০৯ জুলাই ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ৬:০৬:১২ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
অপহরণ ও নির্যাতন : লুবনা দুই অপহরণ মামলায় দোষী সাব্যস্ত নিউইয়র্কে ১ হাজার ২৫০ কিউনি শিক্ষার্থীর জন্য বিনামূল্যে অমনি কার্ড পাইলট কর্মসূচি মসজিদে ইসলামবিরোধী ও প্রাণনাশের হুমকিতে এক ব্যক্তি অভিযুক্ত সুলতানা রাজিয়া ও সৈয়দ রুবেল অপহরণ মামলায় দোষী সাব্যস্ত যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ বছর উদযাপনে ধর্মীয় ইতিহাস ঘিরে বিতর্ক দুর্বৃত্তের অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত নর্থ ইস্ট ফিলাডেলফিয়া ইসলামিক সেন্টার ওজনপার্কের বৈঠকখানা রেস্টুরেন্টে হাতবোমা নিক্ষেপ নিউইয়র্কে আইনশৃঙ্খলার উন্নয়নে ১০০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ঘোষণা কঠোর অভিবাসন নীতিতে বিপাকে মার্কিন নাগরিকদের বিদেশি স্বামী-স্ত্রী আগাম বন্যার পদধ্বনি, আশঙ্কার ছায়া চট্টগ্রাম-সিলেটে


ব্রাজিলের বিদায়, বিশ্বকাপ কী অধরাই থাকলো নেইমারের
মাসউদুর রহমান
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৮-০৭-২০২৬
ব্রাজিলের বিদায়, বিশ্বকাপ কী অধরাই থাকলো নেইমারের নেইমার


বিশ্বকাপ মানেই ব্রাজিল। শৈল্পিক ফুটবল, আক্রমণাত্মক ছন্দ, চোখধাঁধানো ড্রিবলিং আর অসংখ্য তারকার সমাহারে প্রতি আসরেই শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে মাঠে নামে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। এবারের বিশ্বকাপেও প্রত্যাশার পারদ ছিল আকাশচুম্বী। কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর বিশ্বাস ছিল, দীর্ঘ ২৪ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরবে সেলেসাওরা।

কিন্তু বাস্তবতা হলো নির্মম। কোটি ভক্তের স্বপ্ন ভেঙে দিয়ে শেষ ষোলোর লড়াইয়ে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে ব্রাজিল। এ অপ্রত্যাশিত পরাজয়ে বিশ্বজুড়ে ব্রাজিল সমর্থকদের মধ্যে নেমে এসেছে পিনপতন নীরবতা, ভাসছেন তারা হতাশার সাগরে।

বিশ্বের প্রায় অর্ধেক ফুটবলপ্রেমীর আবেগ জড়িয়ে থাকে ব্রাজিলকে ঘিরে। তাদের ছন্দময়, নান্দনিক ও অ্যাটাকিং ফুটবল যুগ যুগ ধরে ফুটবলপ্রেমীদের মুগ্ধ করে এসেছে। কিন্তু এবার সে পরিচিত ব্রাজিলকে খুব বেশি সময় দেখা গেল না। টুর্নামেন্টজুড়ে দলটি নিজেদের সেরাটা ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরতে পারেনি। সুযোগ তৈরি করলেও গোল করার ক্ষেত্রে ছিল অদ্ভুত ব্যর্থতা আর রক্ষণভাগের ছোট ছোট ভুলের মাশুল দিতে হয়েছে সবচেয়ে বড় মঞ্চে।

ব্রাজিলের বিদায় শুধু একটি দলের বিদায় নয়; এটি যেন কোটি কোটি সমর্থকের বিশ্বকাপ স্বপ্নেরও সমাপ্তি। অনেকের কাছে এখন বিশ্বকাপ শুধুই নিয়মরক্ষার টুর্নামেন্ট। যাদের হৃদস্পন্দন ব্রাজিলকে ঘিরে, তাদের কাছে শিরোপার লড়াইয়ের রোমাঞ্চ অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে।

এদিকে ব্রাজিলের বিদায়ের পর নজর এখন বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার দিকে। তবে আর্জেন্টিনাও এখন পর্যন্ত এমন কোনো দাপুটে ফুটবল উপহার দিতে পারেনি, যা তাদের এককভাবে শিরোপার সবচেয়ে বড় দাবিদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ম্যাচ জিতলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কঠিন লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে এগোতে হয়েছে তাদের। ফলে নকআউট পর্বে যেকোনো অঘটনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

যদি বর্তমান চ্যাম্পিয়নরাও হোঁচট খায়, তবে এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল বিশ্বকে উপহার দিতে পারে এক নতুন পরাশক্তি। ইউরোপের উদীয়মান দলগুলোর আত্মবিশ্বাস, কৌশলগত শৃঙ্খলা এবং গতিময় ফুটবল ইতোমধ্যেই প্রমাণ করে দিয়েছে—নাম নয়, মাঠের পারফরম্যান্সই এখন সবচেয়ে বড় পরিচয়।

ব্রাজিলের জন্য এই বিদায় নিঃসন্দেহে আত্মসমালোচনার সময়। তারকানির্ভরতার বাইরে গিয়ে আরো কার্যকর দলগত পরিকল্পনা, গোলের সামনে নির্ভুলতা এবং রক্ষণভাগে স্থিরতা ফিরিয়ে আনতে না পারলে আগামী দিনেও শিরোপার স্বপ্ন অধরাই থেকে যেতে পারে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত- ব্রাজিল বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলেও তাদের প্রতি কোটি মানুষের ভালোবাসা, আবেগ ও প্রত্যাশা একটুও কমবে না। নতুন স্বপ্ন, নতুন প্রজন্ম এবং নতুন প্রত্যাশা নিয়েই হয়তো আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরবে ফুটবলের সবচেয়ে জনপ্রিয় দলগুলোর একটি ব্রাজিল।

এর চেয়ে বাজে রেজাল্ট কী আর কখনো ছিল?

এটি ব্রাজিলের ২৩তম বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ। বিশ্বকাপের ইতিহাসে একমাত্র দল হিসেবে তারা সব আসরেই খেলেছে। ২০২৬ বিশ্বকাপে শেষ ষোলোর (রাউন্ড অব ১৬) বিদায় তাদের সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম বাজে ফল। ১৯৯০ সালের পর এ প্রথম তারা কোয়ার্টার ফাইনালেও উঠতে পারেনি। ২০০৬, ২০১০, ২০১৮ ও ২০২২ সালে তারা কোয়ার্টার ফাইনালে বিদায় নিয়েছিল, আর ২০১৪ সালে সর্বশেষ সেমিফাইনালে উঠেছিল। তবে এর চেয়েও আগে বিদায় নেওয়ার নজির ব্রাজিলের রয়েছে। ১৯৩০, ১৯৩৪ ও ১৯৬৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিল গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছিল।

নেইমারের বিশ্বকাপ জেতা হবে না?

নেইমারকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন। ভক্তরা পেলের কাছাকাছি একজনকে খুঁজে পেয়েছিলেন নেইমারের মধ্যে। কিন্তু দুর্ভাগ্য তার। সম্ভবত নেইমারের আর বিশ্বকাপ জেতা হলো না! সাম্প্রতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী, সম্ভাবনা কার্যত শেষ হয়ে গেছে তার ওই সম্ভাবনা। এমনিতেই ইনজুরির সঙ্গে তার নিদারুণ এক সখ্য। এরপর নরওয়ের বিপক্ষে হারের পর আবেগঘন প্রতিক্রিয়ায় নেইমার জানিয়েছেন, ব্রাজিলের হয়ে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ। যদি তিনি সিদ্ধান্তে অটল থাকেন, তাহলে চারটি বিশ্বকাপ (২০১৪, ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬) খেলেও বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যাবে।

