১৯ অগাস্ট ২০২৬, বুধবার, ০৬:১৩:০৮ অপরাহ্ন


গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ মহাসংকটে সরকারের জরুরি ব্যবস্থাপনা কী
সালেক সুফী
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৯-০৮-২০২৬
গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ মহাসংকটে সরকারের জরুরি ব্যবস্থাপনা কী


বাংলাদেশে চলছে নজিরবিহীন বিদ্যুৎ লোড শেডিং। গ্রীষ্মের তাপদহের সময়ে ঢাকার বাইরের শহরগুলো এবং গ্রামাঞ্চলে চলছে ৮-১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ লোড শেড্ডিং। গ্যাস সংকটে রান্নার চুলো জ্বলছে না, সিএনজির জন্য হাহাকার, শিল্প কারখানাগুলো গ্যাস বিদ্যুৎ সংকটে প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। ভুল জ্বালানি কৌশলে বাংলাদেশের জ্বালানি খাত ৬০-৬৫ শতাংশ জ্বালানি বিদ্যুৎ আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। নিজেদের প্রধান জ্বালানিসম্পদ প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রমাণিত মজুত নিঃশেষ হতে চলেছে। ৮-১০ বছর আগেই যখন গ্যাসের দৈনিক উৎপাদন ২৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট ছিল জাতীয় সংসদে বলা হয়েছিল তৎকালীন বিদ্যমান ব্যবহার ধারায় সঞ্চিত গ্যাসসম্পদ ২০৩১ নাগাদ নিঃশেষ হয়ে যাবে। সরকার কিন্তু দেশে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর লাগসই উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। ২০২৬ এসে নিজেদের উৎপাদন ১৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট হারে নেমে এসেছে। ২০১০ থেকে এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হলেও ২০২৬ এসে কক্স’সবাজারের মহেশখালী উপকূলে অবস্থিত দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে দৈনিক ১০৫০ মিলিয়ন ঘনফুট হারে আর এলএনজি সরবরাহ হয়। কখনো কারিগরি ত্রুটি, কখনো সাগর উত্তাল থাকলে এলএনজি জাহাজ থেকে এলএনজি সরবরাহ বিঘ্ন ঘটলে শুরু হয় তীব্র গ্যাস সরবরাহ সংকট। এমনিতেই ১০৫০ মিলিয়ন ঘনফুট সমেত পেট্রোবাংলার গ্যাস সরবরাহ ক্ষমতা এখন ২৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। দেশে বর্তমান গ্যাস চাহিদা দৈনিক কমবেশি ৪০০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ২১ আগস্ট ২০২৬ দুটি এফেসারুর একটি অগ্নি দুর্ঘটনার শিকার হলে দুই সপ্তাহ গ্যাস সরবরাহ সঙ্কট সৃষ্টি হয়। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মেরামত কাজ শেষে ভাসমান টার্মিনালের দুটি ইউনিটের একটি চালু হওয়ায় কিছুটা স্বস্তি এলেও আবার ৭২ ঘণ্টার জন্য দুটি ইউনিটের অপারেশন বন্ধ আছে। উপরন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সাগর উত্তাল থাকায় দ্বিতীয় টার্মিনালেও এলএনজি জাহাজ থেকে এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এমতাবস্তায় সরকারের জ্বালানি বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা বেসামাল হয়ে পড়েছে।

কাতার আর ওমান থেকে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধের শুরু থেকেই স্থগিত হয়ে আছে। বাংলাদেশকে অপেক্ষাকৃত অধিকমূল্যে বিকল্প সূত্র থেকে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। বিষয়টি সাময়িক হলে ঠিক আছে। কিন্তু ভূরাজনীতির বর্তমান অবস্থায় কখন গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি চালু হবে আর কবে কাতার ওমান থেকে এলএনজি চুক্তি অনুযায়ী পুনরায় স্বাভাবিক ধারায় ফিরবে নিশ্চিত নয়। এদিকে আবার দেশে গ্যাস উৎপাদন ক্রমহ্রাসমান ধারায় দ্রুত কমছে। অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে আওয়ামী সরকার আমলের কয়েকটি এলএনজি আমদানি প্রক্রিয়া বাতিল না করলে দেশে এখন আরো ৫০০ মিলিয়ন হারে এলএনজি আমদানির উদ্যোগ অগ্রবর্তী পর্যায়ে থাকতো। আমি আওয়ামী লীগ আমলে গৃহীত ৫০-১০০ কূপ খনন প্রক্রিয়ায় বাস্তব সাফল্য দেখতে পাচ্ছি না। ৫০ কূপ খনন পরিকল্পনা ২০২৫ ডিসেম্বর নাগাদ এবং ১০০ কূপ খনন ২০২৮ নাগাদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তব অগ্রগতি হতাশাজনক। অনেকে এখন তথাকথিত সিভিল সোসাইটির প্রভাবে দেশে আবিষ্কৃত মূল্যবান কয়লাসম্পদ আহরণ এবং ব্যবহার স্থগিত রাখাকে দূরদৃষ্টির অভাব হিসেবেই দেখছেন। অথচ দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন থেকে সর্বাধিক গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার সুপারিশ করলেও বিভ্রান্ত আছে সরকার।

দুই বছরের অধিক সময় আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থেকে অপসারিত। অথচ এ সময়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বের অন্তর্বর্তী সরকার বা নির্বাচিত বিএনপি জোট সরকার জ্বালানি নিরাপত্তা বৃদ্ধির কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেনি।

