সেমিনারে অতিথিরা
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান দেশের জন্য একই সঙ্গে বড় কূটনৈতিক-প্রতিরক্ষা সুযোগ এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বয়ে আনবে বলে মনে করেন নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষকরা। তবে তাড়াহুড়ো করে চুক্তিতে সই না করে শর্তসাপেক্ষে এবং ধাপে ধাপে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তিতে এগোনোর পরামর্শ দিয়েছেন তারা। বক্তারা এ-ও মনে করিয়ে দেন যে, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিতে যোগদানের কোনো আমন্ত্রণ পায়নি।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ (বিডস) আয়োজিত এক ওয়েবিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। গবেষক মাহবুব ভূঁইয়ার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন—বিডসের নির্বাহী পরিচালক ড. মোহাম্মদ ইমরান হোসাইন আনসারী। প্যানেলিস্ট হিসেবে বক্তব্য রাখেন মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর, প্রতিরক্ষা শিল্প বিশেষজ্ঞ সাবিনা আহমেদ এবং কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. হারুন অর রশিদ। ওয়েবিনারে ঢাকা, ওয়াশিংটন, নিউইয়র্ক, ইস্তাম্বুলসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শক-শ্রোতারা যুক্ত হন এবং প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নেন।
স্বাগত বক্তব্যে ড. ইমরান হোসাইন আনসারী বলেন, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি বিশ্ব ব্যবস্থাকে একমেরু থেকে বহুমেরুর দিকে এগিয়ে নেওয়ার একটি বড় ইঙ্গিত। তিনি বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী ইতিমধ্যে এ চুক্তিতে সম্পৃক্ততাকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন এবং সংসদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশ নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কবর রচনা করেছে। এ বিষয়টি তিনটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি-প্রথমত, এটি বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ, বিশেষত পশ্চিমে উগ্র হিন্দুত্ববাদ ও পূর্বে আরাকান বিচ্ছিন্নতাবাদী উগ্রবাদের প্রেক্ষাপটে; দ্বিতীয়ত, এতে ভারত ও মিয়ানমারের পক্ষ থেকে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যা ইতিমধ্যে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সতর্ক প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট; তৃতীয়ত, বাংলাদেশ এ চুক্তিতে পূর্ণ সদস্যপদ, প্রতিরক্ষা শিল্প অংশীদারত্ব, নাকি নিছক কূটনৈতিক সংহতির মাধ্যমে সম্পৃক্ত হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর বলেন, বাংলাদেশের মানুষের এ চুক্তির প্রতি উৎসাহের মূল কারণ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের আচরণে দেশের সার্বভৌম স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার উপলব্ধি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের একমাত্র মুসলিম রাষ্ট্র যার কোনো মুসলিম প্রতিবেশী নেই, এ ভৌগোলিক বাস্তবতা দেশের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সাম্প্রতিক ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তোলার তাগিদ তৈরি করেছে বলে তিনি মনে করেন। যোগদান করলে যৌথ প্রতিরক্ষা উৎপাদন, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও যৌথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বাংলাদেশ উপকৃত হবে বলে জানান তিনি, বিশেষত ইন্টারঅপারেবিলিটি ও অস্ত্র সরবরাহ শৃঙ্খলের ক্ষেত্রে। তবে তিনি বলেন, ধর্মীয় বিভাজনের ইতিহাসের কারণে মুসলিম বিশ্বের এ ধরনের উদ্যোগ আগে বাস্তবায়িত হয়নি, তাই চুক্তির স্থায়িত্ব নিয়ে এখনই নিশ্চিত হওয়া তাড়াহুড়ো হবে।
ড. হারুন অর রশিদ বলেন, সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ-দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ, একটি অন্যটির চেয়ে বড় নয়। তিনি বলেন, মক্কা চুক্তি মূলত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক একটি সমস্যার সমাধান হিসেবে জন্ম নিয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার নয়। বাংলাদেশ এতে যুক্ত হলে সেই জটিলতাও নিজের কাঁধে নিয়ে আসবে। তিনি এক্ষেত্রে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রকে মূল দুই অ্যাক্টর হিসেবে চিহ্নিত করে বলেন, বাংলাদেশ যুক্ত হলে ভারতকে তার সীমান্ত নিরাপত্তা নতুন করে সাজাতে হবে, আর যুক্তরাষ্ট্রকে ভাবতে হবে বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে তার নিজস্ব স্বার্থ এবং পাকিস্তান-চীন সম্পর্কের প্রেক্ষাপট নিয়ে। সিদ্ধান্তহীনতার ঝুঁকি তুলে ধরতে তিনি একটি উপমা দেন-হুট করে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান না করে মিশরের মতো বিষয়টি সাময়িকভাবে মুলতবি রাখাই বাংলাদেশের জন্য বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে।
সাবিনা আহমেদ স্পষ্ট করে বলেন, বাংলাদেশ মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগদানের কোনো আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ এখনো পায়নি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান নিজেই সংসদে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সৌদি আরব থেকে যে আমন্ত্রণ এসেছে তা তারেক রহমানের দ্বিপাক্ষিক সফরের জন্য, চুক্তিতে যোগদানের জন্য নয়। তিনি বলেন, চুক্তির পূর্ণাঙ্গ কাঠামো এখনো প্রকাশিত হয়নি-৭ আগস্টের যৌথ ঘোষণা ছাড়া নির্দিষ্ট ব্যবস্থা, ভৌগোলিক সীমা বা সাড়া দেওয়ার বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি। ন্যাটোর সঙ্গে তুলনা টেনে তিনি বলেন, ন্যাটোর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরাও শুরুতে বিভিন্ন শর্ত দিয়েছিল, যা পরে পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়েছে, তাই বাংলাদেশও এখন নিজের শর্ত ঠিক করে নিতে পারে। তিনি মনে করেন, যৌথ প্রতিরক্ষা উৎপাদন, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও প্রশিক্ষণের মতো সুবিধা দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমেও অর্জন করা সম্ভব, তাই তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
প্রশ্নোত্তর পর্ব
চীনের সঙ্গে সম্পর্কে প্রভাব নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ড. হারুন অর রশিদ ও সাবিনা আহমেদ উভয়েই বলেন, চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের যোগদানে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার আশঙ্কা কম, যদিও অস্ত্র সংগ্রহ তুরস্কমুখী হলে চীনের কিছুটা উদ্বেগ থাকতে পারে। জেনারেল আকবর বলেন, চীনের বৈশ্বিক দক্ষিণকেন্দ্রিক উদ্যোগগুলোর সঙ্গে সংগতি থাকায় বেইজিং বরং এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের সঙ্গে সম্ভাব্য দ্বন্দ্ব নিয়ে প্রশ্নের জবাবে জেনারেল আকবর বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাৎক্ষণিকভাবে চুক্তিকে স্বাগত জানালেও তা মূলত জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খল ও নির্বাচনী রাজনীতি সংশ্লিষ্ট কৌশলগত কারণে। ভবিষ্যতে চুক্তির পরিধি বাড়লে তা ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে বলে মত দেন তিনি।
ভারতের সম্ভাব্য সামরিক আগ্রাসনের আশঙ্কা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে জেনারেল আকবর বলেন, এ ধরনের আশঙ্কা অমূলক। তিনি বলেন, বাংলাদেশ চুক্তিতে যোগ না দিলেও সীমান্তে নানা ধরনের চাপ অব্যাহত রয়েছে, তাই মূল সমস্যা চুক্তিতে যোগদান নয়, বরং জাতীয় ঐক্যের ঘাটতি। জাতীয় ঐক্য না থাকলে যেকোনো বহিঃচাপ মোকাবিলা কঠিন হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মিয়ানমার সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে জেনারেল আকবর বলেন, গত তিন দশকে মিয়ানমারের তুলনায় বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতার ব্যবধান কমে এসেছে, বিশেষত বিমান বাহিনীর ক্ষেত্রে। তিনি রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ভারতের ভূমিকাহীনতা এবং চীনের প্রতিশ্রুতি অপূর্ণ থাকার সমালোচনা করে বলেন, বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে বঙ্গোপসাগরে প্রবেশাধিকারের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যু যুক্ত হতে পারে।
সৌদি আরবসহ মক্কা চুক্তিভুক্ত দেশগুলোর নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে সাবিনা আহমেদ পাকিস্তান-সৌদি সম্পর্কের উদাহরণ টেনে বলেন, পাকিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতা সত্ত্বেও সৌদি আরব ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে, এ দুই সম্পর্ক পরস্পরবিরোধী নয়। তবে তিনি বলেন, চুক্তিতে যোগদানের আগে সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের নিজস্ব দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও আলোচনা এগিয়ে নেওয়া জরুরি।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা উদ্বেগ প্রসঙ্গে একটি প্রশ্নের ব্যাখ্যা দিয়ে জেনারেল আকবর বলেন, তিনি সামরিক নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন। বাংলাদেশ সুশাসনের মাধ্যমে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন করলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো দিল্লির পরিবর্তে ঢাকার দিকে ঝুঁকতে পারে, এটিই ভারতের প্রকৃত উদ্বেগের কারণ বলে মনে করেন তিনি।
আলোচনার শেষে বক্তারা একমত হন যে, মক্কা চুক্তি নিয়ে সিদ্ধান্ত যা-ই হোক না কেন, তা হতে হবে জাতীয় স্বার্থ, দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা এবং কৌশলগত স্বকীয়তা রক্ষা করে। তাড়াহুড়ো নয়, বরং সুচিন্তিত ঝুঁকি বিশ্লেষণের ভিত্তিতে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ (বিডস) যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান।