হাম্বল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর্স গার্ডেন
সাংহাই হংছিয়াও রেলস্টেশন। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছি ট্রেনের অপেক্ষায়। যাচ্ছি চীনের জিয়াংসু প্রদেশের প্রাচীন শহর সুজৌ। অনেকে বলেন, ‘পূর্বের ভেনিস’। কিন্তু সুজৌকে ভেনিসের সঙ্গে তুলনা করেও যেন পুরোপুরি বোঝানো যায় না। কারণ এ শহরের সৌন্দর্য শুধু খালে নয়, তার বাগানে, সেতুতে, সাদা দেওয়াল আর কালো ছাদের বাড়িতে, বাঁক নেওয়া সরুগলিতে এবং হাজার বছরের ইতিহাসে। কিন্তু ইতিহাসের চোখ দিয়ে দেখলে বোঝা যায়, এ শহরটি আসলে চীনের সভ্যতার একটি দীর্ঘ অধ্যায়। প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরোনো এ নগরীর ইতিহাস যুদ্ধ, রাজবংশের উত্থান-পতন, বাণিজ্য, নদী-খাল, শিল্প-সাহিত্য, বাগান এবং মানুষের সৌন্দর্র্যবোধ—সবকিছু এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে। ইউনেস্কোর নথি অনুযায়ী, ৫১৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে উ রাজ্যের রাজধানী হিসেবে সুজৌর প্রতিষ্ঠা হয়।
সুজৌর ধ্রুপদি বাগানগুলো বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতী পেয়েছে। ক্লাসিক্যাল গার্ডেনস অব সুজৌ (Classical Gardens of Suzhou) ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ লিস্টে (UNESCO World Heritage List) অন্তর্ভুক্ত হয়; পরে এর স্বীকৃতীর পরিধি সম্প্রসারিত হয়। বর্তমানে নয়টি বাগানকে এর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হিসেবে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়-যার মধ্যে Humble Administrator’s Garden, Lingering Garden, Lion Grove Garden Ges Master of Nets Garden উল্লেখযোগ্য।
সাংহাইয়ের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে দ্রুতগতির ট্রেন ছুটছিল, জানালার বাইরে বদলে যাচ্ছিল চীনের ভূদৃশ্য। কোথাও আধুনিক নগরীর সারি সারি ভবন, কোথাও সবুজ মাঠ, কোথাও ছোট ছোট গ্রাম। মনে হচ্ছিল, চীনের আরেকটি মুখের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি আমি। ট্রেন থামল সুজৌ নর্থ রেলস্টেশনে। আমার লোকাল গাইড এ প্ল্যাটফর্মেই অপেক্ষা করার কথা। ভাবছিলাম এতো বড় স্টেশনে একজন মানুষকে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। কিন্তু সে মুহূর্তে ফোনে একটা মেসেজ এলো—এ৭০০২, ৮ নম্বর কোচ, জানালার পাশে। আমি সবুজ স্কার্ফ পরে আছি। একটু খুঁজতেই পেয়ে গেলাম। প্ল্যাটফর্মে সবুজ স্কার্ফ পরা মেয়েটি হাত তুললো।
আসসালামু আলাইকুম, সে বললো—একটু লাজুক হেসে। আমি মা লিনা। আমার মুসলিম নাম মারিয়াম। তুমি যেটা সহজ মনে করো, সেটাই বলবে। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। চীনে, সুজৌ শহরে, একজন হিজাব পরা গাইড। অবশ্য পরে মনে পড়লো, আমি নিউইয়র্ক থেকেই ট্যরি কোম্পানিকে অনুরোধ করেছিলাম সম্ভব হলে আমাকে মুসলিম গাইড এবং হালাল খাবারের ব্যবস্থা করার জন্য। লিনা হাঁটতে হাঁটতে বললো, আমরা হুই সম্প্রদায়ের। চীনে মুসলমানরা আজকের নয়, ৬৫১ খ্রিস্টাব্দে খলিফা উসমান (রা.)-এর দূত থাং সম্রাটের দরবারে এসেছিলেন। সমুদ্রপথে, রেশমপথে, ব্যবসায়ীরা আসতো-যেতো, থেকে গেল, বিয়ে করলো। আমার পদবি ‘মা’-চীনা ভাষায় অর্থ ঘোড়া। কিন্তু আসল কথা হালা, ‘মুহাম্মদ’ নামটা চীনা উচ্চারণে ছোট হতে হতে ‘মা’ হয়ে গেছে। চীনের অর্ধেক মুসলমানের পদবি ‘মা’।
আর বাকি অর্ধেক?
