২৯ এপ্রিল ২০২৬, বুধবার, ০৫:২৯:১২ অপরাহ্ন


র‌্যাব বলছে ভিত্তি নেই
হঠাৎ জঙ্গি হামলার তথ্যে তোলপাড়
বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৯-০৪-২০২৬
হঠাৎ জঙ্গি হামলার তথ্যে তোলপাড় দেশের বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন স্থাপনার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে


আবারও আঁতকে ওঠার মতো এক ইস্যু বাংলাদেশের মানুষকে নতুন করে ভাবাচ্ছে! জঙ্গি হামলা। এ বাক্যের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষ পরিচিত। ২০২৪ সনের ৫ আগস্ট পর্যন্ত ওই হামলার সঙ্গে মানুষ পরিচিত ছিল। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এসব জঙ্গি আলোচনা ছিল না। বিএনপি সরকারের প্রথম দুইমাস চলছে। এখানেও এ আলাপ শোনা না গেলেও হঠাৎ তোলপাড় এ ইস্যু। শেখ হাসিনার দীর্ঘ ১৭ বছরে এ বাক্যগুলো ব্যাপক আতঙ্ক ছড়ায়। বিভিন্ন সময়ে জঙ্গির আস্তানা খুঁজে বের করে আইনশৃংখলাবাহিনীর ঘেরাও করে উদ্ধারকরণসহ বহু কার্যক্রম মানুষ দেখেছে। কিন্তু আবারও পুরানো ইস্যু নতুন করে মাথা চাড়া দিল। এতে সরকার ও আইনশৃংখলাবাহিনীও সতর্ক অবস্থানে। অন্যদিকে র‌্যাব বলছে, এই সব তথ্যের কোন ভিত্তি নেই।

জাতীয় সংসদ ভবন, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর স্থাপনা, উপাসনালয় ও জনসমাগমস্থলে হামলার আশঙ্কায় সতর্কতা জারি করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। সিটিটিসির তথ্যের ভিত্তিতে দেশজুড়ে নিরাপত্তা ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের ৮টি বিমানবন্দরে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করা হয়েছে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনায় নিরাপত্তা বাড়িয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। হামলার হুমকি গোয়েন্দা নজরে আসার পর এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সকল ইউনিটের প্রধান থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ে সতর্ক করা হয়েছে। পোশাকে ও সাদা পোশাকে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা কাজ করছেন।

এ ছাড়া জঙ্গি সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম মোকাবিলায় কাজ করা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি), অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) জঙ্গি কার্যক্রম সংশ্লিষ্টদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করছে। পুলিশের অন্যান্য ইউনিটের সদস্যরাও এ নিয়ে কাজ করছেন। সরকারি সকল গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে। এ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে যারা আসা-যাওয়া করছেন তাদের তল্লাশি ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

সিভিল এভিয়েশন সূত্র জানায়, পুলিশ সদরদপ্তর থেকে সতর্কতার চিঠি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকেও দেয়া হয়েছে। চিঠি পাওয়ার পরপরই বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) উচ্চমাত্রার সতর্কতা জারি করে। বিমানবন্দরের কর্মরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সকল ইউনিটকে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেয়া হয়।

বিমানবন্দরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানকে ঘিরে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তা। গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে। পোশাকে ও সাদা পোশাকে অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সবধরনের নিরাপত্তা হুমকি বিবেচনা করে পূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। অ্যারাইভাল ও ডিপারচার সবক্ষেত্রে নিরাপত্তা তল্লাশিও জোরদার করা হয়েছে। কোনো কিছু অস্বাভাবিক দেখামাত্রই দ্রুত রিপোর্ট করতে বলা হয়েছে। বিমানবন্দরে যেসব যানবাহন প্রবেশ করছে সেগুলোতে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। বেবিচকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বিমানবন্দরে এখন পর্যন্ত নিরাপত্তা হুমকি আমরা পাইনি। তারপরও আগাম সতকর্তা নেয়া হয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক বলেন, পুলিশ সদরদপ্তরের চিঠির পর দেশের ৮টি বিমানবন্দরে নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। তিনি বলেন, বিমানবন্দরগুলো সব সময়েই নিরাপত্তা বলয়ে থাকে এরপরও পুলিশ সদরদপ্তরের চিঠি পাওয়ার পর তা আরও বাড়ানো হয়েছে।

