২৯ এপ্রিল ২০২৬, বুধবার, ১১:২১:১১ অপরাহ্ন


নিউ ইয়র্কে ডিড বা সম্পত্তি জালিয়াতির অভিযোগ তিনগুণ বেড়েছে
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৯-০৪-২০২৬
নিউ ইয়র্কে ডিড বা সম্পত্তি জালিয়াতির অভিযোগ তিনগুণ বেড়েছে


নিউ ইয়র্ক শহরে বাড়ির মালিকানা জালিয়াতি বা ডিড থেফট সংক্রান্ত অভিযোগ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। নিউ ইয়র্ক অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এ ধরনের অভিযোগ প্রায় ২৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ বাড়ির মালিকানা জালিয়াতি বৃদ্বির হার শহরের আবাসন নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এ জালিয়াতিতে বাংলাদেশিরা জড়িয়ে পড়েছে। আবার অনেকে নজরদারিতে রয়েছেন।

সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালে যেখানে ডিড থেফট সংক্রান্ত অভিযোগ ছিল ১৪৯টি, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২২২-এ। এরপর ২০২৫ সালে এই সংখ্যা লাফিয়ে বেড়ে ৫১৭-এ পৌঁছায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু সচেতনতা বৃদ্ধির ফল নয়, বরং প্রকৃত অপরাধ বৃদ্ধিরও ইঙ্গিত বহন করছে। ডিড থেফট প্রতিরোধে আরো কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে গত ২৪ এপ্রিল নিউ ইয়র্ক সিটি মেয়র মামদানি অফিস অব ডিড থেফট প্রিভেনশন গঠনের ঘোষণা দেন। এ দফতরটি শহরের প্রথম বিশেষায়িত অফিস, যা সরাসরি ডিড থেফট প্রতিরোধ ও তদন্তে কাজ করবে।

ডিড থেফট মূলত এমন একটি জালিয়াতি যেখানে প্রতারকরা বাড়ির মালিকের অজান্তে বা ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে সম্পত্তির মালিকানা নিজেদের নামে নিয়ে নেয়। অনেক ক্ষেত্রে স্বাক্ষর জাল করা, ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহার এবং অনলাইন ডকুমেন্ট জালিয়াতির মাধ্যমে এই অপরাধ সংঘটিত হয়।

নিউ ইয়র্ক অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস জানিয়েছেন, প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে জাল ডকুমেন্ট তৈরি করা সহজ হয়ে যাওয়ায় এই ধরনের অপরাধ বাড়ছে। তিনি বলেন, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে জন্ম সনদ, সামাজিক নিরাপত্তা নম্বরসহ নানা ধরনের পরিচয়পত্র জাল করা এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে। মানুষ এখন এ বিষয়ে অভিযোগ করার সাহস পাচ্ছে, তাই সংখ্যা বাড়ছে।

২০২৪ সালে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস ডিড থেফট মোকাবেলায় নতুন একটি আইন প্রণয়নে সহায়তা করে, যা তার কার্যালয়কে এই ধরনের অপরাধে আরো শক্তভাবে মামলা করার ক্ষমতা দেয়। এই আইনের আওতায় ২০২৫ সালে কুইন্স এলাকায় একজন বিধবার বাড়ি জালিয়াতির মাধ্যমে দখলের অভিযোগে দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।

কুইন্স ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি মেলিন্ডা ক্যাটজ জানিয়েছেন, তাদের অফিস ২০২০ সালে হাউজিং অ্যান্ড ওয়ার্কার প্রোটেকশন ব্যুরো চালু করার পর থেকে এখন পর্যন্ত ২৩টি বাড়ি প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। তিনি বলেন, অতীতে অনেক সময় ডিড থেফট তদন্তে পর্যাপ্ত সম্পদ ও জনবল না থাকায় সমস্যা হতো, কিন্তু এখন পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হয়েছে। ডিড থেফটের আরেকটি বড় দিক হলো প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিচয় জাল করা। আইনজীবীরা বলছেন, অনলাইনে তৈরি করা জাল ডকুমেন্ট, ভুয়া আইডি এবং কৃত্রিম স্বাক্ষরের মাধ্যমে অপরাধীরা সহজেই সম্পত্তি দখল করছে। এ কারণে অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত মালিক দীর্ঘ সময় ধরে জানতেও পারেন না যে তাদের সম্পত্তি অন্যের নামে চলে গেছে।

নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য নিউ ইয়র্ক সিটি কর্তৃপক্ষ অটোমেটেড সিটি রেজিস্টার ইনফরমেশন সিস্টেম (অ্যাক্রিস)-এ নিবন্ধন করার পরামর্শ দিয়েছে। এ সিস্টেমের মাধ্যমে সম্পত্তি সংক্রান্ত যেকোনো নতুন ফাইল, মালিকানা পরিবর্তন বা বন্ধক সংক্রান্ত তথ্য নোটিফিকেশনের মাধ্যমে জানা যায়। কর্তৃপক্ষ বলছে, এটি ডিড থেফট প্রতিরোধে অন্যতম কার্যকর উপায়।

