নিউ জার্সির নিউয়ার্কে অবস্থিত আইস আটক কেন্দ্র ডিলানি হল
ইউএস ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস) তাদের আটক কেন্দ্রগুলোতে কংগ্রেস সদস্যদের প্রবেশাধিকার সীমিত করার নতুন পদক্ষেপ নেওয়ায় মানবাধিকারকর্মী, আইনপ্রণেতা এবং নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, সংস্থাটি জনসাধারণের কাছ থেকে আটক কেন্দ্রগুলোর প্রকৃত অবস্থা আড়াল করতে এবং জবাবদিহিতা এড়াতে ক্রমবর্ধমানভাবে গোপনীয়তার আশ্রয় নিচ্ছে।
সাম্প্রতিক এক ঘটনায় নিউ জার্সির নিউয়ার্কে অবস্থিত ডিলানি হল আটক কেন্দ্রে চলমান অনশন কর্মসূচির সময় আইসিই কর্মকর্তারা আইনপ্রণেতাদের প্রবেশে বাধা দেয়। একই সময়ে কেন্দ্রের বাইরে বিক্ষোভরত শত শত প্রতিবাদকারীর বিরুদ্ধে পেপার স্প্রে ব্যবহারের অভিযোগও ওঠে। ঘটনাটি আবারও অভিবাসন আটক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও সরকারি তদারকি নিয়ে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
গত ১১ মে আইস একটি নতুন স্মারক জারি করে, যেখানে বলা হয় যে কোনো কংগ্রেস সদস্য বা তাদের কার্যালয় আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাইলে আগে থেকেই নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম উল্লেখ করতে হবে। পাশাপাশি আটক ব্যক্তির লিখিত সম্মতির প্রমাণ এবং অন্তত দুদিন আগে নোটিশ দিতে হবে। সমালোচকদের মতে, এ শর্তগুলো আইনপ্রণেতাদের স্বাধীনভাবে আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলা এবং কেন্দ্রগুলোর প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের ক্ষমতাকে সীমিত করবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের সময় থেকেই অভিবাসন আটক কেন্দ্রগুলোতে কংগ্রেসের নজরদারি সীমিত করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর আগে সাবেক হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি ক্রিস্টি নোমের আরোপিত কিছু বিধিনিষেধ আদালতের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল। বিভিন্ন ফেডারেল আদালত রায় দিয়েছিল যে কংগ্রেসের বৈধ তদারকি কার্যক্রমে বাধা দেওয়া আইনসংগত নয়।
আইসের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে তারা বারবার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের আটক কেন্দ্র পরিদর্শনে বাধা দিয়েছে। গত বছর বহুল আলোচিত এক ঘটনায় ডিলানি হল কেন্দ্রে প্রবেশের চেষ্টা করার সময় নিউ জার্সির কংগ্রেসনাল প্রতিনিধিদলের তিন সদস্য এবং নিউয়ার্কের মেয়রকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। সাম্প্রতিক সংঘাতকে সেই ধারাবাহিকতারই অংশ হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকরা।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, কংগ্রেস সদস্যদের আকস্মিক বা পূর্বঘোষণাবিহীন পরিদর্শন জনস্বার্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব সফরের মাধ্যমে আটক কেন্দ্রগুলোর বাস্তব পরিস্থিতি, চিকিৎসাসেবা, খাদ্য সরবরাহ, নিরাপত্তা এবং বন্দিদের প্রতি আচরণ সম্পর্কে নিরপেক্ষ তথ্য পাওয়া সম্ভব হয়। উদাহরণ হিসেবে কলোরাডোর অরোরা ডিটেনশন সেন্টারে কংগ্রেসম্যান জেসন ক্রোর একাধিক আকস্মিক সফরের কথা উল্লেখ করা হচ্ছে, যেখানে তিনি কেন্দ্রটির বিভিন্ন সমস্যার বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলেন।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে জর্জিয়ার সিনেটর জন অসফ অভিবাসন আটক কেন্দ্রগুলোতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে একটি বিস্তৃত প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। দেশজুড়ে বিভিন্ন কেন্দ্রে আটক থাকা ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে প্রস্তুত সে প্রতিবেদনে চিকিৎসা অবহেলা, নির্যাতন এবং পর্যাপ্ত খাবার ও পানির অভাবের মতো গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরা হয়।
