২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বুধবার, ০৮:০৩:৩০ অপরাহ্ন


জ্বালানি খাতে জরুরি সংস্কার প্রয়োজন
সালেক সুফী
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৩-০৯-২০২৬
জ্বালানি খাতে জরুরি সংস্কার প্রয়োজন বাপেক্স


জ্বালানি বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান অতিমারির জন্য প্রাথমিক জ্বালানির সংকট মূলত দায়ী। আর এক্ষেত্রে দায়দায়িত্ব রয়েছে পেট্রোবাংলার অধীনস্ত ১৩ কোম্পানি নিজেদের দায়দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনে সচেষ্ট থাকলেও পেট্রোবাংলার অতিরিক্ত দাদাগিরি অনেকাংশে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অনেকক্ষেত্রেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কোম্পানিগুলোর সমপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ডিঙিয়ে উচ্চতর পদে পদোন্নতি অর্জন করে যথাযথ অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও কোম্পানিগুলোর শীর্ষ পদগুলো দখলে নিচ্ছে পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা। কোম্পানিগুলোতে বিরাজ করছে ক্ষোভ হতাশা। জরুরিভাবে এ প্রবণতার অবসান হওয়া উচিত। এমনিতেই পেট্রোবাংলার শীর্ষ পদগুলো চর দখলের মত দখল করে রেখে জ্বালানি সেক্টরের ক্যারিয়ার প্লানিংয়ের স্বাভাবিক ধারা রুদ্ধ করে রেখেছে অনভিজ্ঞ আমলারা তদুপরি পেট্রোবাংলার অদক্ষ কিছু কর্মকর্তা কোম্পানিগুলোতে শীর্ষপর্যায়ে পদায়িত হয়ে কোম্পানিগুলোর সুষ্ঠু কাজের ধারা ব্যাহত করছে।

পেট্রোবাংলা এবং কোম্পানিসমূহের পরিচালকমণ্ডলী একচ্ছত্রভাবে অধিকার করে রেখেছে আমলারা। একে তো বিষয়ে অভিজ্ঞতা সীমিত, তদুপরি অযথা ক্ষমতার অপব্যাবহার করে কোম্পানিগুলোর কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টির আলামত সুস্পষ্ট। অথচ দেশে রয়েছে পেট্রোবাংলার বিভিন্নকোম্পানিগুলোতে দীর্ঘদিন দক্ষতার সঙ্গে কাজ করা অনেক সৎ অবসরে থাকা কর্মকর্তা। এদের পেট্রোবাংলা এবং কোম্পানিগুলোর বোর্ডে সংযুক্ত করা হলে সুফল পাওয়া যাবে।

আমি গ্যাস-তেল অনুসন্ধান এবং কাজে নিযুক্ত তিনটি কোম্পানি বাপেক্স, বিজিএফসিএল এবং এসজিএফএলের কর্মপরিধি বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে সুনির্দিষ্ট করার জরুরি। একটি বিশেষ পরিস্থিতির কারণে অশুভ গোষ্ঠী দেশে দুটি প্রতিষ্ঠিত জ্বালানি উৎপাদন কোম্পানি থাকা সত্ত্বেও বাপেক্সকে অনুসন্ধান কাজের অতিরিক্ত উৎপাদন কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়। উদ্দেশো ছিল বিতর্কিত কোম্পানি নাইকোকে প্রতিষ্ঠিত করা। নাইকো বিদায় নিয়েছে এখন বাপেক্সকে যথাযথ প্রণোদনা দিয়ে আন্তর্জাতিক মানের এক্সপ্লোরেশন কোম্পানি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। নানা সময়ে সরকারগুলো একে অপরকে বাপেক্সকে অবজ্ঞা করার জন্য দোষারোপ করে। কিন্তু কোনো সরকার এখন পর্যন্ত বাপেক্সের দক্ষতা বৃদ্ধির কার্যকরি উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। বাপেক্সের কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নিবিড় প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের পাশাপাশি বিশেষ বেতন কাঠামো নির্ধারণের সুপারিশ করছি। বাপেক্সকে গ্যাসতেল অনুসন্ধান কাজের জন্য সৃষ্ট জিডিএফ ফান্ডের অর্থ অনুদান হিসেবে প্রদানের সুপারিশ করছি। পেট্রোবাংলার অধীনে থাকা রিজার্ভার ইঞ্জিনিয়ারিং কার্যক্রম বাপেক্সকে দিয়ে নিয়মিত রিজার্ভার ব্যবস্থাপনা কাজে ওদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা উচিত। শুধু স্থলভাগ নয় সাগরে গ্যাসতেল অনুসন্ধান কাজেও বাপেক্সকে পর্যায়ক্রমে দক্ষ করে তোলার পরিকল্পনা নেয়া উচিত। গ্যাস উৎপাদন কাজে বাপেক্সকে সম্পৃক্ত করার বর্তমান সিদ্ধান্ত অবিলম্বে পরিহার করা জরুরি। এক্ষেত্রে গ্যাস উৎপাদন কাজ বিজিএফসিএল এবং এসজিএলের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত।