সম্প্রতি কুইন্সের কিউ গার্ডেনস এলাকায় এমন একটি ঘটনা সামনে এসেছে, যেখানে এক ব্যক্তি বৈধভাবে একটি বাড়ি ক্রয় করলেও পরে সেই বাড়ির মালিকানা নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। অভিযোগ অনুযায়ী, একজন নারী ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে বাড়ির মালিকানা দাবি করেন, যদিও একই সম্পত্তি ব্যাংকের মাধ্যমে ওই ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা হয়েছিল। বর্তমানে বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। ভুক্তভোগী ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, আমি অবাক হয়েছি, কীভাবে একজন ব্যক্তি আমার বাড়ির মালিকানা দাবি করতে পারে। এটি সম্পূর্ণ জালিয়াতি। অন্যদিকে অভিযুক্ত পক্ষ জালিয়াতির অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

এ ঘটনার পাশাপাশি নিউ ইয়র্ক সিটিতে নতুন প্রশাসনিক উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। নিউ ইয়র্ক সিটি মেয়র নতুন করে অফিস অব ডিড থেফট প্রিভেনশন নামে একটি দফতর গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। এ অফিসের নেতৃত্বে থাকবেন হোমওনার সহায়তা বিষয়ক অভিজ্ঞ আইনজীবী পিটার হোয়াইট। এ নতুন অফিস সিটি ডিপার্টমেন্ট অব ফাইন্যান্সের অধীনে পরিচালিত হবে এবং হাউজিং প্রিজারভেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এইচপিডি) ও মানবাধিকার কমিশনের সঙ্গে সমন্বয় করবে। মেয়রের মতে, এ অফিসের মূল কাজ হবে ডিড থেফট শনাক্ত করা, প্রতিরোধ করা এবং ভুক্তভোগীদের তাদের সম্পত্তি পুনরুদ্ধারে সহায়তা করা। মেয়র মামদানি বলেন, ডিড থেফট বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গ ও লাতিনো সম্প্রদায়ের মানুষদের বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এটি শুধু সম্পত্তি নয়, মানুষের স্থিতিশীল জীবনও কেড়ে নিচ্ছে। তিনি আরো বলেন, শহর প্রশাসন এবার এই সমস্যার বিরুদ্ধে আরো কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। নতুন অফিসের পরিচালক পিটার হোয়াইট বলেন, তার লক্ষ্য হলো নিউ ইয়র্কের হোমওনারদের জীবন আরো নিরাপদ করা। তিনি জানান, তিনটি প্রধান লক্ষ্য থাকবে ডিড জালিয়াতি শনাক্ত করা, প্রতিরোধ করা এবং ভুক্তভোগীদের সম্পত্তি ফিরিয়ে দিতে সহায়তা করা।

অন্যদিকে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলও এ ইস্যুতে সরব হয়েছে। কিছু জনপ্রতিনিধি দাবি করেছেন যে ডিড থেফট এখন একটি এপিডেমিকে পরিণত হয়েছে, বিশেষ করে ব্রুকলিন ও কুইন্স এলাকায়। তারা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে বয়স্ক ও নিম্নআয়ের মানুষদের লক্ষ্য করে এ অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। সম্প্রতি এক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে একজন সিটি কাউন্সিল সদস্য গ্রেফতার হলেও তিনি দাবি করেন, ডিড থেফটের বিরুদ্ধে আরো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, শহরের আবাসন ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত না করলে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

নিউ ইয়র্ক সিটি মেয়র প্রশাসন আরো জানিয়েছে, শহরের ট্যাক্স লিয়েন সেল প্রোগ্রামও ছয় মাসের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে, যাতে পুরো ব্যবস্থাটি পুনর্বিবেচনা করা যায়। এই সিদ্ধান্তও আবাসন নিরাপত্তা নিয়ে চলমান আলোচনাকে আরো গুরুত্ব দিয়েছে।

নিউ ইয়র্কে সম্পত্তি জালিয়াতির এ বৃদ্ধি শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, বরং আবাসন সংকট, প্রযুক্তিগত অপব্যবহার এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার সম্মিলিত ফল। তারা বলছেন, যদি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরো বেশি মানুষ তাদের ঘর হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। সামগ্রিকভাবে, ডিড থেফট এখন নিউ ইয়র্ক শহরের জন্য একটি বড় সামাজিক ও আইনগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। নতুন অফিস গঠন এবং আইন সংশোধনের মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে এখন শহরজুড়ে আলোচনা চলছে।

শেয়ার করুন