এর আগে ২০২৫ সালের জুনে আইসিই একটি নীতি চালু করেছিল, যেখানে কংগ্রেস সদস্যদের কোনো কেন্দ্র পরিদর্শনের আগে সাত দিনের নোটিশ দেওয়ার শর্ত আরোপ করা হয়। ওই নীতির বিরুদ্ধে আইনপ্রণেতারা আদালতে মামলা করেন। পরবর্তী সময়ে এক ফেডারেল বিচারক রায় দেন যে, এ নীতি হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের অর্থায়ন সংক্রান্ত আইনের কিছু অংশ লঙ্ঘন করে, কারণ আইনটি কংগ্রেস সদস্যদের তদারকি কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার জন্য সরকারি অর্থ ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে।
এদিকে অভিবাসন আটক ব্যবস্থার দ্রুত সম্প্রসারণ নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে ২০২৫ সালে আইসিই ৭৫ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন পেয়েছে, যার মধ্যে ৪৫ বিলিয়ন ডলার সরাসরি আটক কেন্দ্র পরিচালনা ও সম্প্রসারণের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। এছাড়া কংগ্রেসের উভয় কক্ষ সম্প্রতি আরো ৭০ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত অর্থায়নের ব্যাপারে সম্মত হয়েছে, যদিও চূড়ান্ত আইন এখনো পাস হয়নি।
সমালোচকদের মতে, এতো বিপুল পরিমাণ করদাতার অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে জনগণের জানার অধিকার আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তারা প্রশ্ন তুলছেন, যখন মানবাধিকার লঙ্ঘন, চিকিৎসা অবহেলা এবং বন্দিদের প্রতি দুর্ব্যবহারের অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে, তখন কেন সরকারি তদারকি সীমিত করা হচ্ছে।
আইস দাবি করেছে, কংগ্রেস সদস্যদের পরিদর্শন এবং ভেতরে ছবি বা ভিডিও ধারণ কেন্দ্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটায় এবং অতিরিক্ত সম্পদের প্রয়োজন হয়। তবে সমালোচকদের মতে, ফেডারেল সরকারের অন্যতম বৃহৎ আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা হিসেবে আইসিইর পক্ষে এ যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের বক্তব্য, ছবি ও ভিডিও ধারণই আটক কেন্দ্রগুলোর প্রকৃত অবস্থা জনসমক্ষে তুলে ধরতে সহায়তা করে, যা প্রশাসনের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, কংগ্রেস সদস্যদের নির্ধারিত সফরের আগে আইসিই কখনও কখনও আটক ব্যক্তিদের অন্য কেন্দ্রে সরিয়ে দেয় বা সংশ্লিষ্ট কেন্দ্র আংশিকভাবে খালি করে ফেলে। ফলে আকস্মিক পরিদর্শনকে আরো জরুরি বলে মনে করছেন আইনপ্রণেতারা।
নিউ জার্সির কংগ্রেসওম্যান লা মনিকা ম্যাকআইভার সম্প্রতি একটি বিল উত্থাপন করেছেন, যার লক্ষ্য কংগ্রেস সদস্যদের আটক কেন্দ্রগুলোতে প্রবেশাধিকার আইনি সুরক্ষা দেওয়া। তিনি এবং অন্যান্য সমর্থকরা বলছেন, অভিবাসন আটক ব্যবস্থা যত বড় হচ্ছে এবং মৃত্যুর সংখ্যা যত বাড়ছে, ততই কার্যকর নজরদারি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে উঠছে। তথ্য অধিকার আইন (ফোইয়া) কিছু তথ্য পাওয়ার সুযোগ দিলেও দীর্ঘসূত্রতা এবং নথি প্রকাশের সীমাবদ্ধতার কারণে এটি পর্যাপ্ত নয়। তাই জনগণের পক্ষে কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করতে কংগ্রেসের সাংবিধানিক ভূমিকা আরো শক্তিশালী করার দাবি ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে।