২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বুধবার, ০৯:৫২:৬ অপরাহ্ন


উত্তরাধিকারের বোঝা
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কষাঘাতে মানুষ
মাসউদুর রহমান
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৩-০৯-২০২৬
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কষাঘাতে মানুষ পেট্রোল পাম্প


বাংলাদেশের তৃণমূলের সাধারণ মানুষও তুলনামুলক যথেষ্ট সচেতন। নতুন সরকারকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসিয়েছেন অনেক ভালবাসা দিয়ে। প্রত্যাশা আগের সরকারের স্বৈরাচারি মনভাব ও জনগণের মতামত উপেক্ষা করে দেশ চালানোর নীতি থেকে সরে এসে দেশ ও সমাজে তারা যেন স্বাভাবিক এক জীবন যাপন, শান্তিতে বসবাস করতে পারে। হয়ে উঠতে পারেন সুনাগরিক। ফিরে পান সব নাগরিক অধিকার। কিন্তু ৭ মাস না যেতেই মানুষ অতিষ্ঠ্য, বিরক্ত হতে শুরু করেছে। বিশেষ করে লোড শেডিং, গ্যাস সঙ্কট, দ্রব্য মূল্যের ক্রমাগত উর্ধগতি। নানা সমীকরণে মানুষ এসবও মেনে নিচ্ছে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থ পাচারসহ নানা অসঙ্গতিপূর্ণ অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের জন্য। কিন্তু হঠাৎ পেট্রোল, কেরোসিন, ডিজেলের প্রতিটিতে লিটারে ২০ টাকা মুল্যবৃদ্ধি মানুষ ভালভাবে নেয়নি। দু’এক টাকা, বা দু’চার টাকাও মানা যায়। তাই বলে এক লাফে কাটায় কাটায় কুড়ি? 

এর প্রভাব নিত্যপণ্যের বাজার কোথায় নিয়ে যাবে সে চিন্তায় সাধারণ মানুষের ঘুম হারাম হবার উপক্রম। কারণ ডিজেল মালামাল পরিবহনের মূল জ্বালানি। এর মুল্যবৃদ্ধি মানেই প্রতিটা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষের উপর সরাসরি প্রভাব পড়া। এবং সেটা অমন বৃদ্ধিতে মাত্রাতিরিক্ত হওয়ার উপক্রম। বাড়ছে পরিবহন ভাড়াও। কিন্তু মানুষের ইনকাম কী বেড়েছে? না। কতিপয় মানুষ বুঝতে পারছে যে এটা বিএনপি ইচ্ছা করেই করেনি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের নানা কর্মকান্ডের ফসল বয়ে বেড়াচ্ছে বর্তমান নির্বাচিত সরকার। বাধ্য হয়েই দাতে দাত চেপে ওই জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধিতে গেছেন। কিন্তু জনমনে প্রশ্ন, এমনি মুহূর্তে এমন কী হলো যে সরকারি কর্মচারিদের নতুন এক পে স্কেলে যেতে হবে। এখানেও যে দীর্ঘদিনের চাওয়া পাওয়া রয়েছে, সেটা সাধারণ মানুষের জানার কথাও না। বিপত্তি এসব স্থানেই। 

যেহেতু মানুষ সচেতন দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষাপট নিয়ে ব্যপক আলোচনা ও প্রচার করে মানুষকে বুঝিয়ে ওই পর্যায় গেলে হয়তো এতোটা ক্ষোভ প্রকাশ করতো না। কিন্তু হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত, এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছাড়াও বিরোধীদল সমূহের সরকারের বিরুদ্ধে যে প্রপাগান্ডা, লংমার্চ, মিছিল মিটিং, প্রতিবাদ- তাতে আরো বেশি কনফিউজ। বিএনপি সরকার এ ব্যাপারে সাধারণ মানুষকে জানানো বা বুঝানোর কোনো উদ্যোগই নেয়নি। 

বলার অপেক্ষা রাখে না- যে ক্ষমতার মসনদ ফুলের বিছানা নয়। উত্তরাধিকারে পাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, ঋণের কিস্তি, জ্বালানির চাপ আর মানুষের প্রত্যাশা: এই ত্রিমুখী সাঁড়াশির মধ্যে দাঁড়িয়ে নতুন সরকার।

নির্বাচনে জয়ের আনন্দ ক্ষণস্থায়ী, আর শাসনের পরীক্ষা দীর্ঘস্থায়ী। ক্ষমতায় আসার কয়েক মাসের মাথায় বিএনপি সেই কঠিন সত্যটাই হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। সরকারের কোষাগারের ত্রাহি অবস্থা। বাজারে অস্থিরতার আশঙ্কা, আর সাধারণ মানুষ জানতে চাইছে, “আমাদের জীবন কি সহজ হবে-কখন?”

