২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বুধবার, ০৮:০৩:২৩ অপরাহ্ন


প্রাকৃতিক গ্যাস নিয়ে গভীর সংকট
সালেক সুফী
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৩-০৯-২০২৬
প্রাকৃতিক গ্যাস নিয়ে গভীর সংকট এলএনজি টার্মিনাল


গত দশকজুড়ে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে নাজুক হয়ে এখন অতিমারিতে রূপ নিয়েছে। রক্ষণশীল পরিসংখ্যানে বর্তমান গ্যাস চাহিদা ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। পেট্রোবাংলা অভ্যন্তরীণ উৎপাদন এবং আমদানিকৃত এলএনজি যোগ করে সর্বোচ্চ সরবরাহ করতে পারে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। নিজেদের উৎপাদন কমে এখন ১৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে কক্সবাজারের মহেশখালী উপকূলে থাকা ভাসমান টার্মিনাল দুটি টার্মিনাল থেকে ১০০০-১০৫০ মিলিয়ন ঘনফুট করা সম্ভব। টার্মিনাল দুটির একটি পরিচালনা করে মার্কিন কোম্পানি এক্সেলারেট এনার্জি অপরটি পরিচালনার দায়িত্বে আছে দেশীয় কোম্পানি সামিট এনার্জি। জুলাই মাসের তৃতীয় সপ্তাহে এক্সেলারেট এনার্জির ভাসমান টার্মিনালে আগুন লাগায় গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ২ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। 

দেশজুড়ে শুরু হয় গ্যাস নিয়ে এক ধরনের শঙ্কা। ঘর বাড়িতে চুলা জ্বলেনি, পাম্পগুলোতে সিএনজি সরবরাহের জন্য শুরু হয় দীর্ঘ হয় বিশাল লাইন, শিল্পাঞ্চলে দেখা দেয় আতঙ্ক, দেশজুড়ে দেখা দেয় অস্বস্তিকর বিদ্যুৎ লোডশেডিং। অনেকের মতে, ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান টার্মিনাল মেরামতে প্রয়োজনের থেকে বেশি সময় লাগে। এরই মাঝে দ্বিতীয় টার্মিনালটিতেও এলএনজি সরবরাহে সমস্যা দেখা দেওয়ায় সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ে। দেশের অন্য এলাকার মতো ঢাকা মহানগর এলাকায় শুরু হয় বিদ্যুৎ লোডশেডিং। ধীরে ধীরে দুটি টার্মিনাল উৎপাদনে ফিরে এসে ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে পূর্ণ ক্ষমতায় সরবরাহ শুরু করেছে। গ্যাস ঘাটতি কমে জুলাই পূর্ব অবস্থায় এসেছে। এখনো ১০০০-১২০০ মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি থাকায় সংকট অব্যাহত রয়েছে। 

নতুন সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে এমন বিপর্যস্ত জ্বালানি ঘাটতি পেয়ে পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সবাই জানে নিজেদের গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি বলেন, আর এলএনজি আমদানি বলেন, অন্তত ২-৩ বছরের আগে কোনোটি অর্জন সম্ভব না। এমতাবস্তায় গ্যাস সরবরাহ চেনে বর্তমান সংকট অব্যাহত থাকবে। তবে নভেম্বরের শেষ ভাগ থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিদ্যুৎ চাহিদা কম থাকায় পরিস্থিতি কিছুটা সহনীয় হতে পারে। কিন্তু গ্যাস বিদ্যুৎ সরবরাহ চেনে স্বস্তি আনতে হলে নিজস্ব গ্যাস কয়লা অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান বৃদ্ধি ছাড়া বিকল্প নেই।

পূর্ববর্তী সরকারের নেয়া ৫০ এবং ১০০ গ্যাসকূপ খননের উদ্যোগ বেগবান করা এখন যুদ্ধ প্রস্তুতি নিয়ে করার কথা বলা হচ্ছে। তিতাস, বাখরাবাদ, শ্রীকাইল গ্যাসক্ষেত্র এবং পাবনার মোবারাকপুরে গভীর স্তরে গ্যাস অনুসন্ধান এবং সিলেট গ্যাসফিল্ডস এলাকায় কয়েকটি চলমান উদ্যোগ থেকে সাফল্যের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এ উদ্যোগগুলো সফল হলে ২০৩০ নাগাদ দেশের উৎপাদন বেড়ে ২ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট পৌঁছতে পারে। অন্যদিকে এই সময়ে অন্তত আরো একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল উৎপাদনে আসলে সরবরাহ ৩ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট হতে পারে। এগুলো কিন্তু অনেক যদি, কিন্তু অনিশ্চয়তার ওপর নির্ভরশীল। এলএনজি আমদানিতে কিন্তু নানা অনিশ্চয়তা আছে। কাতার ওমান থেকে দীর্ঘস্থায়ী চুক্তির অধীনে এলএনজি আমদানি কবে থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে নিশ্চিত নয়। স্পট মার্কেট থেকে দীর্ঘদিন উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানির সামর্থ নেই বাংলাদেশের। এমতাবস্থায় একমাত্র এলএনজিনির্ভর হয়ে বাংলাদেশ কোনো অবস্থায় জ্বালানি সরবরাহে স্বস্তি অর্জন করতে পারবে না।

এখন প্রধান বিকল্প হতে পারে পরিবেশ সম্মত উপায়ে নিজেদের উঁচু মানের কয়লা উৎপাদন এবং ব্যবহার, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অবিলম্বে উৎপাদনে আনা ফুলবাড়ী কয়লা ক্ষেত্র এবং বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির দুই প্রান্তে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন শুরু করলে ২০৩২ নাগাদ ৫০০০-৭০০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতে পারে। একই সঙ্গে সঠিক প্রণোদনা দিয়ে এবং ব্যক্তি খাতকে সম্পৃক্ত করে সৌরবিদ্যুতের অবদান বাড়ালে ২০৩০ নাগাদ অন্তত ৫০০০-৬০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে।

অবিলম্বে ছাতক, টেংরাটিলা, পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় অবিলম্বে সমন্বিতভাবে গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে ভোলার গ্যাস দ্রুত জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত করার কোনো বিকল্প নেই।

আমি গত ৪০ দিন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ চেনে মাঠপর্যায়ে সফর করেছি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। আমি সতর্কতার সঙ্গে আশা বাদী মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে ২-৩ বছরের মধ্যে ঘুরে দাঁড়াবে। তবে এ খাতকে দ্রুত আমলা নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রকল্পসমূহ অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা দূর করতে হবে।

শেয়ার করুন