শেখ হাসিনা
আবারও ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভাষণ দেবেন। এমন খবর বেড়িয়েছে ভারতীয় গণমাধ্যমে। দিল্লীর একটি ক্লাবে শোনানো হবে তার অডিও বার্তা। এর আগে তিনি এক সাক্ষাৎকারে জোর দিয়ে বলেছেন যে, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন। বলেছেন, জীবনের ঝুঁকি ও পরিণতির কথা জেনেই তিনি দেশে ফিরতে চান।
তার এধরনের বার্তায় নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে উতাল পাতাল হয়ে যেতে দেখা যেতো। কেননা দেখা গেছে,ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি অনলাইন বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীসহ সারা দেশে তীব্র উত্তজেনা সৃষ্টি হয়। এর পরিণতি হয় ভয়াবহ। ছাত্র-জনতা মিলে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ভবনটি ভাঙচুর ও বুলডোজার চালিয়ে তা গুঁড়িয়ে দেয়। ছাত্র-জনতা স্বতঃর্স্ফূতভাবে জড়ো হয়ে ভবনটির বিভিন্ন অংশ ভেঙ্গে ফেলেন। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শাসনামলে এবারে তেমন উচ্চবাচ্য হচ্ছে না। কারো কারো ধারণা, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার ও তার দল শেখ হাসিনার এমন ‘ভার্চ্যুয়াল আওয়াজ’ গুরুত্ব দিচ্ছেন না বা আমলে নিচ্ছেন না। আবার বর্তমান সরকারের অহিংস নীতিও এক্ষেত্রে কাজ করেছে বলে কারো অভিমত।
তবে এর-ও পেছনে কারণ আছে। কেননা ইতোমধ্যেই ভারতীয় গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে যে, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত থেকে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার অনুমতি পাচ্ছেন না। ভারতের সংসদীয় কমিটিকে নিশ্চিত করেছে দেশটির সরকার। শেখ হাসিনার এ বছরের শেষ নাগাদ দেশে ফেরার সাম্প্রতিক মন্তব্যের প্রেক্ষাপটে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই অবস্থান পরিষ্কার করে।
এছাড়া ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগামী সেপ্টেম্বরে দিল্লি যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাকে দিল্লি সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন যা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে বিশেষ ইঙ্গিত বহন করে। আবার এই ধরনের পরিস্থিতিতে আরেকটি খবর-ও সবার দৃষ্টি কেড়েছে। তা হচ্ছে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেছেন, “আমরা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। আর এজন্য হয়তবা ভারতের বর্তমান অবস্থার প্রতি সম্মান দেখিয়ে বিএনপি সরকার নিরব থেকেছে এই ভেবে যে ভারত শেখ হাসিনাকে নিয়ে বাংলাদেশে আর কোনো ‘কূটচাল’ দেবে না। কিংবা দ্যুতিয়ালি ভূমিকায় নামবে না। যদিও এ-ই নিরবতা ভেঙ্গেছে গত ৩ আগস্ট সোমবার। এতে দেখা যায় যে, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কোনো ব্যক্তি যেন ভারতের ভূখন্ড ব্যবহার করে রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে না পারেন, সে বিষয়ে ভারত সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। সোমবার বিকেলে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এ কথা বলেন।
প্রশ্ন হচ্ছে এতো অডিও বার্তা কার জন্য?
তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন হচ্ছে শেখ হাসিনার এতো অডিও বার্তা দিচ্ছেন কার জন্য?.কাদের জন্য তিনি আবারও দিল্লির একটি ক্লাব শোনাতে চাচ্ছেন তার অডিও বার্তা। এনিয়ে নানান ধরনের আলোচনা চলছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। কেননা দেখা যাচ্ছে শেখ হাসিনা অডিও বার্তা দিতে যাচ্ছেন তাও আবার ২০২৪ সালে ঠিক জুলাই বিপ্লবে তার শেষ পরিণতির দিন। অর্থ্যৎ যেদিন শেখ হাসিনা পালিয়ে দিল্লিতে আশ্রয় নেন। দিল্লিতে বসে ঠিক ওইদিনই অডিও বার্তার দেওয়ার কারণে হচ্ছে তিনি জুলাই বিপ্লবের বিপরীতে যে এখনো বিপরীত দিকে আছেন তা জানান দিচ্ছেন।
সরকারও নড়েচড়ে বসেছে
আর সেকারণে তারেক রহমান সরকার নড়েচড়ে বসেছেন। যদিও ক্ষমতাসীনরা জানে যে, শেখ হাসিনার পতনের পরে ভারতে বসে বসে একের পর এক অডিও বার্তার পরও যে বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া তার দল যে বড়ো ধরনের কোনো কিছু করে ফেলেতে পারবে না। কিন্তু একেবারে চুপ থাকলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে সরকারের ব্যাপারে জুলাই আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়ার সেই সংগ্রামী ছাত্র-জনতারা একধরনের অপমান বোধ করবেন। কেননা বুধবার হচ্ছে ৫ আগস্ট। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার তীব্র গণ-আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যার মাধ্যমে তাঁর ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। বিষয়টি বুঝতে পেরেই ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কোনো ব্যক্তি যেন ভারতের ভূখন্ড ব্যবহার করে রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে না পারেন, সে বিষয়ে ভারত সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। তাছাড়া ঠিক ৫ আগস্ট বসে শেখ হাসিনা যদি দিল্লিতে বসে কোনো ধরনের বয়ান দেন তা-তে বাংলাদেশে জুলাই আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিল সে-সব ছাত্র-জনতা একধরণের অপমান বোধ করত পারেন ভেবেই ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী-কে ওই বার্তাটি দিয়েছেন পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।
তোমরা আমাকে ভুলে যেও না
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে আরও কি কারণ আছে শেখ হাসিনার বারবার অডিও বার্তার পেছনেঃ কারো কারো মতে, শেখ হাসিনা যখন একের পর এক অডিও বার্তা দিয়েই যাচ্ছেন তখন তার ব্যাপারে ভারতের সর্বশেষ অবস্থান জানতে বাংলাদেশে একটা রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি হয়ে গেছে। সেটি হচ্ছে ভারত এখন আর শেখ হাসিনা নিয়ে বাংলাদেশের সাথে কোনো ধরনের বিরোধে জড়াতে চায় না। আশ্রয় দেয়া হয়েছে, জান-প্রাণ বাঁচিয়েছে- ব্যস এতটুকু। বিষয়গুলো যখন এখানেই সমাপ্ত হয়ে যাচ্ছে তখন শেখ হাসিনা হয়ত সেখান থেকেই শুরু করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। জানান দিচ্ছেন তাকেই নিয়েই যেনো ভারত ভাবে, গুরুত্বেও তালিকায় রাখে। বোঝাতে চাইছেন যে, বাংলাদেশের মাটিতে তার আবেদন এখনো আছে। মোদ্দাকথা, শেখ হাসিনা হয়তবা তার দল আ. লীগের নেতাকর্মীরা নয়, বরং ভারত সরকারকেই বার্তা দিচ্ছে, ‘তোমরা আমাকে ভুলে যেও না’।
আসল ঘটনা কি?
তবে আরেকটি সূত্র জানায় যে, বারবার দিল্লিতে বসে বারবার বাংলাদেশের নেতাকর্মীদের প্রতি অডিও বার্তার নেপথ্য আছে। কারো কারো মতে, আসল ঘটনা অন্য জায়গায়। একটি সূত্র জানায়, ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে যাওয়ার পর থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর দলের একটি বড়ো অংশ বিক্ষুব্ধ। উদার গণতান্ত্রিক ধারায় বিশ্বাসীদের একটি অংশ শেখ হাসিনাকে বরাবরই বিভিন্ন ভাবে বলে আসেছেন যে এভাবে আর উগ্রপন্থা নিয়ে আ. লীগকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়া যাবে না। তাদের অভিমত এভাবে জ্বালাময়ী অডিও বার্তা দিয়ে আ. লীগের নেতাকর্মীরা আর সামনের দিনে খুব কার্যকর কিছু করতে পারবে না। জনগণের কাছে বাংলাদেশে তার আগের সেই ইমেজ কিংবা অবস্থানও নেই। বরং এতে বাংলাদেশে অবস্থান করা ত্যাগী নেতাকর্মীরা ভীতিকর অবস্থায় পড়ে যাচ্ছেন। একারণে তাদের একটি বড়ো অংশ চায় বাংলাদেশে এখনই না হোক আস্তে আস্তে অহিংস অবস্থান নিয়ে আওয়ামী মাঠে কাজ করুক। ভার্চ্যুয়াল জগতে উত্তেজনাকর জ্বালাময়ী বক্তব্য না দিয়ে দলটির অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য ক্ষমতা চেয়ে এখনই সামনের দিকে এগুনো। কিন্তু জানা গেছে দিল্লিতে শেখ হাসিনাকে এখন কট্টরপন্থীরা ঘিরে রেখেছে। তারা বাংলাদেশে ক্ষমতায় থাকার সময় যেমন দল ও দেশ পরিচালনা করেছে ঠিক সেই কায়দার দিল্লিতে বসেও রাজনীতি করতে চাচ্ছে। তারা বাংলাদেশে তারেক রহমান সরকারের অহিংস ও সহঅবস্থানের রাজনীতিকে দুর্বলতা ভেবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এরা ক্ষমতাসীন আমলে দলকে মূল নেতৃত্ব থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। এই তারাই এখনো দলের তাদের কট্টরপন্থা বজায় রাখতে চায়।
কিন্তু একটি সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের দলের ভেতরে এখন একটি বড়ো অংশই চায় অহিংস অবস্থান। আবার এর পাশাপাশি আরেকটি অংশ চায় বাংলাদেশে দলের কার্যকম চালানোর ব্যাপারে শেখ হাসিনাকে বাদ দিয়ে অন্য কিছু করা হোক। বিকল্প নেতৃত্ব তৈরি করা হোক। একটি সূত্র জানায়, দলের একটি বড়ো অংশ চায় বাংলাদেশে একটি কমিটি গঠন করে ধীরে ধীরে তার মাধ্যমে দলকে সামনের দিনে পরিচালিত করা। কিন্তু দলের কট্টরপন্থীদের পাল্লায় পড়ে এবিষয়ে বরাবরের মতো শেখ হাসিনা অনড় অবস্থানে আছে। জানা গেছে একই রকমভাবে তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও তিনি একরোখা আচরণ বজায় রাখেন। কেননা সেই সময় বাংলাদেশে দলটির একটি বড়ো অংশ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে কোনোভাবে তার দলটিকে অংশ নিতে পরামর্শ দেয়, যা শেখ হাসিনা বাতিল করে দেন। এজন্য কারো কারো মতে, শেখ হাসিনা যেমন আমরন বাংলাদেশে ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছেন ঠিক তেমনি এখনো দলটির সভাপতির হাল ধরে রাখতে চান। দলের ভেতরে এখন এটা বদ্ধমূল যে শেখ হাসিনা কোনোআবেই আর বাংলাদেশে এসে রাজনীতি করতে পারবে না। আবার তা-কে পুরোপুরি মাইনাসও করা যাবে না। সেই জন্য তাকে নেপথ্যে রেখেই বাংলাদেশে কাউকে ভারপ্রাপ্ত হিসাবে এখন দ্রুত দল পরিচালনা করা হোক। এ ব্যপারে দলের ভেতরে প্রচণ্ড চাপও রয়েছে। একটি সূত্র জানায়, শেখ হাসিনার পরিবারের ঘনিষ্ঠদেরও কেউ কেউ দলের হাল ধরতে কূটকৌশল চালিয়ে যাচ্ছেন। এরা দিল্লি ও আমেরিকান লবিং নিয়ে ব্যস্ত। তাছাড়া এর আগে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের একটি সাক্ষাৎকারের বক্তব্যও দলের ভেতরে নানান ধরনের গুঞ্জনে ঘি ঢেলে দেওয়া হয়। কেননা জয় ওই সাক্ষাৎকারে জানিয়ে দেন যে তার মা শেখ হাসিনা রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার কথা ভাবছেন এবং তিনি আর সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরবেন না। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এই তথ্য জানান। জানা গেছে, এসব নিয়ে শেখ হাসিনাকে ঘিরে রাখা দিল্লিতে পলাতক কট্টরপন্থী আ. লীগ নেতারা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। কারো কারো মতে, এই কট্টরপন্থীরা এখন দিল্লি আমেরিকা-লন্ডনে বিলাশবহুন জীবন-যাপন করছেন, আরাম আয়েশে ডাবের শরবত খাচ্ছেন আর ভার্চ্যুয়ালি নেতাকর্মীদের উত্তেজিত রাখছেন। তারা-ই এখন আওয়ামী লীগে শেখ হাসিনা নেতৃত্বকেই ধরে রাখতে তাকে পরামর্শ দিচ্ছেন। তাদের পরামর্শ হচ্ছে শেখ হাসিনা ভার্চ্যুয়ালিও যদি সক্রিয় না থাকেন তাহলে অনেক বিপত্তি আছে। এতে করে ধীরে ধীরে আ.লীগে তার নেতৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। সে-ই স্থানে তার পরিবারে বিপরীত মুখী অবস্থানে থাকা সদস্যরা শূন্যস্থান পূরণ করে নেবে। এসব কারণে এখনো আ. লীগে শেখ হাসিনা তার অবস্থান শক্ত রাখতে দফায় দফায় ভার্চ্যুয়ালি গর্জে উঠছেন। ভারত সরকার আর আ. লীগের নেতাকর্মীদের জানান দিচ্ছেন যে, তিনিই এখনো দলের সক্রিয় সভাপতি।