২৩ এপ্রিল ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ০২:০৪:০১ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
নিউ ইয়র্কে অটো বীমা খরচ ও প্রতারণা রোধে ক্যাথি হোচুলের প্রস্তাব বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ বড় স্ক্রিনে দেখানো হবে অবৈধ ট্যারিফ ফেরতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে নতুন পোর্টাল চালু হার্ভার্ডে ঈদ উদযাপনের পোস্টকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্ক মার্কিন কংগ্রেসে লড়ছেন বাংলাদেশি আমেরিকান সিনেটর সাদ্দাম সেলিম মদ্যপানের খবরে দ্য আটলান্টিকের বিরুদ্ধে ২৫০ মিলিয়ন ডলারের মামলা কাশ প্যাটেলের সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির ৩৬ প্রার্থীর কারা পেলেন মনোনয়ন উজ্জীবিত নববর্ষ উদযাপন যে বার্তা দিয়ে গেল ২০২৬ সালের নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে ১৬ মিলিয়ন অভিবাসী ভোটার আইএমএফ’র শর্তের নেপথ্যে রাজনীতি না অন্যকিছু


৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের দ্বিতীয় বাড়িতে নতুন করের প্রস্তাব
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ২২-০৪-২০২৬
৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের দ্বিতীয় বাড়িতে নতুন করের প্রস্তাব ধনী নিউ ইয়র্কবাসীর ওপর আয়কর বাড়ানোর প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন জানিয়ে সমাবেশ


নিউ ইয়র্ক স্টেট গভর্নর ক্যাথি হোচুল শহরের বিলাসবহুল দ্বিতীয় বাড়ির বা সেকেন্ড হোমের ওপর নতুন ধরনের কর আরোপের প্রস্তাব দিয়েছেন, যা মূলত এটি পিয়েদ-আ-তের ট্যাক্সনামে পরিচিত। কর প্রস্তাব অনুযায়ী, নিউ ইয়র্ক সিটির এ সব দ্বিতীয় বাড়ি যেগুলোর মূল্য ৫ মিলিয়ন ডলার বা তার বেশি, সেগুলোর ওপর বার্ষিক অতিরিক্ত কর বসানো হবে। উদ্যোগকে কেন্দ্র করে স্টেটের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

গভর্নর হোচুল প্রস্তাবকে শহরের বাজেট ঘাটতি পূরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে দেখছেন। তার মতে, নিউ ইয়র্ক সিটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর হলেও এর আর্থিক ভার কেবল স্থানীয় বাসিন্দাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ন্যায্য নয়। তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, যারা ৫ মিলিয়ন ডলারের দ্বিতীয় বাড়ি কিনে বছরের বেশিরভাগ সময় সেটি ব্যবহার করেন না, তাদেরও শহরের আর্থিক দায়িত্বে অংশ নেওয়া উচিত।

 প্রস্তাবের মাধ্যমে স্টেট সরকার বছরে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত রাজস্ব সংগ্রহের আশা করছে। অর্থ নিউ ইয়র্ক সিটির বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যবহার করা হবে। বর্তমানে নিউ ইয়র্ক সিটির বাজেট ঘাটতি আনুমানিক ৫ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাজেট ঘাটতি আগামী অর্থবছর পর্যন্ত আরো জটিল আকার ধারণ করতে পারে বলেও প্রশাসন সতর্ক করেছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী করের হার একটি স্লাইডিং স্কেল পদ্ধতিতে নির্ধারণ করা হতে পারে, অর্থাৎ সম্পত্তির মূল্য যত বেশি হবে, করের হারও তত বাড়বে। তবে এখনো হার চূড়ান্ত করা হয়নি এবং এটি রাজ্যের বাজেট আলোচনার অংশ হিসেবে আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

গভর্নর হোচুলের অবস্থান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ তিনি সাধারণত কর বৃদ্ধির বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নেন। তিনি বিশেষ করে উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপের বিরোধিতা করে আসছেন। তবে দ্বিতীয় বাড়ির ওপর কর আরোপকে তিনি তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য মনে করছেন, কারণ এটি মূলত এ ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে যারা নিউ ইয়র্কের বাইরে বসবাস করেন এবং স্টেট বা সিটির আয়কর প্রদান করেন না।

 প্রস্তাব রাজনৈতিকভাবে শহরের নতুন প্রশাসনের সঙ্গে গভর্নরের সম্পর্কের প্রেক্ষাপটেও গুরুত্বপূর্ণ। নিউ ইয়র্ক সিটির বর্তমান প্রশাসন, যার নেতৃত্বে রয়েছেন মেয়র জোহরান মামদানি, দীর্ঘদিন ধরেই ধনীদের ওপর কর বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছেন। তিনি বড় করপোরেশন এবং উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ করে শহরের আর্থিক ঘাটতি পূরণের পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন। তবে হোচুল ধরনের বিস্তৃত কর বৃদ্ধির প্রস্তাবের বিরোধিতা করে আসছেন, কারণ তার আশঙ্কা এটি নিউ ইয়র্ক স্টেটের বিনিয়োগ পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