তাদের পদবি সাধারণত হা, হু, সা, নাসির... সবই আরবি নাম ভেঙে তৈরি। সে হাসলো। আমরা টুকরো টুকরো নাম নিয়ে এক হাজার বছর বেঁচে আছি। আমাদের প্রথম গন্তব্য-হাম্বল অ্যাডমিনিস্ট্রেটরস গার্ডেন। চীনা নাম চুও চেং ইউয়ান। গেট দিয়ে ঢুকতেই শহরের শব্দ যেন কেউ কমিয়ে দিল। সাদা দেওয়াল, কালো টালির ছাদ, আর তার মাঝখানে বিরাট এক পুকুর—পদ্মপাতায় ঢাকা। ১৫০৯ সাল, লিনা বললো, একটা পাথরের সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে। মিং রাজবংশে ওয়াং সিয়েন ছেন নামে এক সরকারি পরিদর্শক ছিলেন সম্রাটের হয়ে দুর্নীতি ধরতেন। ধরতে ধরতে একদিন নিজেই চাকরি হারালেন। রাজধানী ছেড়ে সুজৌতে ফিরে এসে এ বাগান বানালেন।
আর নামটা?
নামটাই সবচেয়ে মজার। পান ইউয়ে নামে এক প্রাচীন কবি লিখেছিলেন, ‘বাগানে জল দেওয়া আর শাকসবজি ফলানো, এটাও তো একরকম রাজ্য চালানো, অপটু মানুষের রাজ্য চালানো।’ ওয়াং সাহেব সেই লাইনটা নিয়ে নিজের বাগানের নাম দিলেন ‘অপটু শাসকের বাগান’। সে আমার দিকে তাকালো। বুঝলে? পুরো নামটাই একটা অভিমান। চাকরি গেছে, তাই বলছেন, ঠিক আছে, আমি তো অপটুই, আমি বরং ফুলগাছেই রাজত্ব করি। আমরা একটা কাঠের বারান্দা ধরে হাঁটছিলাম। জানালাগুলো গোল, পাতার আকৃতীর, ফুলদানির আকৃতীর—প্রতিটা জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে একটা আলাদা ছবি। এগুলোকে বলে, চিয়ে চিং, ‘ধার করা দৃশ্য’, লিনা বললো। চীনা বাগানের নিয়ম হলো, তুমি কখনো পুরোটা একসঙ্গে দেখতে পাবে না। প্রতিটা মোড়ে একটা নতুন দৃশ্য লুকানো থাকবে। তারপর চুপ করে থেকে যোগ করলো আর একটা গল্প আছে। কথিত আছে, ওয়াং সাহেবের ছেলে জুয়া খেলতেন। এই পুরো বাগানটা তিনি নাকি এক রাতে জুয়ায় হেরে যান।
—এক রাতে! হ্যাঁ। সে পুকুরের দিকে তাকালো। সুজৌর সব সুন্দর জিনিসের পেছনে একটা করে দুঃখের গল্প আছে। রেশম, বাগান, গান—সব। লীনা বললো, সুজৌর ধ্রুপদি বাগানগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে বিখ্যাত। সুজৌর Classical Gardens-এর ঐতিহ্য ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত।
