০৬ অগাস্ট ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ০২:৪১:২৯ পূর্বাহ্ন


বাস্তবভিত্তিক জ্বালানি নীতি হবে কী
সালেক সুফী
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৫-০৮-২০২৬
বাস্তবভিত্তিক জ্বালানি নীতি হবে কী প্রতীকী ছবি


ক্ষণস্থায়ী, আপতকালীন ব্যবস্থা গ্রহণ করে বর্তমান অসহনীয় জ্বালানি বিদ্যুৎ সংকট থেকে কখনোই মুক্তি মিলবে না। জ্বালানি বিদ্যুৎ সেক্টরকে কৌশলগত প্রাধিকারভিত্তিক ঘোষণা করে বাস্তবভিত্তিক পথনকশা বাস্তবায়ন না করা হলে টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা অর্জিত হবে না। ১৯০০-২০২৪ পর্যন্ত প্রতিটি সরকার দেশের জন্য কোনো সমন্বিত জ্বালানি পলিসি গ্রহণ না করে সেক্টরটিকে একান্তই আমলা নিয়ন্ত্রিত সিন্ডিকেট প্রভাবিত ব্যবস্থাপনায় পরিণত করায় মূলত সৃষ্টি হয়েছে বর্তমান সংকট। মাটির নিচে পড়ে রয়েছে আবিষ্কৃত উঁচু মানের কয়লা সম্পদ, স্থলভাগে এবং সাগরে রয়েছে বিপুল তেল গ্যাসের সম্ভাবনা, সৌর বা বায়ু বিদ্যুৎ নিয়ে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। সিন্ডিকেটের অশুভ প্রভাবে জ্বালানি বিদ্যুৎ আমদানিকে প্রাধান্য দিয়ে মহাবিপাকে পড়েছে দেশ। প্রাথমিক জ্বালানি সংকট এখন সর্বস্তরে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষত আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি জ্বালানি বিদ্যুৎ খাতকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রেখে কৌশলগত সেক্টর বিবেচনা করে সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ করলে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না।

বিগত শতাব্দীর নব্বই দশকের শুরু থেকেই দেশের প্রাকৃতিক গ্যাসনির্ভর জ্বালানি নিরাপত্তা ধীরে ধীরে সংকট পথে ধাবিত হয়। মনে আছে ১৯৯৬ নির্বাচনে জয়ী তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার জ্বালানি বিদ্যুৎ সেক্টরে সমন্বিত বেশকিছু ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ২০০০ নাগাদ জ্বালানি বিদ্যুৎ সরবরাহ চেইনে স্বস্তির পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। এ সময়ে বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র, সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছিল। বিয়ানীবাজার, জালালাবাদ, মেঘনা, সালদা গ্যাসক্ষেত্র গ্যাস গ্রিডে সংযুক্ত হয়েছিল। আশুগঞ্জ বাখরাবাদ লুপলাইন নির্মাণ, এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু বরাবর পাইপলাইন স্থাপন করে গ্যাস সঞ্চালন নেটওয়ার্ক দেশের পশ্চিম অঞ্চলে বিস্তৃত করা হয়েছিল। বিদ্যুৎ ক্ষেত্রেও আইপিপি, এসআইপিপি। বার্জ মাউন্টেড বিদ্যুৎক্ষেত্র স্থাপন করে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি করা হয়েছিল। ১৯৯৬-২০০১ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভুল সিদ্ধান্ত ভোলায় আবিষ্কৃত গ্যাস সঞ্চালন নেট ওয়ার্কে সংযুক্ত না করা, সে সময়ে আবিষ্কৃত বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়ন বিষয়ে বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থতা আর বিপুল সম্ভাবনার ব্লক ৯ উন্নয়নে শীর্ষ স্থানীয় আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব উপেক্ষা করে সাধারণ মানের কোম্পানিকে দায়িত্ব দেওয়া।

২০০১-২০০৬ বিএনপি জামায়াত জোট ক্ষমতায় এসে পূর্ববর্তী সরকারের অর্জনগুলোর ধারবাহিকতায় কাজ না করে ভুল পথে কাজ করে গ্যাস অনুসন্ধান আর বিদ্যুৎকেন্দ্রে স্থাপনে ব্যর্থ হয়। এ সময়ে মৌলভীবাজার গ্যাসক্ষেত্র গ্রিডে সংযুক্ত হয়, বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, রশিদপুর আশুগঞ্জ লুপলাইন নির্মিত হয়। তবে সরকার পুরো সময়ে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে ব্যর্থ ছিল। একমাত্র সংযোজন ছিল টঙ্গীতে ৮০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি কেন্দ্র যেটি শুরু থেকে সঠিকভাবে পরিচালিত হয়নি। ব্যর্থতার ষোলকলা পূর্ণ হয়েছিল নাইকো রিসোর্স নামের একটি দুর্বল কানাডিয়ান কোম্পানির ব্যর্থতায় ছাতক, টেংরাটিলায় দুটি গ্যাস বিস্ফোরণে। ফুলবাড়ী কয়লা খনি উন্নয়ন প্রকল্পটিও অশুভ মহলের ষড়যন্ত্রে মুখ থুবড়ে পড়ে। বিএনপি জামায়াত জোট সরকারের অদূরদর্শিতার কারণে মায়ানমার থেকে বাংলাদেশ হয়ে ভারতে গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন অগ্রবর্তী অবস্থানে থেকেও বাতিল হয়। ২০০৬ নাগাদ দেশে তীব্র গ্যাস বিদ্যুৎ সংকট সৃষ্টি হয়। এ সময় ভারতের টাটা বাংলাদেশে স্টিল মিল, সার কারখানা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব দিলেও জ্বালানি সংকট আর ভূরাজনীতির কারণে সেই প্রস্তাব বাস্তবায়নের আলো দেখেনি। ২০০৬ সালে যখন বিএনপি ক্ষমতা থেকে অপসারিত হয় তখন ক্ষমতায় আসা সেনা সমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকার ২০০৬-২০০৮ চেষ্টা করেও পরিস্থিতির উন্নয়নে বেশি কিছু করতে পারেনি।