তবে পিয়েদ-আ-তের কর নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে কিছুটা সমঝোতার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। মেয়র মামদানি উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং বলেছেন, এটি ধনীদের ন্যায্য অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে। তার মতে, সিটির বাজেট ঘাটতি পূরণে ধরনের উদ্যোগ দরকার, যাতে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে।

নিউ ইয়র্কে দ্বিতীয় বাড়ি বা বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। অতীতে একাধিকবার ধরনের কর প্রস্তাব করা হলেও তা রাজনৈতিক ও লবিং চাপে বাস্তবায়িত হয়নি। ২০১৪ সালে এ একটি প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, ৫ থেকে ৬ মিলিয়ন ডলারের সম্পত্তির ওপর শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ অতিরিক্ত কর আরোপ করা হবে। সম্পত্তির মূল্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে করের হারও বৃদ্ধি পাবে এবং ২৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের সম্পত্তির ক্ষেত্রে বছরে লক্ষাধিক ডলার কর আরোপের কথা ছিল।

২০১৯ সালেও একই ধরনের প্রস্তাব আবার আলোচনায় আসে, বিশেষ করে যখন জানা যায় যে হেজ ফান্ড বিলিয়নিয়ার কেনেথ সি. গ্রিফিন সেন্ট্রাল পার্কের পাশে ২৩৮ মিলিয়ন ডলারের একটি অ্যাপার্টমেন্ট কিনেছেন। তবে সেই প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। শক্তিশালী রিয়েল এস্টেট লবির বিরোধিতা এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কার কারণে এটি আইনসভায় আটকে যায়।

রিয়েল এস্টেট ডেভেলপাররা বারবার দাবি করেছেন যে ধরনের কর নিউ ইয়র্ক সিটির আন্তর্জাতিক আকর্ষণ কমিয়ে দিতে পারে। তাদের মতে, শহরের বিলাসবহুল সম্পত্তি বাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বড় ভূমিকা রাখে, যারা বছরের খুব অল্প সময় এসব সম্পত্তি ব্যবহার করেন। যদি তাদের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ করা হয়, তবে তারা বিকল্প শহর যে মিয়ামি বা টেক্সাসের দিকে ঝুঁকতে পারেন।

নিউ ইয়র্ক সিটির হাউজিং অ্যান্ড ভ্যাকেন্সি সার্ভে অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রায় ৫৯ হাজার ইউনিট ছিল যেগুলো মৌসুমি বা আংশিক ব্যবহারের জন্য রাখা হয়েছে। ২০১৭ সালে সংখ্যা ছিল প্রায় ৭৫ হাজার, অর্থাৎ কিছুটা হ্রাস পেলেও এখনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সম্পত্তি খালি বা অর্ধেক সময় ব্যবহার হয় না।

রাজনৈতিকভাবে প্রস্তাব স্টেট সরকারের বাজেট আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। নিউ ইয়র্কের অ্যাসেম্বলি স্পিকার কার্ল হেস্টি উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন এবং অতীতে এ কর প্রস্তাবকে সমর্থন করেছিলেন বলে উল্লেখ করেছেন তার দপ্তরের মুখপাত্র। তবে তিনি মনে করেন, প্রশাসনিক দিক থেকে ধরনের কর বাস্তবায়ন কিছুটা জটিল হতে পারে এবং বিক্রয় করের মতো বিকল্প পদ্ধতি তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে।

স্টেট সিনেট এবং গভর্নরের মধ্যে বাজেট আলোচনাও এখন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। বাজেটের সময়সীমা ইতোমধ্যেই পেরিয়ে গেলেও চূড়ান্ত সমঝোতা এখনও হয়নি। আলোচনায় শহরের বাজেট ঘাটতি পূরণ এবং নতুন রাজস্ব উৎস খুঁজে বের করা একটি প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে।

মেয়র মামদানি ইতোমধ্যেই শহরের বাজেট ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং বলেছেন, প্রাথমিক অনুমানের তুলনায় প্রকৃত ঘাটতি আরো বেশি হতে পারে। তিনি দাবি করেছেন যে শহরের কিছু কর্মসূচি পুনর্বিন্যাস করলে প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় সম্ভব হতে পারে।

গভর্নর হোচুল যদিও শহরের জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, তবে তিনি করপোরেট কর বা উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের ওপর ব্যাপক কর বৃদ্ধির বিরোধিতা করে আসছেন। তার মতে, অতিরিক্ত কর বৃদ্ধি করলে ব্যবসায়িক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং ধনী বাসিন্দারা ফ্লোরিডা বা টেক্সাসের মতো রাজ্যে স্থানান্তরিত হতে পারেন।

সব মিলিয়ে, নিউ ইয়র্ক সিটির দ্বিতীয় বাড়ির ওপর প্রস্তাবিত নতুন কর রাজ্যের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং রিয়েল এস্টেট খাতে নতুন বিতর্ক সৃকিরেছে। একদিকে বাজেট ঘাটতি মোকাবিলার প্রয়োজন, অন্যদিকে বিনিয়োগ পরিবেশ ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার বিষয় হলো, দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে বের করাই এখন স্টেট প্রশাসনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী বাজেট আলোচনায় প্রস্তাব কতটা বাস্তবায়নযোগ্য হবে, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

শেয়ার করুন