সার্জিও গোরকে সম্মাননা দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
সার্জিও গোর। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠজনের একজন। গত ৩০ জুলাই থেকে ১ আগস্ট পর্যন্ত তিন দিনের সফরে ঢাকায় আসেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোর। সফরকালে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন, কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সফর শেষে মার্কিন দূতাবাসের বিবৃতিতে বলা হয়, এই সফর দুই দেশের সম্পর্কের গভীরতা ও ব্যাপ্তি তুলে ধরেছে এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
এই সফর একেবারে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মার্চে সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর এবং মে মাসে সহকারি বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডান লিঞ্চ ঢাকা সফর করেছিলেন। অর্থাৎ গত কয়েক মাসে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ঢাকার প্রতি ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক মনোযোগ লক্ষণীয়।
যে বৈঠক নিয়ে বিতর্ক
সফরের একটি অংশ বিশেষভাবে আলোচনায় উঠে আসে ঢাকার একটি হোটেলে গোরের সঙ্গে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠক। বিষয়টি নজরে আসার একটি বড় কারণ হলো, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক এই মার্কিন দূত সফরকালে অঞ্চলের অন্য কোনো দেশের ঢাকাস্থ রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে পৃথকভাবে বৈঠক করেননি। ফলে শুধু ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গেই কেন এই বৈঠক, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে।
জামায়াতের প্রতিক্রিয়া
সিলেটে এক অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এই বৈঠককে “কাম্য নয়” বলে মন্তব্য করেন। তাঁর মূল যুক্তি ছিল গণতান্ত্রিক একটি দেশে বিদেশি দূতদের মধ্যে যদি নিছক সৌজন্য সাক্ষাতের বাইরে বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে আলোচনা হয়ে থাকে, তবে সেটি বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গেই হওয়া উচিত, কোনো একক বিরোধী দল বা তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে নয়। তিনি এ প্রসঙ্গে ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়ে জামায়াতের উদ্বেগের কথাও পুনরুল্লেখ করেন।
এটি অবশ্য জামায়াত-ত্রিবেদী দ্বন্দ্বের প্রথম ঘটনা নয়। এপ্রিলে ভারত সরকার সাবেক রেলমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়, যা দুই দেশের ৫৫ বছরের কূটনৈতিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো পেশাদার কূটনীতিকের বদলে একজন রাজনীতিবিদকে এই পদে বসানোর নজির তৈরি করে। জুন মাসে সড়কপথে ঢাকায় যোগদানের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে প্রবেশ করে ত্রিবেদী বাংলাদেশ ও ভারতের “একই আকাশ, একই বাতাস” এমন এক মন্তব্য করলে জামায়াত এর তীব্র প্রতিবাদ জানায় এবং বাংলাদেশের অখণ্ডতা প্রসঙ্গে সরকারের কাছে ব্যাখ্যা দাবি করে।
অর্থাৎ গোর-ত্রিবেদী বৈঠক নিয়ে সাম্প্রতিক সমালোচনাকে বিচ্ছিন্ন প্রতিক্রিয়া হিসেবে না দেখে বরং একটি ধারাবাহিক অবস্থানের অংশ হিসেবে দেখাই যুক্তিসঙ্গত।
এদিকে সরকার ও মার্কিন দূতাবাসের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি নিছক দুই মিত্র দেশের কূটনীতিকদের মধ্যে সৌজন্য বিনিময়। আঞ্চলিক ইস্যুতে সমমনা দেশগুলোর দূতদের পরস্পরের সঙ্গে বৈঠক করা কূটনীতিতে অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে অন্য কোনো দেশের দূতের সঙ্গে না বসে শুধু ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গেই বৈঠক করাটাকে অনেক বিশ্লেষক যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সমন্বিত দক্ষিণ এশিয়া নীতির ইঙ্গিত হিসেবে পড়ছেন, বিশেষত যখন সাম্প্রতিক মাসগুলোয় বাংলাদেশের চীন ও রাশিয়ার দিকে ঝোঁকা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে যখন আলোচনা চলছে।
জামায়াতের প্রতিক্রিয়াকে নিছক পররাষ্ট্রনীতি-বিষয়ক আপত্তি হিসেবে না দেখে বিরোধী দল হিসেবে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করার একটি মঞ্চ হিসেবেও দেখা যায়। অনেকেই মনে করে তাহলে জামায়াতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের কী কোনো অবনতি ঘটলো কি না?
আসলে “যুক্তরাষ্ট্র-জামায়াত সম্পর্কে ফাটল” এ ধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এখনও তাড়াহুড়ো হবে। জামায়াতের সমালোচনার লক্ষ্য মূলত ত্রিবেদী ও তাঁর মাধ্যমে ভারতের ভূমিকা নিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি বিরোধ নয় এটাই সম্ভবত বাস্তব। তাছাড়া গত নির্বাচনকে ঘীরে জামায়াতের নেতৃবৃন্দের বিভিন্ন সময়ের কথাবার্তায় বরং জামায়াতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভাল সম্পর্ক সেটাই প্রকাশ পেয়েছে।