বাংলাদেশে দীর্ঘ দেড় বছর পর এসেছি। প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ জ্বালানি সরবরাহ চেইনের প্রতিদিনের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি। নিজের প্রায় তিন দশক জ্বালানি সরবরাহ চেনে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে. জ্বালানি লেখক হিসেবে বাংলাদেশ এবং বিশ্ব ভূরাজনীতির গতিশীলতা এবং স্থিতিবস্তা বিষয়ে ধারণা রাখি। বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি বিদ্যুৎ সংকট বিষয়ে মোটা দাগে নিম্ন বর্ণিত বিষয়গুলোকে চিহ্নিত করতে পারি।
এলএনজি সাপ্লাই চেইন ব্যাহত হওয়া
গ্যাসের ঘাটতি, কয়লা সরবরাহ ও খালাসে সমস্যা, বৈরী আবহাওয়া, বন্যা ও লজিস্টিক সমস্যা, বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটি, বিদ্যুৎ খাতের বিশাল বকেয়া, জ্বালানি ক্রয়ের চাপ, দীর্ঘদিনের জ্বালানি সেক্টর অবকাঠামোর দুর্বলতা ও অতিরিক্ত ফসিল ফুয়েল এবং আমদানি নির্ভরতা।
জ্বালানি বিদ্যুৎ খাত বিভিন্ন দেশ বিশেষত উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশে সঠিক পেশাদার নির্ভর কৌশলগত সেক্টর। রাজনৈতিক বিভেদের কারণে কোনো দেশেই বাংলাদেশের মতো জ্বালানি সেক্টর বিকাশ আর উন্নয়নে রাজনৈতিক বিভেদ বাধার সৃষ্টি বিশেষত কৌশল পরিবর্তন হয় না, অধিকাংশ দেশেই জ্বালানি সেক্টরে সুশাসন বিদ্যমান, কমবেশি দুর্নীতি থাকলেও সেগুলো জ্বালানি খাতকে অক্টোপাসের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে না।
দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অব্যবস্থাপনা আর সীমাহীন দুর্নীতির পরিণতি বর্তমান অব্যবস্থাপনা বিএনপি জামায়াতের মতো সরকার সীমিত সময়ে সেক্টর পরিকল্পনা এবং মৌলিক পরিবর্তনে বিপ্লব আনবে স্বপ্ন দেখাও অবাস্তব।
সরবরাহ চেইনে মৌলিক সংকট প্রাথমিক জ্বালানি আহরণ এবং সরবরাহে অপ্রতুলতা এবং সংকট। বাংলাদেশ কিছু বিকল্প সংস্থান করলেও মূল জ্বালানি এখনো প্রাকৃতিক গ্যাস। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সবাই উপলব্ধি করলেও দীর্ঘ প্রায় তিন দশক যাবৎ স্থলভাগে এবং সাগরে গ্যাস অনুসন্ধান দারুন ভাগে উপেক্ষিত। পরিণতি প্রমাণিত উত্তোলনযোগ্য গ্যাস সম্পদ দ্রুত নিঃশেষ হতে থাকা। একসময় দৈনিক গ্যাসের উৎপাদন ২৭০০-২৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট পৌঁছলেও এখন কমে ১৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং ক্রম হ্রাসমান। ভোলা দ্বীপে অব্যাবহৃত পড়ে আছে আবিষ্কৃত গ্যাস সম্পদ। ব্যবস্থাপনার আনাড়িপনার কারণে এলএনজি সংগ্রহ আর সরবরাহ চেইনে সৃষ্টি হয়েছে অস্থিরতা। প্রায় এক দশক হতে চললো মাতারবাড়ীর ভূমিভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নিয়ে চলছে ইঁদুর বিড়াল দৌড়াদৌড়ি। বর্তমানে দুটি ভাসমান টার্মিনালের একটি দুর্ঘটনা কবলিত হওয়ায় ভেঙে পড়েছে সরবরাহ ব্যবস্থা। মেরামত নিয়েও চলছে লুকোচুরি। কেন কোন বিচ্যুতির কারণে ঘটলো অগ্নিকাণ্ড? কেন এতো সময় লাগছে