লিনা ধীরে ধীরে হাঁটছিল। জানো, চীনা বাগান শুধু গাছপালা সাজিয়ে তৈরি করা হয় না। তাহলে? এখানে প্রকৃতীকে ছোট করে মানুষের নিয়ন্ত্রণে আনা হয় না। বরং প্রকৃতীর সঙ্গে মানুষের একটা সংলাপ তৈরি করা হয়। আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। তোমাদের বাগানও তাহলে একটা দর্শন? লিনা আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলো। বাগান থেকে বেরিয়ে পাশেই সুজৌ মিউজিয়াম। সাদা দেওয়াল, কালো রেখা, জ্যামিতিক ছাদ—পুরোনো সুজৌর ভাষায় লেখা একদম আধুনিক এক ভবন।
স্থপতি আইএম পেই, লিনা বললো। যিনি প্যারিসের লুভ্র মিউজিয়ামের কাচের পিরামিড বানিয়েছিলেন। তার পূর্বপুরুষ সুজৌর মানুষ। ছোটবেলায় গরমের ছুটি কাটাতেন এ শহরেই। নব্বই বছর বয়সে তিনি এই মিউজিয়ামটা ডিজাইন করেন—বলতেন, এটা তার ছোট মেয়ে। দুপুরে লিনা আমাকে নিয়ে গেল পুরোনো শহরের ভেতরের এক সরু গলিতে। সেখানে সুজৌর মসজিদ-বাইরে থেকে দেখলে চীনা মন্দির মনে হয়, ভেতরে মিহরাব। চীনের পুরোনো মসজিদগুলো এমনই, সে বলল জুতা খুলতে খুলতে। গম্বুজ নেই, চীনা ছাদ। আমাদের পূর্বপুরুষরা যা পেয়েছিলেন তাই দিয়ে বানিয়েছিলেন। নামাজের পর কাছেই একটা ছোট রেস্তোরাঁ—সবুজ বোর্ডে আরবি হরফে ‘হালাল’, চীনা ভাষায় ছিং চেন, যার অর্থ ‘শুদ্ধ ও সত্য’।
এ দুটো অক্ষর মনে রাখবে, লিনা বললো। চীনের যেকোনো শহরে এ দুটো অক্ষর দেখলেই নিশ্চিন্ত। আর সবচেয়ে সহজ হলো লানচৌ বিফ নুডল—পুরো চীনজুড়ে এ দোকানগুলো প্রায় সবই আমাদের মানুষের চালানো। গরম ঝোলে হাতে টানা নুডল, গরুর মাংস, ধনেপাতা, একটু ঝাল তেল। সঙ্গে শিনচিয়াংয়ের কাবাব—জিরা আর মরিচ মাখানো ভেড়ার মাংস। খেতে খেতে আমি বললাম, তুমি গাইড হলে কী করে? আমি ইতিহাস পড়েছি। নানচিং বিশ্ববিদ্যালয়ে। সে চপস্টিক নামিয়ে রাখলো। চাকরি পাইনি। তারপর ভাবলাম, ইতিহাস যদি কেউ চাকরি হিসেবে না নেয়, তাহলে গল্প হিসেবে বলি। ভালো করেছো। কেন? কারণ তুমি যেভাবে বল তাতে মনে হয় ওয়াং সাহেবকে তুমি চিনতে। সে হেসে ফেললো আর হাসিটা এতক্ষণের গাইডের হাসি ছিল না।
বিকালে পিংচিয়াং রোড। একদিকে খাল, একদিকে দোকান, মাঝখানে পাথরের রাস্তা। খালের ওপর ছোট ছোট কুঁজো সেতু, নিচে কালো নৌকা। এ রাস্তাটা ৮০০ বছর ধরে ঠিক এখানেই আছে, লিনা বললো। ১২২৯ সালে সুং রাজবংশের আমলে একটা পাথরের ফলকে সুজৌ শহরের মানচিত্র খোদাই করা হয়েছিল, ‘পিংচিয়াং মানচিত্র’। সে ফলকটা আজও আছে। তুমি ওটা হাতে নিয়ে আজকের সুজৌতে হাঁটতে পারবে—রাস্তা মিলে যাবে, খাল মিলে যাবে, সেতু মিলে যাবে।
৮০০ বছরে কিছু বদলায়নি?
