২৯ এপ্রিল ২০২৬, বুধবার, ০৫:২৯:১২ অপরাহ্ন


মাঠে গরম সংসদে নরম নেপথ্যে কি?
সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৯-০৪-২০২৬
মাঠে গরম সংসদে নরম নেপথ্যে কি?


মাঠে-ময়দানে গত কয়েকদিন ধরে বিএনপি-জামায়াত একধরনের মুখোমুখি অবস্থান দেখা যাচ্ছে। বিষয়গুলো নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানান ধরনের আশঙ্কার কথা শোনা যাচ্ছে। তবে এর পাশাপাশি নানান ধরনের প্রশ্ন ও রহেস্যর সৃষ্টি করেছে। কেননা যখন মাঠের গরম হাওয়া সংসদ কাঁপায় না। বরং সেখানে যখন পরস্পর পরস্পরে মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে দারুণ মিল-মিশ লক্ষ্য করা যায়। কিংবা অন্য কিনো ধরনের সুযোগ-সুবিধার প্রশ্নে দু-পক্ষই যখন নিশ্চুপ থাকে। এমন বিষয়গুলি জনগণের মধ্যে দু’দলের লক্ষ্য উদ্দেশ্যের ব্যাপারে ধোয়াশার সৃষ্টি করেছে। মাঠ ঘুরে এমন পরিস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। 

কে কি বলছেন?

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, জামায়াতে ইসলামী কখনোই সুস্থ চিন্তা করেন না। এর পাশাপাশি তিনি বলেছেন, তাদের যে অতীত, সে ইতিহাস আমরা সবাই ভালো করে জানি। সে কারণেই সমগ্র জাতি অত্যন্ত সচেতনভাবে তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে। ‘নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং করে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে’ জামায়াত নেতাদের এমন অভিযোগের জবাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম এই জবাব দেন। তিনি তার বক্তব্যের এক জায়গায় জামায়াতকে নির্মূলে কাজ করতে হবে বলে জানান। যদিও বলেছেন রাজনৈতিকভাবে। 

এদিকে কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি দলটির সক্রিয় ভাতৃপ্রতিম সংগঠনসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্নভাবে জামায়াত ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে ‘গুপ্ত’ সংগঠন হিসাবে আওয়ামী লীগের শাসনামলের সবধরনের সুবিধাভুগী দল হিসাবে চিহ্নিত করে যাচ্ছেন। ইঙ্গিত দিচ্ছেন এই বলে যে, তারা (জামায়াত) ফ্যাসিস্ট শাসনের পাঁয়তারা করছে কি না, সেটা চিন্তা করতে হবে। ভিন্নভাবে দেশকে আবার স্বৈরাচারের মধ্যে নিতে চায় কি না, সেটিও আমাদের ভাবতে হবে।

এর বিপরীতে জামায়াত নেতারা এর কড়া প্রতিবাদ করেছেন, দিচ্ছেন না ছাড়। বলেছেন, বিএনপি আওয়ামী লীগের মতো ফ্যাসিস্ট হওয়ার চেষ্টা করছে। এমন মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করতে আরেকটি অনিবার্য লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতে দেশবাসীর কাঠে আহবান জানান। এর পাশাপাশি মাঠে বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েও জামায়াত এখন সোচ্চার। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১ দলীয় ঐক্যজোট জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোটের রায় কার্যকর করার দাবিতে ১৮ এপ্রিল থেকে ২ মে ২০২৬ পর্যন্ত ১৫ দিনের ধারাবাহিক কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এনিয়ে চলছে নানান ধরনের হিসাব নিকাশ। 

কিন্তু মাঠের উত্তেজনা সংসদে নেই

কিন্ত মাঠে যখন এমন উত্তেজনা বা উত্তাপ বিরাজ করছে তখন সংসদে দেখা গেলো খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জ¦ালানি কমিটি গঠনের আহবান জানান। কেননা বেশ কয়েকদিন দেখা গেলো মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট নিয়ে সরকারকেই দায়ী করে সংসদের ভেতরে বাইরে জ্বালাময়ী অবস্থান নিয়েছিল জামায়াতের নেতৃত্বে পুরো বিরোধী দল এমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে ১০ সদস্যের একটি যৌথ কমিটি গঠনের প্রস্তাবটি দিয়ে দেন। এর ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে বলা যায় পুরো পরিস্থিতি পাল্টে যায়। কেউ কেউ একে খুবই ইতিবাচক বলে অভিহিত করেছেন। বলেছেন, জ্বালানি সংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় এ ইস্যুতে সরকার ও বিরোধী দল ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করাটি খুবই ইতিবাচক। 

