১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বুধবার, ০৮:০৪:৪০ অপরাহ্ন


জ্বালানি সংকট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ, আছে নয়া পাণ্ডবদের দৌরাত্ম্যও
সালেক সুফী
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৬-০৯-২০২৬
জ্বালানি সংকট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ, আছে নয়া পাণ্ডবদের দৌরাত্ম্যও বিদ্যুৎ লাইন


স্মরণকালের সবচেয়ে তীব্র জ্বালানি বিদ্যুৎ সংকটে পুড়ছে বাংলাদেশ। ঢাকার বাইরে ৮-১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। ঢাকা মহানগরীতেও শুরু হয়েছে ২ ঘণ্টা লোডশেডিং। জ্বলছে না গ্যাসের চুলো, ফুয়েল পাম্পগুলোতে লম্বা যানবাহনের সারি, শিল্পগুলো পড়েছে অস্তিত্বের সংকটে। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এ জ্বালানি বিদ্যুৎ সংকটে অনেকটাই দিশাহারা হয়ে পড়েছে সাত মাসের বিএনপি সরকার। সবাই জানে বিএনপি জামাত জোট সরকারের পূর্ববর্তী কার্যকাল ২০০১-২০০৬ জ্বালানি বিদ্যুৎ সেক্টর ছিল ব্যর্থতার কালিমা লিপ্ত সময়। অতীত তিক্ত অভিজ্ঞতা আর বর্তমান কঠিন পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখেই বর্তমান সরকারের গৃহীত আকাল মোকাবিলার ঘোষিত কার্যক্রমগুলো পর্যালোচনা করছি।

১০০ এবং ৫০ গ্যাসকূপ খনন পরিকল্পনা

বিএনপি সরকার আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ৫০ এবং ১০০ গ্যাসকূপ খনন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া বেগবান করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর পাশাপাশি দেশব্যাপী নিবিড় ২উ এবং ৩উ সিসমিক সার্ভে করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাপেক্স কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন গ্যাসকূপ খনন কাজে প্রধান চ্যালেঞ্জ ডিপিপি অনুমোদন এবং জমি অধিগ্রহণে দীর্ঘসূত্রিতা। আমাদের সুপারিশ গ্যাস বিদ্যুৎ সেক্টরকে জাতীয় প্রাধিকার ভিত্তিক সেক্টর বিবেচনা করে প্রকল্প বাস্তবায়নের সমস্যাগুলো মোকাবিলা করার। বাপেক্স বিবিধ সীমাবদ্ধতা নিয়েও চেষ্টার ত্রুটি করছে না। সরকার ঘোষণা দিয়েছে বাপেক্সকে শক্তিশালী করার। আশা করি, সরকার বাপেক্সকে প্রয়োজনীয় সংখক কারিগরি জনবল নিয়োগ করে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করবে, জিডিএফ ফান্ড সম্পূর্ণভাবে বাপেক্সকে অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে। বাপেক্স ব্যবস্থাপনাকে কার্যক্রম বাস্তবায়নে পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে। পরামর্শ দিবো খনন রিগগুলো রক্ষণাবেক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার। মনে রাখতে হবে কেবল রিগ ক্রয় করলেই বাপেক্স শক্তিশালী হবে না।