এদিকে হঠাৎ করে জঙ্গি হামলার হুমকির বিষয়টি সামনে আসায় মানুষের মধ্যে উৎকন্ঠা তৈরির পাশাপাশি নানা প্রশ্নের দেখা দিয়েছে। যেখানে সাবেক ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেছিলেন, দেশে কোনো জঙ্গি নেই। আওয়ামী লীগের সময় জঙ্গি নাটক সাজিয়ে ছেলেপেলেদের মারধর করেছে। তাই এখন জঙ্গি হামলার শঙ্কা নিয়ে অনেক প্রশ্নের হিসাব মিলাতে পারছেন না সাধারণ মানুষ। অনেকে মনে করছেন একটি গোষ্ঠী বর্তমান বিএনপি সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তরফে বলা হয়েছে, যেকোনো উগ্রবাদী গোষ্ঠীর অপতৎপরতা রুখে দেয়ার সক্ষমতা তাদের রয়েছে।

যেভাবে পেল জঙ্গি হামলার তথ্য 

উগ্রবাদী সংগঠনের সক্রিয় সদস্য ইসতিয়াক আহম্মেদ সামী ওরফে আবু বক্কর ওরফে আবু মোহাম্মদ নামে এক সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে হামলার তথ্য পান গোয়েন্দারা। তার কাছ থেকে সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গি ও উগ্রবাদী গোষ্ঠীদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। যার সঙ্গে বাস্তবতার অনেক মিল পান তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, বিদেশে বসে থাকা মাস্টারমাইন্ড হামলার কলকাঠি নাড়ছে। জঙ্গি-উগ্রবাদীদের তৎপরতা এবং হামলার শঙ্কা নিয়ে এর আগেও গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সেগুলোকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। সর্বশেষ একটি বিশেষায়িত ইউনিটের প্রতিবেদনে শঙ্কার কথা জানানোর পর এটি আমলে নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। কিছুদিন আগে ওই ইউনিটের গোয়েন্দারাই খবর পেয়ে চট্টগ্রামে গিয়ে জঙ্গি সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ একাধিক সদস্যকে ধরার পর তাদের হামলার পরিকল্পনার কথা জানতে পারে। 

সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তর থেকে যে চিঠি দিয়ে সতর্ক করা হয়েছে সেখানে ইসতিয়াক আহম্মেদ সামী ওরফে আবু বক্কর ওরফে আবু মোহাম্মদের গ্রেপ্তারের তথ্য দেয়া হয়েছে। তবে তাকে কবে, কোন ইউনিটের গ্রেপ্তার করা হয়েছে সেটি বলা হয়নি। চিঠিতে গ্রেপ্তার ইসতিয়াকের সঙ্গে চাকরিচ্যুত দুই সেনাসদস্যের নিয়মিত যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়। তারা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বোমা বিস্ফোরণ, দেশীয় ধারালো অস্ত্র কিংবা আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে হামলা করতে পারে বলে জানতে পেরেছে পুলিশ সদর দপ্তর। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার মধ্যে জাতীয় সংসদ, বাংলাদেশ পুলিশ বা সেনাবাহিনীর স্থাপনা ও তাদের সদস্য, ধর্মীয় উপাসনালয়, বিনোদনকেন্দ্র, শাহবাগ চত্বরের মতো জায়গা রয়েছে। সন্ত্রাসীদের বিভিন্ন বাহিনীর অস্ত্রাগারে হামলার পরিকল্পনাও করে থাকতে পারে জানিয়ে চিঠিতে বলা হয়, এসব ব্যক্তি দেশের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’।

এ পরিস্থিতিতে পুলিশ সদর দপ্তর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি নজরদারি বৃদ্ধি ও সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছে। চিঠিটি ২৩শে এপ্রিল আইনশৃংখলাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটে প্রেরণ করা হয়েছে। 