উত্তরাধিকারের বোঝা

নতুন সরকার যে অর্থনীতি হাতে পেয়েছে, তা কোনো সুস্থ অর্থনীতি নয়। দীর্ঘ সময় ধরে মেগা প্রকল্পের নামে বিদেশি ঋণে ভর করে অবকাঠামো গড়া হয়েছে। অনেক প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ, সময় পেরিয়েছে বছরের পর বছর, আর অভিযোগ আছে অর্থের বড় একটা অংশ পাচার হয়েছে বা অপচয়ে গেছে। এর পরিণতি এখন দৃশ্যমান। দেশের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি আনুমানিক একশ বিলিয়ন ডলারের আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। বিভিন্ন প্রকল্পের ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে আসল ও সুদ পরিশোধের কিস্তি একসঙ্গে ঘাড়ের ওপর চেপে বসছে। ফলে সরকারের তহবিলে যোগ হওয়া অর্থের একটা বড় অংশ চলে যাচ্ছে ঋণ শোধে। উন্নয়ন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা সামাজিক নিরাপত্তায় খরচ করার সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। ফলে ঋণ করে ঘী খাওয়ার আসল মজা এখন সাধারন মানুষ টের পাচ্ছে। 

সঙ্কটটা শুধু ঋণের নয়, ঋণ শোধের সক্ষমতারও। রাজস্ব আদায়ে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে জিডিপির অনুপাতে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে দুর্বল দেশগুলোর একটি। যে দেশে কর দেয় হাতে গোনা মানুষ, সেখানে খরচ বাড়ানোর সীমা সহজেই ফুরিয়ে যায়।

অন্তর্বর্তী সরকারের “মাঝপথের” রেশ

এই প্রেক্ষাপটে গত অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা আলোচ্য বিষয়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার প্রায় ১৮ মাস দেশ চালিয়েছে। সংস্কারের অনেক প্রতিশ্রুতি ছিল, কিছু উদ্যোগও দৃশ্যমান হয়েছে। কিন্তু অর্থনীতির ক্ষেত্রে সমালোচকদের বক্তব্য, অন্তর্বর্তী সরকার অনেক ক্ষেত্রে “ধরি মাছ, না ছুঁই পানি” নীতিতে চলে সময় পার করে গেছে। অনির্বাচিত সরকারের রাজনৈতিক ম্যান্ডেট সীমিত থাকে বলে কঠিন সিদ্ধান্ত ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। জ্বালানির দাম, বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি, ব্যাংক খাতের সংস্কার, খেলাপি ঋণ, সবখানেই দৃঢ় জরুরি পদক্ষেপের চেয়ে সময়ক্ষেপণ বেশি চোখে পড়েছে। ফলে যে বোঝা আগের সরকার রেখে গিয়েছিল, তা কমেনি। উল্টো কিছু সিদ্ধান্তের খরচ ও দায় এখন এসে পড়েছে নির্বাচিত সরকারের কাঁধে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ এর ক্ষেত্রে। 

এখানে অবশ্য ন্যায্যতার প্রশ্ন আছে। একটি অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে সবকিছু আশা করাও সঙ্গত নয়। কিন্তু রাজনীতির নির্মম বাস্তবতা হলো, জনগণ পূর্বসূরির দোষ শুনতে চায় না। তারা দেখে, এখন কে ক্ষমতায় আছে এবং তাদের থালায় ভাত আছে কি না। তারা মানুষকে স্বস্থি দিচ্ছে কি না। 

উপসাগরের আগুন, কুইক রেন্টাল ও আদানি

সঙ্কটের সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গা জ্বালানি। উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধের দামামা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে অনিশ্চয়তা ও ঊর্ধ্বগতি তৈরি করেছে। আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য এটি সরাসরি আঘাত। ডলারের সঙ্কট থাকা অবস্থায় বেশি দামে জ্বালানি কেনা মানে রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিগত সরকারগুলোর বিদ্যুৎ নীতির উত্তরাধিকার। “কুইক রেন্টাল” নামের যে ব্যবস্থায় জরুরি প্রয়োজনের অজুহাতে বিদ্যুৎকেন্দ্র বসানো হয়েছিল, তা এখন গলার কাঁটা। এসব চুক্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন হোক বা না হোক, ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দিতে হয়। বছরে এই বাবদ যে অঙ্ক যায়, তা আনুমানিক কয়েক হাজার কোটি টাকা, যা বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি বাড়ায় আর শেষ পর্যন্ত বোঝা হয়ে দাঁড়ায় ভোক্তা ও সরকারের তহবিলের ওপর। এর সঙ্গে ভারত থেকে আমদানি করা আদানির বিদ্যুৎ চুক্তির বকেয়া ও সেই সম্পর্কিত জটিলতা সামলাতে হচ্ছে, যেখানে বিদেশি মুদ্রায় অর্থ পরিশোধের চাপ, আইনি ও কূটনৈতিক সংবেদনশীলতা, দুটোই আছে।