শহরটা আরো পুরোনো। খ্রিস্টপূর্ব ৫১৪ সালে উ রাজ্যের মন্ত্রী উ চি সু এ শহরের নকশা করেছিলেন। আড়াই হাজার বছর ধরে সুজৌ এক ইঞ্চিও সরেনি। পৃথিবীতে এমন শহর খুব কম। আমরা একটা চায়ের দোকানে বসলাম, খালের ধারে। ভেতরে দুজন শিল্পী-একজনের হাতে পিপা, একজনের হাতে সানসিয়েন। গান শুরু হলো, খুব নরম, প্রায় ফিসফিস করে। এটা, পিংথান, লিনা চাপা গলায় বললো। সুজৌর নিজস্ব ভাষায় গল্প-গান। ৪০০ বছরের পুরোনো। একটা গল্প বলতে কখনো তিন মাস লেগে যেতো—রোজ সন্ধ্যায় একটু একটু করে।
—কী বলছে ওরা? প্রেমের গান। সে চায়ের কাপ ঘোরাচ্ছিল। এখানে প্রায় সব গানই প্রেমের। আর প্রায় সব প্রেমই বিফল। কেন? কারণ সুজৌর লোকেরা বিশ্বাস করত, সুখী প্রেম নিয়ে গান হয় না। গান হয় সেই প্রেম নিয়ে, যেটা শেষ হয়নি। আমি কিছু বললাম না। বাইরে সন্ধ্যা নামছিল, খালের জলে লাল লণ্ঠনের ছায়া কাঁপছিল। রাতে শানথাং স্ট্রিট—খালের দুপাশে ৭০০ মিটার লাল লণ্ঠন, জলে প্রতিফলন। এ খালটা কবি পাই চু-ই কাটিয়েছিলেন, লিনা বললো। ৮২৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি সুজৌর গভর্নর ছিলেন। মাত্র এক বছরের একটু বেশি। সেই এক বছরে তিনি এই খাল কাটালেন যাতে মানুষ সহজে টাইগার হিলে যেতে পারে। বারোশো বছর হয়ে গেছে। তার কবিতা কজন পড়ে জানি না, কিন্তু তার খাল দিয়ে এখনো নৌকা চলে।
দ্বিতীয় দিন
ভোর—তিন হাজার তলোয়ারের পাহাড়। সকাল ৭টায় টাইগার হিল-হু-ছিউ)। এতো সকালে ভিড় নেই, ঘাসে শিশির, বাঁশবনে কুয়াশা। লিনা আজ অন্য রঙের স্কার্ফ পরেছে—হালকা নীল। কবি সু শি লিখেছিলেন, সুজৌ এসে টাইগার হিল না দেখা আজীবনের আফসোস। তাই চলো। পাহাড়ের গায়ে একটা গভীর পাথুরে ফাটল, নিচে সবুজ জল। নাম—তলোয়ার-কুন্ড। খ্রিস্টপূর্ব ৪৯৬ সাল, লিনা বললো। উ রাজ্যের রাজা হো-লুই যুদ্ধে আহত হয়ে মারা যান। তার ছেলে তাকে এখানে কবর দেন, সঙ্গে তিন হাজার তলোয়ার। কথিত আছে, কবর দেওয়ার তিনদিন পর একটা সাদা বাঘ এসে পাহাড়ের ওপর বসে থাকে। সেই থেকে নাম বাঘ-পাহাড়। তলোয়ারগুলো কি সত্যি আছে। কেউ জানে না। ১৯৫০-এর দশকে জল সরিয়ে খোঁড়া শুরু হয়েছিল। নিচে একটা পাথরের দরজা পাওয়া গেছে, মনে