স্থল এবং সাগরে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ কার্যক্রম

সরকার দ্রুত দুটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ীতে ভূমিভিত্তিক টার্মিনাল নির্মাণ জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে। এগুলো যথাসময়ে বাস্তবায়িত হলে ২০৩০ নাগাদ ১০০০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং ২০৩৪ নাগাদ ৪০০০ মেগাওয়াট আর এলএনজি জাতীয় গ্রীডে সংযুক্ত হবে। উদ্যোগ প্রশংসনীয় তবে বাস্তবায়নে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এলএনজি সরবরাহে বর্তমান সংকটের জন্য সম্পূর্ণভাবে দায়ী ডক্টর ইউনুস নেতৃত্বের অন্তর্বর্তী সরকারের চরম ব্যর্থতা এবং প্রতিহিংসামূলকভাবে চারটি উদ্যোগ বাতিল। সুপারিশ করবো অন্তত আদালতের পরামর্শ অনুযায়ী, সামিটের সঙ্গে তৃতীয় ভাসমান টার্মিনাল চুক্তি নিয়ে বিতর্ক আদালতের বাইরে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান। সরকার বলছে চীনের কোম্পানির সঙ্গে সদ্য সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী, ১৮ মাসের মধ্যে এলএনজি আমদানি হবে। বাংলাদেশ এবং বিশ্ব বাস্তবতায় এ ধরনের কার্যক্রম ২৪-৩০ মাস সময় লাগবে। আর ভূমিভিত্তিক টার্মিনাল নির্মাণে সময় লাগবে ৫০-৬০ মাস। ২০৩৫ মাস নাগাদ আরো ৪০০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আমদানি করতে হলে কাতার, ওমানের বাইরে অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রুনাইসহ অন্য দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি সম্পাদনের কার্যক্রম দ্রুত সম্পাদন করতে হবে। সরকারের ভাবনায় আছে পায়রা, মোংলা এবং হিরণ পয়েন্টে ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণের। এ স্থানগুলোতে এলএনজি পরিবাহী জলযান চলাচলের ন্যূনতম ড্রাফট বা আর এলএনজি পরিবহনের পাইপলাইন নেই। আইএসও ট্যাংকে এলএনজি পরিবহনের পরিকল্পনা বাংলাদেশের জন্য উপযোগী নয়। সরকার এ বিষয়গুলো নিবিড়ভাবে পর্যালোচনার জন্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ করতে পারে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান বৃদ্ধি

সরকার যথাযথভাবেই সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে। ২০৩০ নাগাদ ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। উদ্যোক্ততাদের উৎসাহ প্রদানের জন্য নানা ধরনের প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে। ছাদভিত্তিক ব্যাটারি সংযুক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে সরবরাহের জন্য বিদ্যুৎ মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছে।

উদ্যোগগুলো প্রশংসনীয় কিন্তু বাস্তবায়নে অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সংযোজনে সীমাবদ্ধতা আছে। তবে দেশ জুড়ে মিনি গ্রিড, মাইক্রো গ্রিড সক্রিয় করে এবং পুনরায় সোলার হোম সিস্টেম পুনর্জাগরণের মাধ্যমে ডিস্ট্রিবিউটেড জেনারেশন পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হলে উদ্যোগের সফলতা আসবে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে সঠিক মান বজায় রাখার জন্য স্রেডাকে অনেক সময় উপযোগী করা প্রয়োজন।

ভোলার উৎপাদিত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সংযুক্তি করা

সরকারকে ভুল ধারণা দেওয়া হয়েছে ভোলার আবিষ্কৃত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত করার বিষয়ে পাইপলাইন নির্মাণের চ্যালেঞ্জ নির্মাণ বিষয়ে। ভোলা-বরিশাল-খুলনা পাইপলাইন নির্মাণ উদ্যোগের সঙ্গে ১৯৯৯-২০০০ সম্পৃক্ততা এবং ১৯৭৭-২০২৬ দেশ-বিদেশে গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণের সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা সঙ্গে নিশ্চয়তা দিতে পারি সঠিক উদ্যোগ নিয়ে অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের দায়িত্ব দেওয়া হলে তিন বছরের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী আর জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীর ধারণা যথাযথ নয়। তবে এ পাইপলাইন রাইট অফ ওয়েতে তিনটি বৃহৎ নদীসহ ১২-১৫টি নদী অতিক্রম করতে হবে। তিন-চারটি এইচডিডি পদ্ধতি এবং সাব সি পাইপলাইন নির্মাণ ঠিকাদার নিয়োগ করা হলে এবং বাকি পাইপলাইন নির্মাণে সোয়াম্প বাগিসহ আধুনিক নির্মাণ উপকরণ ব্যবহার করা হলে সর্বোচ্চ দুই নির্মাণ মৌসুমে পাইপলাইন নির্মাণ সম্ভব। ভোলার গ্যাসের বিকল্প ব্যবহার হবে অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত। আশা করি, সরকার অবিলম্বে ভোলার প্রমাণিত গ্যাস রিজার্ভ নিশ্চিত হবার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি পাইপলাইন নির্মাণ দায়িত্ব জিটিসিএলের ওপর অর্পণ করবে। এক্ষেত্রে গ্যাস সঞ্চালন ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় যোগ্য বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা যায় কিনা বিবেচনা করা যেতে পারে।

সরকারের বহুমুখী উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলছি পেট্রোবাংলা এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর যোগ্য দক্ষ কর্মকর্তাদের অযথা হয়রানি না করে পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ প্রদানের। মন্ত্রী সাংসদদের অতি কথন পরিহার করাও জরুরি।