এসব চাপ সামাল দিতে গিয়ে সরকার ক্ষমতায় আসার সাত মাসের মাথায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে। মানুষের মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক: “নতুন সরকার এসেও তো সেই একই পথে হাঁটছে?” এই ধারণা দূর করাই সরকারের প্রথম রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। কিন্তু বিষয়গুলো নিয়ে সরকার দলের সদস্য কিংবা বিএনপির লোকজনের মানুষকে বুঝানোর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। ফলে মানুষ অন্ধকারে এবং অনুমান নির্ভর কথাবার্তা ও গুজবে সব গুলিয়ে ফেলছে। 

পে স্কেল ও তেলের দাম: দুই ধারার সংঘাত

সবচেয়ে জটিল সমীকরণটা এখানেই। একদিকে সরকারি কর্মচারিদের জন্য নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা, অন্যদিকে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি। পে স্কেল দেওয়ার কারণ বোঝা যায়। সীমিত আয়ের সরকারি কর্মচারিরা দীর্ঘদিন মূল্যস্ফীতির চাপে ধুঁকছেন, তাঁদের দাবি ন্যায্য, এবং রাজনৈতিকভাবে এই শ্রেণিকে অসন্তুষ্ট রাখা ঝুঁকিপূর্ণ।

কিন্তু হিসাবটা আরেকটু গভীরে দেখা দরকার। দেশের প্রায় ১৭ কোটির অধিক মানুষের মধ্যে সরকারি চাকরিজীবী ও পেনশনভোগী মিলিয়ে সংখ্যাটা কয়েক মিলিয়ন মাত্র। বাকি বিপুল জনগোষ্ঠী, আয় রোজগারহীন বেকার, দিনমজুর, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, গার্মেন্টস শ্রমিক, কৃষক, বেসরকারি চাকরিজীবী, পে স্কেলের সুবিধা পাবেন না, অথচ তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ, সার-সেচের খরচ ও পণ্যের দাম বাড়ার ধাক্কা তাঁদেরই সবচেয়ে বেশি সইতে হবে। 

অতীতে দেখা গেছে, বাংলাদেশে বাজার সবসময় খবরের আগেই নড়ে ওঠে। এক সময় দেখা যেত পে স্কেল ঘোষণা ও জ্বালানির দাম বাড়ার খবর এলেই কিছু ব্যবসায়ী দাম বাড়িয়ে দিতেন, কারণ তাঁরা জানেন, একবার বাড়া দাম আর নামে না। সিন্ডিকেট, মজুতদারি ও সরবরাহ শৃঙ্খলে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্যের জন্য আমাদের বাজার এমনিতেই কুখ্যাত। কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি ৮-৯ শতাংশের ঘরে আটকে আছে। এই অবস্থায় নতুন করে ঢেউ উঠলে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের সঞ্চয় ও কেনার ক্ষমতা আরও দুর্বলতম হয়ে যাবে। সরকার এই অস্থিরতা, জ্বালানি মুল্যবৃদ্ধির কষাঘাত কীভাবে সামাল দেবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

সবশেষ 

অতীতে দেখা গেছে, বাংলাদেশের মানুষ ধৈর্যশীল, কিন্তু অন্তহীন নয়। যাঁরা এই দেশে বহু সরকারের উত্থান-পতন দেখেছেন, তাঁরা জানেন, জনরোষ জমতে সময় লাগে, কিন্তু একবার ফুঁসে উঠলে তা কোনো ক্ষমতাকেই ছাড় দেয় না। বিএনপি এমন এক সময়ে ক্ষমতায় এসেছে, যখন মানুষ পরিবর্তনের প্রত্যাশা নিয়ে বসে আছে। সেই প্রত্যাশা যদি “আগের সরকারের দোষ” শোনানোর মধ্যেই আটকে যায়, তাহলে ভরসা হারাতে সময় লাগবে না।

পূর্বসূরির ব্যর্থতা ব্যাখ্যা করা সহজ, কিন্তু সেই ব্যর্থতার ভার নিয়েই মানুষের জীবনে স্বস্তি এনে দেখানো কঠিন। এই কঠিন কাজটাই এখন বিএনপির সামনের বড় পরীক্ষা। সঙ্কটকে যদি তারা সংস্কারের সুযোগে বদলাতে পারে, ইতিহাস তাদের মনে রাখবে সেই সরকার হিসেবে, যারা দুঃসময়ে সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আর যদি তা না পারে, তাহলে আজকের এই “বিশাল চ্যালেঞ্জ” আগামী দিনের রাজনৈতিক অনেক বড় মূল্য হয়ে দাঁড়াবে বৈকি!

শেয়ার করুন