এমন পরিস্থিতিতে মাহফুজ কি বললেন

কিন্তু সংসদে এমন পরিস্থিতিতে অর্থ্যাৎ রাজনৈতিক শীর্ষ নেতাদের এধরনের উদ্যোগকে যখন সৌহার্দপূর্ণ, সহনশীল ও দেশপ্রেমের দৃষ্টান্ত হিসাবে দেখা হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম কিছু বক্তব্য দিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেনো তিনি একথা বলেলেন? তিনি বলেছেন, গত দুই সপ্তাহ ধরে চলতে থাকা সংস্কার ও বিচারের আলাপ কোথায় হারিয়ে গেল? আজ রাষ্ট্র সংস্কার বা ইনসাফ কায়েমের আলোচনার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে ভাগ-বাটোয়ারার রাজনীতি। তিনি আরও বলেছেন, জ্বালানি সঙ্কটের কারণে আজ কৃষকের মৃত্যু হচ্ছে এবং নিরবচ্ছিন্ন লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সেইসাথে হামের প্রকোপে শিশু মৃত্যু, অর্থনীতির বেহাল দশা ও নাগরিক নিরাপত্তাহীনতার মতো গুরুতর বিষয়গুলো এখন আলোচনার বাইরে চলে গেছে।

আসলে কি? 

জ্বালানি সংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় এ ইস্যুতে সরকার ও বিরোধী দল ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করার বিষয়টি আসলে কি? এমন সমঝোতার বিপরীতে কি জুলাই বিপ্লবের নেতৃত্ব দেওয়া অন্যতম এই নেতা মাহফুজ আলম কি অন্য কিছু বোঝাচ্ছেন রাজনৈতিক অঙ্গনে। যদিও মাহফুজ আলম তার মন্তব্যের কোথাও কারা কিভাবে ভাগ-বাটোয়ায় জড়িত তা তুলে ধরেননি। তবে এটা নিশ্চিত বলা যায় যে তিনি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংস্কার নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে ব্যাপক মতপার্থক্য যে রয়েছে তার প্রতি একটা কঠোর ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে এই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংস্কার নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে ভেতরে ভেতরে কোনো খেলাধুলা দরকষাকষি হচ্ছে কি-না তা নিয়ে মাহফুজ আলম তেমন কিছু বলছেন না। কিন্তু ধরে নেওয়া যায় কোনো পক্ষই এনিয়ে জোরালো কিছু করছে না। তবে এর অনেক আগে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও এ-বিষয়টি তুলে ধরেন এনসিপি নেতারা। তখন এই মাহফুজ আলমরা অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। উল্লেখ্য ওই সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বৈঠক করেছিলেন। সেখানে জনপ্রশাসনে বদলি-পদায়নে ‘ভাগ-বাঁটোয়ারায়’ উপদেষ্টা পরিষদের ভেতর থেকে সহায়তা করা হচ্ছে অভিযোগ করে সেই উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ চেয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। কিন্তু তার সুরাহা হয়নি। ওই সময়েও বর্তমানে সংসদ ও রাজপথের প্রধান বিরোধী দল আগে সংস্কার পরে নির্বাচনের দাবিতে বেশ গরম পরিস্থিতি তৈরি করেছিলো। এবং শেষ মেষ বড়ো ধরনের সংস্কার ছাড়াই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। এখন সে-ই দিক লক্ষ্য করে কি মাহফুজ আলম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন মন্তব্য করেছেন কি-না তা দেখতে আরেকটু সময় লাগতে পারে বলে কারও কারও অভিমত। তবে সে-ই সময়ে ক্ষমতায় থেকে মাহফুজ আলম জনপ্রশাসনে বদলি-পদায়নে ভাগ-বাটোয়ারা প্রসঙ্গে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেননি বা বলার চেষ্টাও করেননি।

শেয়ার করুন