নিউইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস ১৪ সেপ্টেম্বর সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে নতুন ‘পাবলিক চার্জ’ বিধির বিরুদ্ধে নিউইয়র্কসহ ২২টি অঙ্গরাজ্যের দায়ের করা মামলার ঘোষণা দেন
গ্রিনকার্ডের আবেদনকারীদের ওপর সরকারি সহায়তা গ্রহণের প্রভাব আরো বিস্তৃতভাবে বিবেচনার সুযোগ দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন ‘পাবলিক চার্জ’ নীতির বিরুদ্ধে গত সোমবার নিউইয়র্কের উএস সাদার্ন ডিস্ট্রিক্ট ফেডারেল কোর্টে পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। নীতিটি আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও মামলাকারী ২৩টি স্টেট, ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়া এবং নিউইয়র্ক, শিকাগো, সান ফ্রান্সিসকো ও সিয়াটেল সিটিসহ একাধিক স্থানীয় সরকার আদালতের কাছে তা আটকে দেওয়ার আবেদন করেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি গ্রিনকার্ডের জন্য আবেদন করলে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা তার আর্থিক পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যতে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার সম্ভাবনাকে আগের তুলনায় আরো বিস্তৃতভাবে বিবেচনা করতে পারবেন। দীর্ঘদিন ধরে ফেডারেল আইনে এমন ব্যক্তিদের গ্রিনকার্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে, যাদের ভবিষ্যতে সরকারের ওপর প্রধানত নির্ভরশীল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে আগে স্ন্যাপ বা ফুড স্ট্যাম্প এবং মেডিকেইডের মতো নন-ক্যাশ সরকারি সুবিধা সাধারণত পাবলিক চার্জ নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হতো না। নতুন নীতিতে সরকারি সুবিধার আরো বিস্তৃত তালিকা ইমিগ্রেশন সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে বিবেচনার সুযোগ রাখা হয়েছে।
নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমসের নেতৃত্বে দায়ের করা স্টেটগুলোর মামলার প্রধান যুক্তি হলো, নতুন নিয়মটি ফেডারেল প্রশাসনিক আইন লঙ্ঘন করছে এবং ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস) তার আইনগত ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছে।
মামলাকারী স্টেটগুলোর দাবি, নতুন নীতির কারণে অভিবাসী পরিবারগুলো আইনগতভাবে পাওয়া সরকারি সুবিধা গ্রহণ করতেও ভয় পেতে পারে। এর ফলে মানুষ চিকিৎসা নিতে দেরি করতে পারে, জরুরি বিভাগগুলোর ওপর চাপ বাড়তে পারে এবং খাদ্য সহায়তা কমে গেলে সে সুবিধার ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় ব্যবসাগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অন্যদিকে মেয়র জোহরান মামদানির নেতৃত্বে নিউইয়র্ক সিটি ও অন্যান্য স্থানীয় সরকারের করা মামলায় বলা হয়েছে, নতুন নীতি কার্যকর হলে অভিবাসী ও মিশ্র-স্ট্যাটাসের পরিবারগুলো সরকারি সেবা থেকে সরে যেতে পারে। এর ফলে স্থানীয় সরকার ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। স্থানীয় সরকারগুলোর দাবি, ফেডারেল নীতির কারণে যে সামাজিক ও আর্থিক প্রভাব তৈরি হবে, তার বড় একটি অংশ শেষ পর্যন্ত স্থানীয় সরকার ও জনগণকেই বহন করতে হতে পারে।
দুই মামলায় সম্ভাব্য প্রভাবের ব্যাপকতার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী, নতুন নীতির কারণে প্রায় সাড়ে ৯ লাখ মানুষ সরকারি সহায়তা কর্মসূচি থেকে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করতে পারেন অথবা নতুন করে এসব কর্মসূচিতে নাম নাও লেখাতে পারেন।
বিশেষ করে মিশ্র-স্ট্যাটাসের পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে এ আশঙ্কা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এসব পরিবারে একজন সদস্য মার্কিন নাগরিক হলেও অন্য সদস্য অভিবাসী হতে পারেন। কোনো মার্কিন নাগরিক শিশু আইনগতভাবে মেডিকেইড, এসএনএপি বা অন্য কোনো সরকারি সুবিধার জন্য যোগ্য হলেও তার অভিবাসী বাবা-মা ভবিষ্যতের গ্রিনকার্ড আবেদনে সম্ভাব্য প্রভাবের আশঙ্কায় সে সুবিধা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলে মামলাকারী পক্ষগুলো আশঙ্কা করছে।
নিউইয়র্ক ইমিগ্রেশন কোয়ালিশনের প্রেসিডেন্ট ও সিইও মুরাদ আওয়াদেহ বলেন, কমিউনিটির সদস্যরা তাকে জানিয়েছেন, ভয়ের কারণে কিছু পরিবার যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া সন্তানদেরও সরকারি কর্মসূচি থেকে সরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছে। এতে পরিবারগুলোর সামনে সন্তানদের খাবার ও স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন মেটানো এবং নিজেদের অভিবাসন স্ট্যাটাস নিয়ে উদ্বেগ এ দুইয়ের মধ্যে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পাবলিক চার্জ নীতির উদ্দেশ্য হলো সরকারি সম্পদ রক্ষা করা এবং এমন একটি অভিবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যেখানে নতুন অভিবাসীরা নিজেদের আর্থিকভাবে সমর্থন করতে সক্ষম হন।নতুন নীতিটি ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে নেওয়া অনুরূপ একটি নীতির পুনরুজ্জীবন। সে নীতিও আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল এবং পরে বাইডেন প্রশাসনের সময় বাতিল করা হয়। নতুন নিয়মটি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের ওপর প্রযোজ্য নয়। এছাড়া অ্যাসাইলাম সিকার বা আশ্রয়প্রার্থীদের ক্ষেত্রেও এ পাবলিক চার্জ নিয়ম প্রযোজ্য নয় বলে জানানো হয়েছে।
নিউইয়র্ক সিটির মেয়রস অফিস অব ইমিগ্র্যান্ট অ্যাফেয়ার্স (এমওআইএ) অভিবাসীদের পরামর্শ দিয়েছে, নতুন নিয়ম নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও নিজের বা সন্তানের সরকারি সুবিধা হঠাৎ বন্ধ করার আগে একজন যোগ্য ইমিগ্রেশন আইনজীবী বা আইনি সহায়তা প্রদানকারীর সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত।
নিউইয়র্কে বিনামূল্যে ও গোপনীয় ইমিগ্রেশন আইনি সহায়তার জন্য নিউইয়র্ক সিটি মেয়র অফিসের ইমিগ্রেশন লিগ্যাল সাপোর্ট হটলাইন ১-৮০০-৩৫৪-০৩৬৫ নম্বরে ফোন করা যায়। এছাড়া ৩১১ নম্বরে ফোন করে ‘ইমিগ্রেশন লিগ্যাল’ বলেও সহায়তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর দায়ের করা এ দুই মামলা এখন ফেডারেল আদালতে বিচারাধীন। মামলাকারী স্টেট, সিটি ও কাউন্টিগুলো নতুন নীতি কার্যকর হওয়া ঠেকাতে আদালতের হস্তক্ষেপ চাইছে। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন নিয়ম আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর কার্যকর হওয়ার কথা। ফলে তার আগে আদালত কোনো অস্থায়ী আদেশ দেয় কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।