সাবেক গণভবন
বাংলাদেশের স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক লড়াইয়ের রক্তভেজা স্মারক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’। ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানে দীর্ঘ ১৫ বছরের শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটার পর তাঁর সরকারি বাসভবন ‘গণভবন’-কে এবার জনগণের স্মৃতিপীঠে রূপান্তর করা হয়েছে। ৬ আগস্ট ২০২৬ থেকে জাদুঘরটি সাধারণ মানুষের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করা হচ্ছে।
রাজধানী ঢাকার শেরে বাংলা নগরে, জাতীয় সংসদ ভবনের উত্তর দিকে এর মোড়ে অবস্থিত সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ‘গণভবন’। জাতীয় সংসদ ভবন থেকে মাত্র ৫ মিনিটের হাঁটার দূরত্বে এটি অবস্থিত। এখন থেকে এই সুবিশাল চত্বরটিই ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ নামে পরিচিত পাবে।
টিকেট মূল্য: বড়দের জন্য ৫০ টাকা এবং ছোটদের জন্য ২৫ টাকা। টিকেট অনলাইনে সংগ্রহের ব্যবস্থা রয়েছে।
গণভবন থেকে জাদুঘর
যেভাবে এল এই রূপান্তর ১৯৭৩ সালে নির্মাণকাজ শুরুর পর ১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত গণভবন দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। শেখ হাসিনা ১৯৯৬ ২০০১ এবং ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত এই প্রাসাদটিকে তাঁর সরকারি বাসভবন হিসেবে ব্যবহার করেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে গেলে সর্বস্তরের ক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা গণভবনে প্রবেশ করে। এর পরপরই ছাত্র-জনতা ও তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, যে ভবনে বসে নিপীড়নের নীল নকশা করা হতো, সেটিকে গণমানুষের বিজয়ের প্রতীকে রূপান্তর করতে হবে। ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে গণভবনকে জাদুঘরে পরিণত করার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উদ্যোগ তথা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে এই জাদুঘরের মূল পরিকল্পনা ও স্থাপত্য নকশা চূড়ান্ত করা হয়। পরবর্তীতে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে দেশের বিশিষ্ট আর্কিটেক্ট, গবেষক ও সংস্কৃতিজনদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করে এর নির্মাণকাজ ত্বরান্বিত করা হয়। রাজনৈতিক সংস্কার ও পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের হাতে রূপান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার ধারাবাহিকতায় শেখ হাসিনার পতনের ২য় বর্ষপূর্তিতে জাদুঘরটির আনুষ্ঠানিক শুভ উদ্বোধন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
জাদুঘরে যা যা থাকছে
ক্ষমতার দম্ভের বিপরীতে সাধারণ মানুষের ত্যাগের দলিল তুলে ধরাই এই জাদুঘরের মূল লক্ষ্য। জাদুঘরটিতে যেসব গুরুত্বপূর্ণ স্মারক ও গ্যালারি সংরক্ষণ করা হয়েছে।
শহীদ ও জুলাই যোদ্ধাদের স্মৃতি
আবু সাঈদ, মীর মুগ্ধ, গোলাম নাফিজসহ আন্দোলন ও অভ্যুত্থানে শহীদদের ব্যবহৃত পোশাক, চশমা, ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ও স্মারক।
দমন-পীড়নের ইতিহাস ও ‘আয়নাঘর’: গত ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসন, গুম, নির্যাতন এবং গোপন বন্দীশালা ‘আয়নাঘরের’ রেপ্লিকা, যা দর্শণার্থীদের অতীতের নিষ্ঠুর বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দেবে।
৫ আগস্টের ঐতিহাসিক মুহূর্ত
অভ্যুত্থানের দিন গণভবনের ভেতরের ধ্বংসাবশেষ ও দেওয়াল লিখন (গ্রাফিতি) যেমন ছিল, সেটির বেশ কিছু অংশ অবিকল সংরক্ষণ করা হয়েছে। আন্দোলনের দলিলপত্র: গণঅভ্যুত্থানের ভিডিও চিত্র, অডিও সাক্ষ্য, আলোকচিত্র, রক্তভেজা ব্যানার, প্ল্যাকার্ড ও প্রামাণ্যচিত্র। জনগণের টাকায় নির্মিত ‘জনগণের ভবন’ অবশেষে তার প্রকৃত মালিক অর্থাৎ সাধারণ মানুষের কাছে ফিরে এসেছে এক ঐতিহাসিক স্মৃতির মিনার হয়ে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করবেন বলে জানিয়েছেন সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধনের দিন বিশেষ অতিথি ও শহীদ পরিবারের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। ৬ আগস্ট বৃহস্পতিবার থেকে সাধারণ জনগণের জন্য এটা উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে বলে জানান মন্ত্রী।
৪ আগস্ট মঙ্গলবার সচিবালয়ে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব তথ্য জানান।
সংস্কৃতি মন্ত্রী বলেন, সকাল ৯ টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর-এর ফলক উন্মোচন করে জাদুঘরটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন।
উদ্বোধন শেষে তিনি জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারি ও প্রদর্শনী পরিদর্শন করবেন এবং সংরক্ষিত নিদর্শন, আলোকচিত্র, দলিলপত্র ও স্মারকসমূহ পরিদর্শনের মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস সম্পর্কে অবহিত হবেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক জুলাই গণঅভ্যুত্থান এর গৌরবময় স্মৃতি সংরক্ষণ, সংগ্রামের প্রকৃত ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং শহিদ ও জুলাই যোদ্ধাদের আত্মত্যাগের স্মারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বীরত্বগাথা ও আত্মত্যাগের স্মৃতিচারণ করে জুলাই যোদ্ধা এবং জুলাই শহিদ পরিবারের সদস্যগণ বক্তব্য প্রদান করবেন।
এছাড়াও অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহ, গণমানুষের অংশগ্রহণ এবং বিজয়ের ইতিহাস ভিত্তিক একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হবে বলে জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্বে দেশের বিশিষ্ট শিল্পীদের অংশগ্রহণে দেশাত্মবোধক গান, আবৃত্তি ও পরিবেশনার মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা, দেশপ্রেম এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ তুলে ধরা হবে।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক উপস্থিত সকল অতিথি, জুলাই যোদ্ধা, শহিদ পরিবারের সদস্য, আমন্ত্রিত অতিথি, গণমাধ্যমকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করবেন।
অনুষ্ঠানে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধিবৃন্দ, কূটনীতিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, সংস্কৃতিজন, জুলাই যোদ্ধা, জুলাই শহিদ পরিবারের সদস্য, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, গণমাধ্যমকর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থাকবেন।
মন্ত্রী আরো জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধনের দিন বিশেষ অতিথি ও শহীদ পরিবারের জন্য সংরক্ষিত থাকবে।