভাগেরও কম। ফলে এসব ঘটনা বাস্তব হলেও তা কোনো প্রেসিডেন্ট নির্বাচন বা বড় কোনো নির্বাচনের ফলাফল পাল্টে দিয়েছে এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না।

ফেডারেল আদালতের তথ্যও একই ধরনের চিত্র তুলে ধরে। ১৯৯৬ সালের একটি ফেডারেল আইনের আওতায় গত ৩০ বছরে নন সিটিজেনদের ভোট দেওয়ার অভিযোগে মাত্র ১২৯ জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৭৩ জনের সাজা হয়েছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এসব দণ্ডের প্রায় ৮০ শতাংশই বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা বা গ্রিনকার্ডধারীদের বিরুদ্ধে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ অবৈধ অভিবাসীরা ব্যাপকভাবে ভোট দিচ্ছেন এমন রাজনৈতিক দাবির সঙ্গে আদালতের তথ্যের মিল পাওয়া যায় না।

হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের ডাটাবেসের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে আরো একটি বিষয় সামনে আসে। নন সিটিজেনদের ভোট দেওয়ার অনেক ঘটনাই পরিকল্পিত নির্বাচনী জালিয়াতির পরিবর্তে আইন সম্পর্কে ভুল ধারণা বা প্রশাসনিক ত্রুটির সঙ্গে সম্পর্কিত।

উদাহরণ হিসেবে, ২০০২ সালে ফ্লোরিডায় ১৫ জন গ্রিনকার্ডধারীর বিরুদ্ধে বেআইনিভাবে ভোট দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ১১ জন ভোট দেওয়ার কথা স্বীকার করলেও জানান, তারা জানতেন না যে গ্রিনকার্ডধারীরা ভোট দিতে পারেন না অথবা অন্যদের কাছ থেকে ভুল তথ্য পেয়েছিলেন।

অন্যদিকে অনিবন্ধিত বা অবৈধ অভিবাসীদের ভোট দেওয়ার ঘটনা আরো বিরল। হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের ডাটাবেসে এমন ঘটনা মাত্র ১৬টি। এসব ঘটনার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে নিজেদের মার্কিন নাগরিক হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন।

নন সিটিজেন ভোটার নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সরকারি ব্যবস্থার ভুলও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। নিউ জার্সিতে একটি সফটওয়্যার ত্রুটির কারণে ৬ হাজার ৬০০-এর বেশি নন সিটিজেন অনিচ্ছাকৃতভাবে ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছিলেন। তাদের নিবন্ধন ফরমেই তারা মার্কিন নাগরিক নন বলে উল্লেখ করেছিলেন। রাজ্য কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, এদের মধ্যে ৪০০ জনেরও কম ওই নিবন্ধন ব্যবহার করে ভোট দিয়েছিলেন। তাদের ভোট দেওয়ার সময় কতজন ইতোমধ্যে নাগরিকত্ব পেয়েছিলেন, তা অবশ্য স্পষ্ট নয়।

নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য প্রস্তাবিত ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির সেভ ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও ভুল শনাক্তকরণের ঝুঁকি রয়েছে। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে সম্ভাব্য নন সিটিজেন ভোটার শনাক্ত করতে গিয়ে প্রকৃত মার্কিন নাগরিকদেরও তালিকাভুক্ত করার ঘটনা ঘটেছে। মিসৌরিতে সেভ ডাটার মাধ্যমে সম্ভাব্য নন সিটিজেন হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের ৩৫ শতাংশ ভোট দেওয়ার সময় ইতোমধ্যে মার্কিন নাগরিকত্ব অর্জন করেছিলেন।

ফলে নন সিটিজেনদের ভোট দেওয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব এমন দাবি যেমন সঠিক নয়, তেমনি এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ব্যবস্থার ব্যাপক বা জাতীয় সংকট হিসেবে তুলে ধরার মতো শক্ত প্রমাণও এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। বরং বিদ্যমান তথ্য বলছে, এ ধরনের ঘটনার বড় একটি অংশের পেছনে রয়েছে আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা, সরকারি নিবন্ধন ব্যবস্থার ত্রুটি কিংবা পরিচয় যাচাইয়ের জটিলতা।

বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনী নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভোটার নিবন্ধন ব্যবস্থার নির্ভুলতা বাড়ানো, সরকারি কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং প্রশাসনিক ভুল কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে নন সিটিজেনদের ভোট ঠেকাতে গিয়ে যেন প্রকৃত মার্কিন নাগরিকদের ভোটাধিকার বাধাগ্রস্ত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।

শেয়ার করুন