মেরামতে? সৃষ্টি হয়েছে ধোঁয়াশা। দুটি ভাসমান টার্মিনাল দিয়ে ১০০০-১০৫০ মিলিয়ন ঘনফুট আর এলএনজি জাতীয় গ্যাস গ্রিডে যুক্ত হওয়ার পরও ঘাটতি থাকে ১০০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সেখানে আর এলএনজি সরবরাহ ৩৫০-৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে আসায় সংকট দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। এছাড়া যুদ্ধ সংঘাতে জ্বালানি বাজরে লেগেছে আগুন, সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়েছে। সহসা পরিবর্তন আশা করা যাচ্ছে না।
নতুন ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণ এবং ভূমিভিত্তিক টার্মিনাল নির্মাণ উদ্যোগ নানা বিভ্রান্তিতে অনিশ্চিত। ২০২৪ আগস্ট থেকে ২০২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে এলএনজি আমদানির কিছু অগ্রবর্তী উদ্যোগ বাতিল করে সংকট ঘনীভূত করেছে। ২০০০-২০২৬ গ্যাসের চাহিদা জ্যামিতিক অনুপাতে বৃদ্ধি পেলেও সরবরাহ সংকুচিত হয়েছে। সরকারগুলো ভুল কৌশল আর পরামর্শে মূল্যবান কয়লা সম্পদ মাটির নিচে ফেলে রেখেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের জন্য নানা অভিলাষী কথা বলেও বাস্তব অর্জন অতি সামান্য। সব কিছু মিলে জ্বালানি আহরণ এবং সরবরাহ পরিস্থিতি ভয়াবহ সংকটে।
ভ্রান্তনীতি আর কৌশলের কারণে জ্বালানি সেক্টর এখন একান্ত ভাবে আমদানিকৃত জ্বালানিনির্ভর। কয়লা, গ্যাস (এলএনজি, জ্বালানি তেল, এলপিজি) এমনকি বিদ্যুৎ আমদানি হচ্ছে। কিছু অসম চুক্তি আর বিশ্বজ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বিদ্যুৎ জ্বালানি সেক্টরকে বিপুল দেনার দায়ে নুব্জ করে ফেলেছে। ছয় মাসের সরকার বকেয়া শোধ করবে না বাড়তি মূল্যে জ্বালানি কেনার অর্থ যোগান দিবে ?
প্রতিদিন মিডিয়ায় জ্বালানি সংকট নিয়ে নানা সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। দেশের মাঠপর্যায়ে জ্বালানি বিদ্যুৎ খাতে সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই এমন বিশেষজ্ঞরা নানা বয়ান দিচ্ছে। জ্বালানি প্রশাসন আর ব্যাবস্থাপনায় মৌলিক পরিবর্তন নেই। আনাড়ি আমলাতন্ত্রের পরামর্শে এযাবৎ গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তবতা বিবর্জিত মনে হচ্ছে। জ্বালানি ক্ষেত্রে কর্মরত দক্ষ অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের সঠিক পরামর্শ ক্ষেত্রবিশেষে উপেক্ষিত হওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘদিনের অপরিণামদর্শী অপব্যবস্থাপনার পরিণতি। আমি ২০৩০-এর আগে জ্বালানি বিদ্যুৎ সংকট থেকে মুক্তির কোনো পথ দেখছি না. আর সেটি হতে হলেও সেক্টরটিকে কৌশলগত সেক্টর বিবেচনা করে দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে, প্রশাসনিক সংস্কার করে সঠিক পেশাদারদের দায়িত্ব দিয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। না হয় জ্বালানি অবকাঠামো সম্পূর্ণ ভাবে ভেঙে পরে দেশের জন্য মহাবিপদ ডেকে আনবে। নগর পুড়লে দেবালয় রক্ষা পাবে না।