অভিনেত্রী পূর্ণিমা
ঢালিউডের কয়েক দশকের জনপ্রিয়তার প্রতীক চিত্রনায়িকা পূর্ণিমা। রূপ, অভিনয় আর ব্যক্তিত্বের জাদুতে তিনি আজও দর্শকদের কাছে ‘চিরসবুজ’। দীর্ঘ ক্যারিয়ারের অভিজ্ঞতা ও বর্তমান ব্যস্ততা নিয়ে তিনি কথা বলেছেন নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত পাঠকপ্রিয় দেশ পত্রিকার সাথে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আলমগীর কবির
প্রশ্ন: শুরুতেই আপনার সাম্প্রতিক সেই ভাইরাল ছবিগুলো নিয়ে কথা বলি। গাঢ় সবুজ পোশাক আর সোনালি নকশার সেই রাজকীয় লুকে আপনাকে দেখে ভক্তরা রীতিমতো মুগ্ধ। এই যে সময়কে জয় করে ‘চিরসবুজ’ থাকা এর রহস্য কী?
পূর্ণিমা: (হাসি) ভক্তদের এই ভালোবাসা আমার জন্য বড় পাওয়া। আসলে রহস্য বলতে কিছু নেই, মন ভালো রাখলে তার প্রতিফলন হয়তো চোখে-মুখে পড়ে। সম্প্রতি ছবিগুলো তোলার সময় লাল আলো আর সোনালি ব্যাকড্রপ একটা ভিন্ন আবেদন তৈরি করেছিল। তবে আমার কাছে সৌন্দর্য্য মানে শুধু বাহ্যিক রূপ নয়, বরং নিজের ব্যক্তিত্ব আর রুচির সঠিক উপস্থাপন।
প্রশ্ন: আপনি সম্প্রতি ‘অস্তিত্বের লড়াই’ নামে একটি প্রামাণ্যচিত্রের কাজ শেষ করেছেন। সত্তরের সেই প্রলয়ঙ্করী দুর্যোগ নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
পূর্ণিমা: এটি আমার জন্য একদমই অন্যরকম একটি অভিজ্ঞতা। ১৯৭০ সালে ভোলায় ঘটে যাওয়া সেই মর্মান্তিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সব মিলিয়ে গল্পটি বেশ আবেগঘন। ‘প্রেমের তাজমহল’ খ্যাত গাজী মাহবুব ভাই এটি পরিচালনা করেছেন। মানবসুর উন্নয়ন সংস্থার (মাউস) এই উদ্যোগটির মূল লক্ষ্য হলো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো। এমন সচেতনতামূলক কাজের অংশ হতে পেরে আমি গর্বিত।
প্রশ্ন: আপনার ক্যারিয়ারের শুরুটা ছিল খুব অল্প বয়সে। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থেকে এসে নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয়, আর ১৭ বছর বয়সেই ‘এ জীবন তোমার আমার’-এর মাধ্যমে প্রধান নায়িকা হওয়া। সেই দিনগুলোর কথা কি খুব মনে পড়ে?
পূর্ণিমা: হ্যাঁ, জীবনটা অনেক দ্রুত বদলে গিয়েছিল। ফটিকছড়ির সেই রঙিন শৈশব পেরিয়ে ঢাকায় আসা এবং জাকির হোসেন রাজু ভাইয়ের হাত ধরে নায়িকা হিসেবে অভিষেক সবটাই স্বপ্নের মতো। প্রথম ছবিতেই রিয়াজ সাহেবকে সহশিল্পী হিসেবে পেয়েছিলাম, যা ক্যারিয়ারের পরবর্তী সময়ে আমাদের জুটিকে দর্শকদের প্রিয় করে তুলতে সাহায্য করেছিল।
প্রশ্ন: রিয়াজ-পূর্ণিমা জুটি মানেই দর্শকদের কাছে এক বাড়তি উন্মাদনা। ‘মনের মাঝে তুমি’ বা ‘হৃদয়ের কথা’র মতো ছবিগুলো এখনো মানুষের মুখে মুখে। সহশিল্পী হিসেবে রিয়াজের সঙ্গে আপনার রসায়ন নিয়ে কী বলবেন?
পূর্ণিমা: আমাদের রসায়নটা গড়ে উঠেছিল দর্শকদের ভালোবাসায়। রিয়াজ-পূর্ণিমা জুটির ছবিগুলো বাণিজ্যিকভাবে সফল হওয়ার পাশাপাশি মানুষের মনের খুব কাছে পৌঁছাতে পেরেছিল। তবে রিয়াজ ছাড়াও আমি মান্না ভাই, ফেরদৌস, আমিন খান থেকে শুরু করে শাকিব খানের সঙ্গেও কাজ করেছি। প্রত্যেক সহশিল্পীর কাছ থেকেই আমি কিছু না কিছু শিখেছি।
প্রশ্ন: চলচ্চিত্র ছাড়াও আপনাকে বিজ্ঞাপন এবং ছোটপর্দায় দারুণ সফল হতে দেখা গেছে। বিশেষ করে ‘লাল নীল বেগুনী’ ধারাবাহিকের কথা এখনো দর্শকরা মনে রেখেছেন...