জুলাই আন্দোলনে জঙ্গি পালায়ন 

গত ২০২৪ সনে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় দেশের কারাগার থেকে অন্যান্য দাগী সন্ত্রাসী, চরমপন্থির সঙ্গে ৯ জঙ্গিও পালিয়ে যায়। কিন্তু প্রায় দুই বছরের কাছাকাছি সময়ের পরেও তাদের শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তারা কোথায় আছে কি করছে সে বিষয়ে খোঁজ পায়নি নিরাপত্তা বাহিনীগুলো। তবে জঙ্গি নিয়ে কাজ করেন এমন ব্যক্তিরা বলছেন, জঙ্গিদের যেভাবে তৈরি করা হয় মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তারা আর ওই পথ থেকে ফিরে আসার সম্ভাবনা কম। তাই তারা আবার সংগঠিত হয়ে কাজ করছে। তবে পলাতক এই জঙ্গিদের গ্রেপ্তার করতে পুলিশের সবক’টি ইউনিটকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

এদিকে ঢাকা মিডিয়া সূত্র থেকে জানা গেছে, জঙ্গি হামলার শঙ্কা নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সতর্ক থাকার যে চিঠি দেয়া হয়েছে সেই চিঠি প্রাপ্তির কথা পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের সদস্যরা স্বীকার করলেও এ নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলতে রাজি হননি কেউ। গোপনীয় থাকায় পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলা হয়নি। তবে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা বলেছেন, চিঠি পাওয়ার পর পরই নিজ নিজ এলাকার গুরুত্ব সরকারি স্থাপনা, বাসভবনে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। তবে জঙ্গি নিয়ে কাজ করা পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) যুগ্ম কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীন বলেন, সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া গেছে। আমরা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখছি। ইনশাআল্লাহ আমরা এটাকে মোকাবিলা করতে পারবো। এর পেছনে যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সরকার পক্ষে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য 

এদিকে বর্তমানে দেশে কোনো জঙ্গি তৎপরতা নেই বলে দাবি করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, ‘দেশে বর্তমানে কোনো জঙ্গি তৎপরতা নেই। ‘ফ্যাসিবাদী আমলে’ রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য ‘জঙ্গিবাদ’ শব্দটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতো।’ 

এদিকে দেশে জঙ্গি রয়েছে; এই তৎপরতা ‘শূন্যের কোঠায়’ নামিয়ে আনার চেষ্টা করবে সরকার বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তবে বিষয়টিকে আওয়ামী লীগ সরকার রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে মনে করেন দুজনই। একইসঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের ‘দেশে জঙ্গি নেই’- এ বক্তব্যও সঠিক ছিল না বলেও দাবি করেছেন ডা. জাহেদ। 

মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে কোস্ট গার্ডের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠান শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। এসময় এক সাংবাদিক প্রশ্ন তোলেন, দেশে জঙ্গি উত্থানের বিষয় জানা যাচ্ছে এবং বিমানবন্দরে নিরাপত্তাও বাড়ানো হচ্ছে। তো এই বিষয়টি আপনারা...।

তার কথার সূত্র ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমি আপনাদের প্রশ্নগুলো বুঝতে পেরেছি, কিন্তু আমি ওই শব্দকে রিকগনাইজ করি না। আমাদের দেশে এরকম কোনো তৎপরতা নেই। কিছু এক্সট্রিমিস্ট গ্রুপ থাকে- পৃথিবীর সব দেশেই এরকম অ্যাক্টিভ থাকে। র‍্যাডিক্যাল কিছু ফোর্স থাকে, ফান্ডামেন্টাল কিছু পলিটিক্যাল পার্টি থাকে- এগুলো আমরা ইউজড টু, এগুলো থাকে। কিন্তু সে বিষয়ে আপনি যে শব্দ উচ্চারণ করলেন, আমাদের দেশের বর্তমান কালচারে সেটা এখন আর নাই-ই। 