২০০৮ পুনরায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়ে আওয়ামী লীগ ২০০৯-২০১৪ পর্যন্ত দ্রুত কিছু লাগসই ব্যবস্থা গ্রহণ করে পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটালেও গ্যাস অনুসন্ধান বা আবিষ্কৃত কয়লা সম্পদ উন্নয়ন না করে জ্বালানি আমদানির দিকে ঝুঁকে পড়ে। দেশের উপকূলীয় এলাকায় কয়েকটি আমদানিকৃত কয়লানির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করে চালু করা হয়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়, ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি, পাইপলাইনে জ্বালানি তেল আমদানি এবং ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করে এলএনজি আমদানি শুরু করে। কিন্তু এ সময়ে সরকারের ব্যর্থতা ছিল গ্যাস-তেল আহরণ আর উত্তোলনকে উপেক্ষা করা, কয়লা উত্তোলন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করা এবং ভোলার গ্যাস গ্রিড সংযুক্ত না করা। ২০০৯-২০২৪ পর্যন্ত সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত না করেই বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা চাহিদার চেয়ে দুই গুণ বৃদ্ধি এবং উৎপাদনকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে চুক্তিতে ক্যাপাসিটি চার্জ সংস্থান করা। একে নিজেদের জ্বালানি গ্যাস ক্রমাগত নিঃশেষ হয়ে আসা, উপরন্তু নানা কারণে আমদানিকৃত জ্বালানির উচ্চমূল্য সামাল দিতে সীমাবদ্ধতা এগুলোর সমীকরণে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। সরকারি সংস্থাগুলো বিপুল দায়-দেনা নিয়ে প্রায় দেউলিয়া হয়ে পড়ে।

২০২৬ আগস্ট মাসে এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে বাংলাদেশ জ্বালানি বিদ্যুৎ সরবরাহ চেন জ্বালানি সংকটে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। ৬০ শতাংশ আমদানিনির্ভর সরবরাহ চেইন এখন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল কারিগরি ত্রুটির কারণে দেশজুড়ে জ্বালানি সংকট আতঙ্কের পরাজয়ে পড়েছে। এমন অবস্থার সৃষ্টি হবে সেটি কিন্তু সেই ২০০০ শুরু থেকে দেশের জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা অনুমান করছিল, তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সরকারকে সতর্ক করছিল। কিন্তু আমলা নিয়ন্ত্রিত সিন্ডিকেট প্রভাবিত সরকারগুলো উপেক্ষা করেছে। দায় পড়েছে ভোক্তাদের ওপর।

বর্তমান অবস্থায় এমন কোনো ম্যাজিক ফরমুলা নেই যা স্বল্প সময়ে পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে পারবে। নতুন সরকার ৬ মাস সময়ে পরিস্থিতি উন্নয়নে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বা জবাবদিহিতা আসেনি।

আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান বৃদ্ধির কৌশল নেওয়া হলেও সেই খাতেও দ্রুত সাফল্য আনতে বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোতে ব্যাপক সংস্থান প্রয়োজন। সবচেয়ে আগে প্রয়োজন পেট্রোবাংলাকে সঠিক পেশাদারদের সমন্বিত করে শক্তিশালী করা। স্থল ভাগ আর সাগরে গ্যাস-তেল অনুসন্ধান আর আহরণ যুদ্ধ পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা, কয়লা আহরণের বাস্তব সম্মত ব্যবস্থা গ্রহণ।

বাংলাদেশের মতো ক্ষয়িষ্ণু অর্থনীতির দেশ কিছুতেই আমদানিকৃত জ্বালানিনির্ভর হয়ে টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা অর্জন করতে পারবে না। মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের জন্য এনার্জি ট্রানজিশনের বাধ্য বাধকতা নেই। আমাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিজেদের জ্বালানির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতেই হবে। তবে সব কিছুর সারমর্ম হলো জ্বালানি বিদ্যুৎ সেক্টরকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রেখে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারভিত্তিক কৌশলগত সেক্টর বিবেচনা করতে হবে। সব স্টেকহোল্ডারকে সমন্বিত করে বাস্তবসম্মত বাতবায়ন কৌশল নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

শেয়ার করুন