পূর্ণিমা: আসলে আমি শুরু থেকেই নাচ-গানের চর্চা করতাম। তাই শুধু সিনেমার বড় পর্দায় নয়, নাটক বা টেলিফিল্মেও কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। ‘ল্যাবরেটরি’ বা ‘নিলিমার প্রান্তে’র মতো কাজগুলো আমাকে ভিন্ন ধরনের চরিত্র করার সুযোগ দিয়েছিল। আর বিজ্ঞাপনের কথা যদি বলেন, গ্রামীণফোন বা মেরিল-এর মতো ব্র্যান্ডের কাজগুলো আমাকে সাধারণ মানুষের আরও কাছে নিয়ে গেছে।
প্রশ্ন: আপনার ঝুলিতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার থেকে শুরু করে অসংখ্য মেরিল পুরস্কার আছে। বিশেষ করে ‘ওরা আমাকে ভালো হতে দিল না’ ছবির কথা বলতেই হয়। স্বীকৃতির গুরুত্ব আপনার কাছে কতটুকু?
পূর্ণিমা: স্বীকৃতি সব সময় কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা বাড়িয়ে দেয়। কাজী হায়াৎ সাহেবের ছবিতে কাজ করে যখন জাতীয় পুরস্কার পেলাম, মনে হলো অভিনয়ের সার্থকতা খুঁজে পেলাম। তবে পুরস্কারের চেয়েও বড় পুরস্কার হলো সাধারণ মানুষের ভালোবাসা, যা আমি গত কয়েক দশক ধরে পেয়ে আসছি।
প্রশ্ন: ভক্তদের প্রশ্ন, আপনাকে বড় পর্দায় নিয়মিত কবে দেখা যাবে? ‘জ্যাম’ ও ‘গাঙচিল’ নিয়ে আপডেট কী?
পূর্ণিমা: বর্তমানে আমি কাজ একটু বেছে বেছে করছি। ‘জ্যাম’ আর ‘গাঙচিল’ দুটি ছবিই মুক্তির অপেক্ষায় আছে। এখানে ফেরদৌস আর আরিফিন শুভর সঙ্গে আমাকে দেখা যাবে। সিনেমার বাইরে এখন উপস্থাপনা বা রিয়েলিটি শোর বিচারক হিসেবে মাঝে মাঝে থাকছি। আসলে জীবনের এই পর্যায়ে এসে ভালো গল্প আর শক্তিশালী চরিত্র ছাড়া কাজ করতে চাই না।
প্রশ্ন: ব্যক্তিজীবন এবং মেয়ে আরশিয়া উমাইজার সঙ্গে সময় কাটানো সব মিলিয়ে বর্তমান জীবন নিয়ে আপনি কতটা সুখী?
পূর্ণিমা: আলহামদুলিল্লাহ, আমি খুব ভালো আছি। আশফাকুর রহমান রবিন আর আমার সন্তানকে নিয়ে সুন্দরভাবে দিন কেটে যাচ্ছে। ক্যারিয়ার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, পরিবারের প্রশান্তিও আমার কাছে সমান্তরালভাবে জরুরি। সবার দোয়া নিয়ে এভাবেই এগিয়ে যেতে চাই।
প্রশ্ন: আপনি দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অনেক চড়াই-উতরাই দেখেছেন। বর্তমান সময়ের নতুন প্রজন্মের অভিনয়শিল্পীদের জন্য আপনার পরামর্শ কী থাকবে?
পূর্ণিমা: আমাদের সময়ে কাজের পরিবেশ আর এখনকার পরিবেশের মধ্যে অনেক পার্থক্য। এখন প্রযুক্তির কল্যাণে অনেক কিছু সহজ হয়েছে। তবে আমার পরামর্শ থাকবে পরিশ্রম আর ধৈর্য যেন তারা না হারায়। রাতারাতি তারকা হওয়া যায়, কিন্তু শিল্পী হয়ে টিকে থাকতে হলে কাজকে ভালোবাসতে হয়। আর সবচেয়ে বড় বিষয় হলো বিনয়; দর্শকদের ভালোবাসা ধরে রাখতে হলে বিনয়ী হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
প্রশ্ন: অভিনয়ের বাইরে আপনার উপস্থাপনা বা হাস্যরসের ক্ষমতা দর্শকরা খুব পছন্দ করেন। সোশ্যাল মিডিয়া বা বিভিন্ন শো-তে আপনার এই প্রাণবন্ত রূপটি কি আমরা আরও বড় পরিসরে দেখার আশা করতে পারি?
পূর্ণিমা: (হাসি) আসলে আমি আড্ডা দিতে এবং মানুষকে হাসাতে পছন্দ করি। উপস্থাপনা করতে গিয়ে বুঝেছি, এটি অভিনয়ের চেয়েও চ্যালেঞ্জিং কারণ এখানে তাৎক্ষণিক বুদ্ধি খাটাতে হয়। অনেকেই আমাকে নিয়মিত টকশো বা বড় কোনো আয়োজনের উপস্থাপনায় দেখতে চান। ভালো প্রস্তাব পেলে অবশ্যই বড় পরিসরে কিছু করার পরিকল্পনা আছে। দর্শকদের আনন্দ দিতে পারাটাই তো আসল সার্থকতা!