আগে সেই শব্দটা উচ্চারিত হতো ফ্যাসিবাদী আমলের সময় মন্তব্য করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তারা নিজস্ব রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য এগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত। বর্তমানে বাংলাদেশে সেগুলোর এক্সিস্টেন্স নেই।

এদিকে একই দিনে সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান ব্রিফিংয়ে আসেন। এসময় এক সাংবাদিক জানতে চান, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ‘জঙ্গি হামলার’ আশঙ্কার পরিপ্রেক্ষিতে বিমানবন্দরে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা বলেছিলেন, ‘দেশে আসলে জঙ্গি নেই’। জঙ্গি আছে কি না এ সরকার কি মনে করে এবং নাশকতা যদি হয়, সরকারের গোয়েন্দাদের কাছে কী ধরনের তথ্য আছে? কতখানি শঙ্কা রয়েছে সরকারের কাছে? মানে কতখানি ‘ম্যাসাকার’ হতে পারে?

এ প্রশ্নের জবাবে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, প্রথম কথা হচ্ছে সরকারের কাছে কতখানি তথ্য আছে, এটা বলা যাবে না। এটা একটা সেনসিটিভ তথ্য। এ তথ্যটা গোপন থাকবে। কিন্তু যেটুকু তথ্য সরকার জানিয়েছে- এটা ফ্যাক্ট; বাংলাদেশে জঙ্গি আছে। কিন্তু এখানে দুটো এক্সট্রিম আছে। আমি দুটো এক্সট্রিমের কথা বলি। আগের সরকারের সময়, মানে আমি ইন্টেরিমের কথা বলছি না, তার আগের সরকারের (আওয়ামী লীগ) সময় জঙ্গি সমস্যাকে যেই স্কেলে দেখানো হয়েছে, এটা তাদের ক্ষমতায় থাকার একটা ন্যারেটিভ হিসেবে তারা ব্যবহার করেছিলেন যে ‘বাংলাদেশে জঙ্গি আছে, জঙ্গিরা সব দখল করবে; সুতরাং আমি নির্বাচন করলাম কি না দেখার দরকার নেই, আমাকে ক্ষমতায় রাখো’। দ্যাট ওয়াজ আ ন্যারেটিভ।

এটা একজাজারেটেড (অতিরঞ্জিত) হয়েছিল ওই সরকারের সময় উল্লেখ করে ডা. জাহেদ বলেন, পরবর্তীতে যে সরকারের সময় ইন্টারিমের সময় এই আলাপ কেউ কেউ করার চেষ্টা করেছে যে বাংলাদেশে কোনো জঙ্গি নেই, এটাও আরেকটা এক্সট্রিম। এটাও ভুল কথা। বাংলাদেশে একটা পর্যায়ে মিলিটেন্সি- জঙ্গিবাদ ছিল, আছে। সেটাকে আমরা আসলে কমব্যাট করতে চাই। এই সতর্কতার মানে হচ্ছে এটা খানিকটা ঝুঁকি তৈরি করেছে, কারণ দেড় বছর ইন্টারিম সরকারের সময় আমরা খেয়াল করেছি এই প্রবণতার মানুষদের অনেক বেশি সংগঠিত হওয়া বা পাবলিকলি আসা বা ওপেনলি আসার প্রবণতা তৈরি হয়েছিল। তিনি বলেন, সেটারই খানিকটা ইমপ্যাক্ট আমরা বলতে পারি; এই সরকার এগুলো কমব্যাট করবে। জনগণকে এটুকু বলতে চাই এই ঝুঁকি এমন নয় যে এটার জন্য ভয় পেতে হবে। কিন্তু সেই পুরনো কথা, আমরা যদি কোনো একটা সংকটকে বা ডিজিজকে স্বীকার না করি, ওটার চিকিৎসা হবে না। সো ইটস দেওয়ার, আমরা এটাকে একেবারে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার চেষ্টা করব।

এর আগে, গত ২৩ এপ্রিল বৃহস্পতিবার পুলিশ সদর দপ্তর এক সতর্কবার্তায় জানায়, ‘নিষিদ্ধঘোষিত একটি উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্যরা’ জাতীয় সংসদ ভবনসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালাতে পারে। এরপর দেশের বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন স্থাপনার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। 