তবে ফুটবলাদের বিশ্বাস করতে নেই। মেসিকে নিয়েও এমনটা ভাবা হয়েছিল। কিন্তু মেসি কিন্তু এ আসরেও বেশ দাপটেই খেলছেন। ফলে নেইমার এখন হয়তো হতাশা থেকে এমনটা বলছেন। সব ঠিক থাকলে, তার ইনজুরি ডিস্টার্ব না করলে মেসির মতো হলে হতেও পারে। তবে ওটা পরের কথা। এ বিশ্বকাপের ইতিহাসই শুধু নয়, ফুটবল ইতিহাসে এটিও একটি বেদনাদায়ক অধ্যায়। কারণ নেইমারকে অনেকেই পরবর্তী ব্রাজিলের সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে বিবেচনা করেন। ব্যক্তিগত সাফল্য, গোল এবং রেকর্ডে তিনি উজ্জ্বল হলেও বিশ্বকাপ ট্রফি ছুঁতে না পারলে, অর্থাৎ পরের বিশ্বকাপে যদি নাই খেলতে পারেন, তাহলে নেইমারের ক্যারিয়ারে একটি বড় অপূর্ণতা থেকেই যাবে সম্ভবত।

নেইমারের এটি ছিল চতুর্থ বিশ্বকাপ

নেইমার অংশ নিয়েছেন চারটি বিশ্বকাপ। এর মধ্যে তার সূচনা ২০১৪ ব্রাজিল (নিজেদের মাটিতে), সেমিফাইনাল পর্যন্ত; চোটের কারণে শেষ দিকে খেলতে পারেননি।

২০১৮ রাশিয়া, কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের কাছে বিদায়।

২০২২ কাতার, কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে টাইব্রেকারে বিদায়।

২০২৬ উত্তর আমেরিকা (যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো), শেষ ষোলোর লড়াইয়ে নরওয়ের কাছে হেরে বিদায়।

ব্রাজিলীয় ফুটবলে অনন্য কৃতিত্ব

এতোকিছুর পরও বিশেষ একটি কীর্তিও গড়েছেন নেইমার। ২০২৬ বিশ্বকাপে গোল করে তিনি পেলের পর চারটি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করা দ্বিতীয় ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার হয়েছেন। তবে বড় আফসোস তার। চারটি বিশ্বকাপ খেলেও শিরোপা জেতার স্বপ্ন পূরণ হলো না। 

ক্লাব ফুটবলে দুর্দান্ত নেইমার

ক্লাব ফুটবলে নেইমারের ক্যারিয়ার নিঃসন্দেহে অসাধারণ। অনেক ফুটবল বিশ্লেষকের মতে, ক্লাব পর্যায়ে তিনি তার প্রজন্মের অন্যতম সফল ও নান্দনিক ফুটবলার। কিন্তু জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বকাপ ট্রফি জিততে না পারা তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ হয়েই রয়ে গেল।

নেইমারের ক্লাব ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলো হলো-

সান্তোসের হয়ে ২০১১ সালে জিতেছেন Copa Libertadores, যা ব্রাজিলের ক্লাব ফুটবলের সর্বোচ্চ সাফল্যগুলোর একটি।

বার্সেলোনার হয়ে ২০১৪-১৫ মৌসুমে জিতেছেন UEFA Champions League। একই সঙ্গে দুটি La Liga, তিনটি Copa del Rey  FIFA Club World Cup জয় করেন।

প্যারিস সেন্ট জার্মেইনের হয়ে পাঁচটি ফরাসি লিগ শিরোপাসহ একাধিক ঘরোয়া ট্রফি জিতেছেন এবং ২০২০ সালে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালেও খেলেছেন। ২০১৭ সালে বার্সেলোনা থেকে পিএসজিতে তার স্থানান্তর ছিল তৎকালীন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ট্রান্সফার।

ব্যক্তিগত অর্জনেও নেইমার উজ্জ্বল। তিনি ৪০০-এর বেশি সিনিয়র পর্যায়ে গোল করেছেন। ব্রাজিল জাতীয় দলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে নিজের নাম লিখিয়েছেন তিনি।

তবু ফুটবলে একটি কথাই বারবার ফিরে আসে, মহান খেলোয়াড়দের মূল্যায়নে বিশ্বকাপের গুরুত্ব আলাদা। ক্লাব ফুটবলে প্রায় সব বড় ট্রফি জিতলেও চারটি বিশ্বকাপ খেলেও বিশ্বকাপ ট্রফি ছুঁতে না পারা নেইমারের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

শেয়ার করুন