করা হয় ওটাই কবরের মুখ। সে থামলো। কিন্তু খোঁড়া বন্ধ করে দেওয়া হয়। কারণ ওপরে পাহাড়ের চূড়ায় যে প্যাগোডাটা আছে, ওটা ধসে পড়ার ভয় ছিল। চূড়ায় উঠে দেখি সেই প্যাগোডা—সাততলা ইটের টাওয়ার, স্পষ্টতই হেলে আছে। ৯৫৯ থেকে ৯৬১ খ্রিস্টাব্দে তৈরি। ইতালির পিসার টাওয়ারের চেয়েও চারশো বছরের পুরোনো। প্রায় তিন ডিগ্রি হেলে আছে, ওপরের অংশ দুই মিটারেরও বেশি সরে গেছে।
পড়ে যাবে না তো? আশি বছর ধরে ইঞ্জিনিয়াররা এটা আটকে রাখছেন। নিচে সিমেন্ট ঢালা হয়েছে, পাথরের বেড়ি দেওয়া হয়েছে। সে ওপরের দিকে তাকিয়ে চোখ কুঁচকাল। হাজার বছর ধরে পড়বো পড়বো করছে, কিন্তু পড়ছে না। আমি এই টাওয়ারটাকে খুব পছন্দ করি। কেন? কারণ এটা প্রমাণ করে, হেলে পড়া মানেই শেষ হয়ে যাওয়া নয়। আমি ওর দিকে তাকালাম। সে সঙ্গে সঙ্গে হেসে বললো, এটা গাইডের বই থেকে বলা লাইন না। এটা আমার নিজের। দুপুর—পাথরের গোলকধাঁধা নাশতা হয়েছিল একটা হালাল দোকানে ভাঁপে সেদ্ধ গরুর মাংসের পুরভরা বাওচি আর দুধ-চা। দুপুরে গেলাম লায়ন গ্রোভ গার্ডেন। পুরো বাগানজুড়ে অদ্ভুত আকৃতীর পাথর—ফুটো, বাঁকা, একটার ওপর আরেকটা, গুহা আর সিঁড়ি মিলিয়ে এক বিরাট গোলকধাঁধা। ১৩৪২ সাল, ইউয়ান রাজবংশ, লিনা বললো। থিয়েন জু ওয়েই চে নামে এক চান (জেন) সন্ন্যাসী তার গুরুর স্মরণে এটা বানান। গুরু থাকতেন থিয়েনমু পাহাড়ে, যেখানে পাথরগুলো দেখতে সিংহের মতো। তাই শিষ্য সুজৌতে পাথর এনে সিংহের বন বানালেন।
আর এ গোলকধাঁধা? চান দর্শন। পথ হারানোটাই পথ। সে আগে আগে ঢুকে পড়লো একটা পাথরের গুহায়। চলো, হারিয়ে যাই। আমরা সত্যিই হারালাম। তিনবার একই জায়গায় ফিরে এলাম। একবার দুটো পাথরের মাঝখানে এত সরু জায়গায় পড়লাম যে পাশ কাটাতে গিয়ে দুজনের কাঁধ ঠেকে গেল। সে চট করে সরে গিয়ে বললো, দুঃখিত। কিন্তু কান দুটো লাল হয়ে গিয়েছিল। বেরিয়ে এসে সে বললো, একটা কথা বলি। এই বাগানটা ১৯১৭ সালে পেই পরিবার কিনেছিল সেই আইএম পেইয়ের পরিবার। তিনি ছোটবেলায় এ পাথরের ভেতরে লুকোচুরি খেলতেন। পরে বলেছিলেন, স্থপতি হিসেবে তিনি আলো আর ছায়া নিয়ে যা কিছু জানেন, সব এ বাগানে শিখেছেন।
আর সম্রাট ছিয়ানলুং?