এসজিএফএল বাংলাদেশ অঞ্চলের সবচেয়ে পুরোনো গ্যাসকোম্পানি, বিজিএফসিএলও শেল বিভির উত্তরাধিকারী। নিজেদের নির্ধারিত এলাকায় সব গ্যাসক্ষেত্রের উন্নয়নকাজ করার মতো দক্ষতা-যোগ্যতা এদের রয়েছে। আওতাধীন এলাকায় আবিষ্কৃত এবং মালিকানাধীন কোনো গ্যাসক্ষেত্র যেমন ছাতক, টেংরা টিলা, রশিদপুর অন্য কোনো কোম্পানিকে দেওয়ার চিন্তারও অবকাশ নেই। আমি ব্যক্তিগতভাবে মাঠপর্যায়ে তদন্তে দেখা গেছে, হরিপুরে সিলেট ১০ এবং সিলেট ১০ কূপে গ্যাসের বিপুল ভান্ডার এমনকি তেল প্রাপ্তির আলামত মিলেছে। তবে এখানে প্রোডাকশন পে স্যান্ড টাইট স্ট্রাকচারে। এখানে উৎপাদনের জন্য উন্নত কারিগরি প্রযুক্তি অবলম্বন করা উচিত। ভুল সিদ্ধান্তে সড়ক সন্নিহিত এলাকায় অত্যাধিক চাপ বহনকারী গ্যাস গ্যাদারিং পাইপলাইন নির্মাণ করা উচিত হয়নি। প্রত্যাশা কর্তৃপক্ষ অবিলম্বে কূপ দুটোকে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের ভিত্তিতে উৎপাদনে আনবে এবং ১০ কিলোমিটার ক্রস কান্ট্রি গ্যাস গ্যাদারিং পাইপলাইন নির্মাণ করবে। সংলিস্ট এলাকায় অন্তত দুটি উন্নয়ন কূপ খননের সুপারিশ। একই সঙ্গে সুরমা বেসিন এলাকায় নিবিড় ২উ, ৩উ সার্ভে করার অনুরোধ জানাচ্ছি।

বিএফসিএলের তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে বাস্তবায়ন রত গভীর স্তরে উচ্চচাপ জোনে গ্যাস আবিষ্কার বিষয়েও আশাবাদী। এখানে গ্যাস আবিষ্কৃত হলে গ্যাস নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যাবে। এখানেও দ্রুত ২-৩টি অনুসদ্ধান কূপ খননের কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। একইভাবে সাফল্যের সম্ভাবনা আছে বাখরাবাদ এবং শ্রীকাইল গ্যাসক্ষেত্রের পরিকল্পিত গভীর গ্যাসকূপ খনন উদ্যোগেও।

ফলে সরকারের উচিত বাপেক্স, বিজিএফসিএল এবং সিলেট গ্যাস ফিল্ডসসহ গ্যাসকোম্পানিগুলোর বেতন কাঠামো কাজের ধরনগুলোর গুরুত্বের আলোকে বাস্তব সম্মত করার। এই কাজে দক্ষ কারিগরি কর্মকর্তাদের জন্য সারা বিশ্ব উন্মুক্ত। আশা করি, সরকার গুরুত্ব বুঝে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

একই সঙ্গে এক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যায়ে ডিপিপি প্রণয়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং ভূমি অধিগ্রহণ কাজের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনে কার্যকরি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এ দেশে কিন্তু প্রকৃত দক্ষ মাঠকর্মীর সংখ্যা সীমিত। এমতাবস্তায় অশুভ সিন্ডিকেটের প্রভাবে দক্ষ কর্মকর্তাদের নিষ্ক্রিয় রাখার বর্তমান প্রবণতা দূর না হলে সরকার কোন ভাবে জ্বালানি সুনামি থেকে পরিত্রাণ পাবে না। 

শেয়ার করুন