সবশেষ

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর যে রাজনৈতিক যে পটপরিবর্তন হয়েছে, সেটিই জঙ্গিদের জন্য একটি সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে বলে অনেকে মনে করেন। গত এক দশকে ধারাবাহিক আইনশৃঙ্খলা অভিযান জঙ্গি নেটওয়ার্ককে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছিল। বিশেষত ২০১৬ সালের হলি আর্টিজান হামলার পর সাঁড়াশি অভিযানে একাধিক সংগঠনের সাংগঠনিক সক্ষমতা ভেঙে দেওয়া হয়। কিন্তু সরকার পতনের পর সেই দমন-কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং জঙ্গিরা সেই শূন্যতা ব্যবহার করতে পারে বলে ধারনা। সে সময় বলা হয়েছিল, দেশে কোনো জঙ্গি নেই। কিন্তু সম্প্রতির ঘটনায় ওই বয়ান সঠিক নয় বলে প্রমাণিত হলো। তবে একটি সরকার পতনের আন্দোলনের পর অন্তর্বর্তী সরকার খুব যে শক্তিশালী আইনশৃংখলা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল তা কিন্তু নয়। একই ভাবে নতুন সরকার সবে শুরু। চেষ্টা করছেন তারা সব গুছিয়ে নিতে। এমনি মুহূর্তে জঙ্গি সংক্রান্ত বার্তা নতুন সরকারকে এ ইস্যু নিয়েও প্রচুর কাজ করতে হবে সেটাও সতর্কতা দিল বৈ কি! 

দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে হামলার সম্ভাব্য হুমকির ভিত্তি নেই : র‍্যাব

দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার সম্ভাব্য হুমকির কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই বলে জানিয়েছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)। তবে যেকোনো ঝুঁকি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ২৮ এপ্রিল মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) রাজধানীর কারওয়ানবাজার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। র‌্যাব-২ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মো. খালিদুল হক হাওলাদার বলেন, এরকম কোনো আশঙ্কা বা থ্রেট এই মুহূর্তে দেখছি না। যেটা ছিল- প্রত্যাশা করছি যে অপরাধীরা এই ধরনের সাহস অন্তত করবে না।

নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি দউগ্রবাদী সংগঠনের’ সদস্যরা জাতীয় সংসদ ভবনসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা করতে পারে বলে পুলিশ সদর দপ্তর সম্প্রতি সতর্ক করে। বৃহস্পতিবার বাহিনীর ইউনিট প্রধানদের কাছে পাঠানো এ সংক্রান্ত এক বার্তায় ‘নিরাপত্তা জোরদারের’ নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে সেই বার্তায় সুনির্দিষ্ট করে উগ্রবাদী সংগঠনটির নাম বলা হয়নি। তবে সম্প্রতি ইসতিয়াক আহম্মেদ সামী ওরফে আবু বক্কর ওরফে আবু মোহাম্মদ নামে ওই সংগঠনের এক সদস্যকে গ্রেপ্তারের তথ্য দেওয়া হয়েছে। ‘নিষিদ্ধ ঘোষিত উগ্রবাদী সংগঠনের সমর্থক কর্তৃক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা সংক্রান্ত’ এ বার্তায় বলা হয়, গ্রেপ্তার ইসতিয়াকের সঙ্গে চাকরিচ্যুত দুই সেনাসদস্যের নিয়মিত যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে।

এক প্রশ্নের জবাবে র‌্যাব-২ এর অধিনায়ক খালিদুল বলেন, যেকোন ঝুঁকি, যেকোন হুমকি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকি। আমাদের আওতাভুক্ত এলাকায় যে সকল গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা আছে, সরকারি অফিস এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট যে ভবন বা স্থাপনাগুলো আছে সবগুলোর নিরাপত্তা প্রদানে টহল ও গোয়েন্দা দল নিয়োজিত করেছি। আমাদের পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও নিয়োজিত রয়েছে।

এসময় জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে র‍্যাবের টহল ও অভিযান কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

শেয়ার করুন