এমতাবস্তায় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। উপায়ন্তর না থেকে সরকার ডিমান্ড সাইড ম্যানেজমেন্টকে গুরুত্ব দিচ্ছে। সন্ধ্যা এবং রাতে বিদ্যুৎ চাহিদা কমানোর জন্য রাত ৮টার মধ্যে দোকান পাট, শপিং মল বন্ধ রাখার এবং সর্বপ্রকার আলোকসজ্জার বাহুল্য পরিহার করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। জনগণের দায়িত্ব এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা। দুনিয়ার অধিকাংশ উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশে জ্বালানি বিদ্যুৎ সংকট না থাকলেও বাংলাদেশের মতো অকারণে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয় না আর বাংলাদেশে এখন জ্বালানি বিদ্যুৎ মহামারি চলছে।

সরকার কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জ্বালানি বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় আদৌ কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। অদক্ষ, অদূরদর্শী আমলারা এখনো জ্বালানি বিদ্যুৎ খাতে দাপটের সঙ্গে বিরাজ করছে। ভাবতে পারেন গত তিনি মাসের বেশি সময় পেট্রোবাংলায় পূর্ণকালীন চেয়ারম্যান নেই। অথচ বর্তমান অবস্থায় জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করার মূল ড. দায়িত্ব পেট্রোবাংলার। জানি না পুরোপুরি আমলানির্ভর পেট্রোবাংলার পরিচালকমণ্ডলী আদৌ জ্বালানি সংকটের ব্যাপ্তি এবং গভীরতা সঠিকভাবে উপলব্ধি করে কি না? কেন পেট্রোবাংলায় এবং পরিচালকমণ্ডলীতে যোগ্য, দক্ষ অভিজ্ঞ সঠিক পেশাদার পদায়ন করা যাবে না।

আমি গ্যাস, কয়লা উত্তোলনে বর্তমান গৃহীত ব্যবস্থাপনায় ভরসা পাচ্ছি না। ভোলায় পড়ে রয়েছে আবিষ্কৃত গ্যাস, ফেনী, ছাতক টেংরাটিলায় জরুরি ভিত্তিতে গ্যাস অনুসন্ধান আর উন্নয়ন করার সুযোগ রয়েছে। বৃহত্তর চট্টগ্রাম হিল ট্রাক অঞ্চলে পটিয়া, সীতাপাহাড়, জলদী, কাসালং এলাকায় অনুসন্ধান চালালে সাফল্যের সম্ভাবনা আছে। আবিষ্কৃত কয়লাক্ষেত্র থেকে উন্নত কৌশলে কয়লা উত্তোলনের সিদ্ধান্ত হলে ২০৩২ নাগাদ কয়লা দিয়ে ৫০০০-৬০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ আছে।

পাশাপাশি সরকারকে এলপিজি সরবরাহ সুলভ আর নিরাপদ করে দুই বছরের রান্নার কাজে গ্যাস ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করার অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জানি না সাগরে গ্যাস অনুসন্ধানে কতটা সারা পড়বে। দক্ষ, যোগ্য মূল্যায়ন কমিটি নিয়োগ করে ২০২৭ জুন মাসের মধ্যে উৎপাদন বণ্টন চুক্তি করা হলে ২০৩৫ নাগাদ সুফল মিলতে পারে।

সরকার কিন্তু এখনো ভাসমান টার্মিনাল এবং ল্যান্ড বেজড টার্মিনাল নির্মাণ বিষয়ে দৃশ্যমান সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। ২০২৬ আর চার মাস সময় হাতে আছে। সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্রুত অন্তত দুটি ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণের চুক্তি হলেও ২০৩০-এর আগে বাড়তি এলএনজি আমদানির সুযোগ দেখি না। আবার এ সময়ে জিটিসিএলকে এলএনজি ইভাকুয়েশনের জন্য পাইপলাইন নির্মাণ করতে হবে। আন্তর্জাতিক নীতিমালার আলোকে প্রণীত গ্যাস নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী কোন চালু গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইনের সমান্তরালে নতুন পাইপলাইন নির্মাণ করতে হলে অন্তত ১০ মিটার দূরে নিরাপদ রাইট অফ ওয়ে অধিগ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্রস কান্ট্রি উচ্চ চাপ গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণ পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন কাজে সম্পৃক্ত থাকার অভিজ্ঞতায় বলছি সর্বোচ্চ জাতীয় অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও পথস্বত্ব অধিগ্রহণ করতেও ন্যূনতম ১৮ মাস সময় লাগবে। সরকারকে এ কাজ এখনই শুরু করতে হবে। পাশাপাশি উপকরণ ক্রয়ের উদ্যোগ নিয়ে ২০২৮ শুষ্ক মৌসুমে তৃতীয় সমান্তরাল পাইপলাইনের প্রথম অংশ নির্মাণকাজ শুরু করতে হবে। যদি তাই হয় তাহলে ২০৩০ নাগাদ অতিরিক্ত ১০০০ মিলিয়ন আর এলএনজি জাতীয় গ্রিডে সঞ্চালনের সুযোগ হবে। স্মরণে রাখতে হবে এ সময়ে নিজেদের গ্যাস উৎপাদন প্রায় শূন্যের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে যদি না দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করে ভূমিতে নতুন গ্যাসসম্পদ আবিষ্কার করা না হয়।

আশা করি, নতুন সরকার দ্রুত প্রশাসনিক সংস্কার করে পেট্রোবাংলা এবং জ্বালানি খাতকে সঠিক পেশাদারনির্ভর করে সিন্ডিকেট মুক্ত করবে।

শেয়ার করুন