তুমি পড়াশোনা করে এসেছো দেখছি! সে হাসলো। ছিয়ানলুং ছয়বার এখানে এসেছিলেন। এতো পছন্দ হয়েছিল যে বেইজিংয়ের কাছে আর ছেংদেতে এর নকল বানিয়েছিলেন। কিন্তু নকল কখনো আসলের মতো হয় না। বিকালে গেলাম সুজৌ সিল্ক মিউজিয়াম। কাচের বাক্সে জীবন্ত রেশমপোকা, তুঁতপাতা, গুটি। পাশের ঘরে হাতে চালানো বিশাল কাঠের তাঁত। সুজৌ ৪ হাজার বছর ধরে রেশম বুনছে, লিনা বললো। মিং আর ছিং আমলে এখানে সম্রাটের নিজস্ব রেশম-দফতর ছিল। রাজদরবারের সব পোশাক এখান থেকে যেত। সে একটা কাচের বাক্সের সামনে দাঁড়ালো। ভেতরে সুঁইয়ের সুতোয় বোনা একটা বিড়ালের ছবি—এতো সূক্ষ্ম যে লোম গোনা যায়। সুজৌ এমব্রয়ডারি। একটা সুতোকে ভাগ করে ৪৮ ভাগ পর্যন্ত করা হয়। চুলের চেয়ে সরু। এরকম একটা ছবি বানাতে একজন শিল্পীর দুই বছর লাগে। দুই বছর একটা বিড়ালের জন্য? এ শহরের চরিত্রই তাই। সে আমার দিকে ঘুরলো। সুজৌ তাড়াহুড়ো জানে না। বাগান বানাতে ৩০ বছর, একটা গান শেষ করতে তিন মাস, একটা সুতো বুনতে দুই বছর। একটু থেমে যোগ করল, আর দুদিনে এ শহর দেখা একেবারেই অসম্ভব। তাহলে আমি কী দেখলাম? তুমি শহরটা দেখোনি। তুমি একটা জানালা দিয়ে তাকিয়েছো।
সন্ধ্যা—স্টেশন
সন্ধ্যায় চিনচি লেক। আকাশ কমলা, জলের ওপারে আধুনিক সুজৌ-কাচ আর ইস্পাত, ফেরিস হুইলে আলো জ্বলছে। দুদিনে আড়াই হাজার বছর পেরিয়ে আমরা আবার আজকের দিনে এসে দাঁড়ালাম। ওইদিকে পুরোনো শহর, লিনা আঙুল তুললো। এদিকে নতুন। মাঝখানে ১০ কিলোমিটার আর দুই হাজার বছর। তুমি কোন দিকে থাকো? পুরোনো দিকে। ছোট ঘর। কিন্তু জানালা দিয়ে খাল দেখা যায়। স্টেশনে ফেরার ট্যাক্সিতে আমরা দুজনেই চুপ। তারপর সে ব্যাগ থেকে ছোট একটা কাগজের প্যাকেট বের করলো।
এটা রাখো। খুলে দেখি একটা রুমাল-সাইজ রেশমের কাপড়। কোণায় সুঁইয়ের কাজে ছোট্ট একটা সেতু, নিচে জল। পিংচিয়াং রোডের সেতু, সে বললো। কাল রাতে যেটার নিচ দিয়ে আমরা গিয়েছিলাম। কখন বানালে? বানাইনি। কিনেছি। সে হেসে ফেললো। দুই বছর সময় ছিল না আমার হাতে।
প্ল্যাটফর্মে ট্রেন দাঁড়িয়ে। সাংহাই, পঁচিশ মিনিট। মারিয়াম, আমি বললাম। সে চোখ তুললো। দুদিনে এই প্রথম ওর মুসলিম নামটা ডাকলাম। সে কোন উত্তর দিলো না। ঘোষণা হলো, দরজা বন্ধ হবে। এবার অস্ফুট কণ্ঠে লিনা শুধু বললো, ভালো থেকো।
দরজা বন্ধ হলো। ট্রেন ছাড়লো। জানালা দিয়ে দেখলাম, নীল স্কার্ফটা প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে, ছোট হতে হতে মিলিয়ে গেল। গাড়ি যখন সাংহাইয়ের দিকে ছুটছিল, জানালার বাইরে ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছিল দৃশ্যপট। পেছনে পড়ে রইলো খালের শহর। সাদা দেওয়াল। কালো ছাদ। পাথরের সেতু। লাল লণ্ঠনের আলো। আর একজন বন্ধু। আমার হাতের মুঠোয় রেশমের সেতুটা তখনো গরম। পঁচিশ মিনিট পরে সাংহাই। আড়াই হাজার বছর পেছনে।