আমি জ্বালানি বিদ্যুৎ সেক্টরের দায়িত্ব পুনরায় প্রধান মন্ত্রীকে গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানাবো। একই সঙ্গে জ্বালানী এবং বিদ্যুৎ খাত দুটি দুইজন প্রতিমন্ত্রীর উপর অর্পনের সুপারিশ করবো। 

জ্বালানি বিদ্যুৎ খাতে এখন দৌরাত্ম্য নয়া পাণ্ডবদের

বিগত সরকারের কয়েকজন সুবেশী সুশিক্ষিত আমলা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর প্রণোদনায় লুটেরা গোষ্ঠী জ্বালানি বিদ্যুৎ খাতকে দুর্নীতি আর লুটপাটের অভয় অরণ্য বানিয়েছিল। ২০০৮-০৯ বিরাজিত জ্বালানি বিদ্যুৎ সংকটকে সুপরিকল্পিত উপায়ে কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের স্বার্থে সম্প্রসারিত করেছিল বিপুল মাত্রায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা। প্রাথমিক জ্বালানির টেকসই আর নিভরযোগ্য সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত না করেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাগুজে ক্ষমতা উন্নীত হয়েছিল ২৯ হাজার মেগাওয়াট। অথচ নিজেদের প্রাথমিক জ্বালানি কয়লা এবং গ্যাস উত্তোলন বিষয়ে তাদের কোনো আগ্রহ ছিল না। বরং নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও তারা জ্বালানি বিদ্যুৎ আমদানির ফাঁদে ফেলে জ্বালানি বিদ্যুৎ খাতকে গভীর সংকটে ফেলে দিয়েছিল। এ কাজে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন আমলা, মন্ত্রী সাংসদের সংশ্লিষ্টতা বিষয়ে নানা কাহিনিতে এখন মুখর বাংলাদেশের প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক এবং সোশ্যাল মিডিয়া। অনেকেই জ্বালানি বিদ্যুতের চলমান মহামারির জন্য পাঁচজন শীর্ষ দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করেছে। এদের অপকর্মের কারণে এখন দেশ জুড়ে তীব্র জ্বালানি বিদ্যুৎ সংকট। ২৯ হাজার মেগাওয়াটের গ্রিড সংযুক্ত বিদ্যুৎ ক্ষমতা থাকলেও প্রাথমিক জ্বালানির সংকটে বর্তমান উৎপাদন ক্ষমতা ১২০০০-১৩০০০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে। দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ লোডশেডিং হয়েছে আগস্ট মাসে। ফেব্রুয়ারি ২০২৬ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসে বিএনপি সরকার সংকটে তালগোল পাকিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছে। তীব্র গরমে অসহনীয় লোডশেডিংয়ে ন্যুব্জ হয়ে পড়েছে জীবনযাত্রা। গ্যাসের অভাবে রান্নাঘরে দুরবস্থা, শিল্পগুলো অস্তিত্বের সংকটে। সবাই জানাই জ্বালানি বিদ্যুৎ বাবস্থাপনায় অতীতের বিএনপি সরকারের সাফল্য প্রশ্নবিদ্ধ। তাই সরকার এবারে বাস্তবভিত্তিক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিলেও ভরসা পাচ্ছে না জনগণ। বিশেষত যখন দেখছে বর্তমান সরকারও অতীতের মতো সুচতুর আমলাদের পরামর্শে চলছে। সরকারের কিছু আগ্রাসী সাংসদের কারণে গ্যাস সেক্টরের কিছু যোগ্য দক্ষ কর্মকর্তা কোনঠাসা হয়ে পড়েছে। দুর্বল হয়ে পড়েছে পেট্রোবাংলা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠাগুলো। যোগ্য দক্ষ কর্মকর্তাদের নিষ্ক্রিয় রেখে পেট্রোবাংলা এবং পেট্রোবাংলার কোম্পানিগুলো কখনো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে সরকারকে সংকট মুক্ত করতে পারবে না।

আমি পূর্ববর্তী সরকারগুলোর সময়ে দুর্নীতির পৃষ্ঠপোষক রাজনীতিবিদ, আমলা টেকনোক্রাটদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বস্তুনিষ্ঠ অনুসন্ধানের ভিত্তিতে আইনের আওতায় এনে শাস্তি প্রধানের অনুরোধ করছি। একই সঙ্গে বর্তমান সরকারের মন্ত্রী-সাংসদদের দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার আগেই সতর্ক করার ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করছি।

শেয়ার করুন