ভিসা
২১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে ৩১ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত ঢাকাস্থ যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস থেকে বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী বা বাংলাদেশকে চার্জেবিলিটি হিসেবে বিবেচনা করা আবেদনকারীদের জন্য কোনো অভিবাসী ভিসা ইস্যু হয়নি। এমন পরিস্থিতির অভিযোগকে ঘিরে হাজারো বাংলাদেশি পরিবারের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ ছয় মাসের এই স্থবিরতার সময় পরিবারভিত্তিক অভিবাসী ভিসার অপেক্ষমাণ আবেদনকারীরা অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি আমেরিকান কমিউনিটির প্রভাবশালী সংগঠন ও নেতাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ভুক্তভোগী আবেদনকারীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে চলা এই সংকটের সময় কমিউনিটির বড় সংগঠন ও নেতাদের পক্ষ থেকে মার্কিন প্রশাসনের কাছে দৃশ্যমান কোনো সমন্বিত উদ্যোগ দেখা যায়নি। অথচ একই সময়ে কমিউনিটির অনেক নেতা যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতে কংগ্রেস সদস্য ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।
৫৪.৮ শতাংশের পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন, গবেষণার পদ্ধতি ও তথ্যের উৎস ঘিরে বিতর্ক। ভারত নেই কেন?
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির পক্ষে বাংলাদেশি অভিবাসীদের নিয়ে পাবলিক চার্জ বা সরকারি সুবিধা গ্রহণের বিষয়টি তুলে ধরতে ৫৪.৮ শতাংশের একটি পরিসংখ্যান ব্যবহার করা হয়। তবে এই তথ্য কোনো মার্কিন সরকারি সংস্থা, যেমন স্টেট ডিপার্টমেন্ট, ইউএসসিআইএস বা ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির আনুষ্ঠানিক ভিসা পরিসংখ্যান নয় বলে সমালোচকরা উল্লেখ করেছেন। তাদের দাবি, এই তথ্য একটি বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ইমিগ্রেশন স্টাডিজসহ তৃতীয় পক্ষের গবেষণার ওপর ভিত্তি করে উপস্থাপন করা হয়েছে।
অনেকে এই গবেষণার পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের অভিযোগ, গবেষণায় কোন দেশকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং কোন দেশকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তা ফলাফলের ব্যাখ্যায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তারা উল্লেখ করেন, তালিকায় ভারতের মতো বড় অভিবাসী জনগোষ্ঠীর দেশ অন্তর্ভুক্ত না থাকায় গবেষণার তুলনামূলক কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, যদি বিভিন্ন দেশের অভিবাসীদের সরকারি সুবিধা ব্যবহারের হার তুলনা করা হয়, তাহলে সব বড় অভিবাসী গোষ্ঠীকে একই মানদণ্ডে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
তবে গবেষণা সংশ্লিষ্টরা সাধারণত বলে থাকেন, সরকারি সুবিধা গ্রহণের হার নির্ধারণে ব্যবহৃত তথ্য, সংজ্ঞা এবং পদ্ধতি বিশ্লেষণের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই কোনো একটি পরিসংখ্যানকে পুরো একটি দেশের অভিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী চূড়ান্ত তথ্য হিসেবে ব্যবহার করা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পাবলিক চার্জ মূল্যায়ন কোনো দেশের সামগ্রিক পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে করা হয় না। বরং প্রত্যেক আবেদনকারীর ব্যক্তিগত আর্থিক অবস্থা, আয়, সম্পদ, বয়স, স্বাস্থ্য, পারিবারিক পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যতে সরকারি সহায়তার সম্ভাবনা আলাদাভাবে বিবেচনা করা হয়।
স্থবিরতায় অনিশ্চয়তায় হাজারো পরিবার
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে নতুন নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা কার্যক্রম স্থগিত হওয়ার পর ঢাকাস্থ যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের নিয়মিত ভিসা ইস্যু কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এই স্থবিরতার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে পরিবারভিত্তিক অভিবাসী ভিসা আবেদনকারীদের ওপর। বহু আবেদনকারী বছরের পর বছর অপেক্ষার পর সাক্ষাৎকারের পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন। কেউ সাক্ষাৎকার শেষ করে ভিসার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ছিলেন, আবার কেউ যুক্তরাষ্ট্রে থাকা স্বজনদের সঙ্গে পুনর্মিলনের পরিকল্পনা করছিলেন। কিন্তু ভিসা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের যাত্রা, চাকরি, বাসস্থান এবং পারিবারিক পরিকল্পনা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। অনেক পরিবারের দাবি, দীর্ঘ অপেক্ষার পর তারা কোনো স্পষ্ট সময়সীমা বা কার্যকর তথ্য পাচ্ছিলেন না।
দুদিনের প্রসেসিং ঘোষণায় নতুন আশা
দীর্ঘ বিরতির পর ১ জুন ২০২৬ থেকে ঢাকাস্থ যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস আবার অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়া চালুর ঘোষণা দেয়। একই সঙ্গে সব ধরনের অভিবাসী ভিসার জন্য দুদিনের প্রসেসিং ব্যবস্থার কথা জানানো হয়। দূতাবাসের এ ঘোষণায় অপেক্ষমাণ আবেদনকারীদের মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি হয়েছিল। অনেকেই মনে করেছিলেন, দীর্ঘদিন জমে থাকা আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি হবে এবং পরিবারগুলো পুনরায় স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ফিরতে পারবে। তবে কার্যক্রম পুনরায় চালুর পর আবেদনকারীদের একটি অংশের অভিযোগ, ঘোষিত দ্রুত প্রসেসিং ব্যবস্থার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল দেখা যাচ্ছে না। তাদের দাবি, জুন মাস থেকে বিপুলসংখ্যক আবেদনকারীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হলেও ভিসা ইস্যুর ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। ফলে দুদিনের প্রসেসিং ঘোষণার বাস্তব প্রয়োগ এবং দীর্ঘদিন অপেক্ষমাণ আবেদনগুলোর নিষ্পত্তি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
২০২৫ সালে জানুয়ারি-জুলাই যেখানে ১০ হাজারের বেশি ভিসা, ২০২৬ সালে দীর্ঘ স্থবিরতা
উপলব্ধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী বা বাংলাদেশকেআবেদনকারীর জন্মস্থান অনুযায়ী, নাগরিকত্ব বা বর্তমান বসবাসের দেশ অনুযায়ী নয়। হিসেবে বিবেচনা করা আবেদনকারীদের জন্য ঢাকাস্থ যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস মোট ১০,২৩৩টি অভিবাসী ভিসা ইস্যু করেছে। বিপরীতে ২০২৬ সালের শুরুতে দীর্ঘ স্থবিরতা আবেদনকারীদের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে। ২১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে ৩১ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস একটি ইমিগ্র্যান্ট ভিসা ইস্যু করেনি
রাজনৈতিক ইস্যুতে সরব, কমিউনিটির ভিসা সংকটে নীরব?
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি আমেরিকান কমিউনিটির বিভিন্ন সংগঠন ও নেতারা দীর্ঘদিন ধরে মূলধারার রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন। তারা বিভিন্ন সময় কংগ্রেস সদস্য, সিনেটর এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক, সামাজিক ও বাংলাদেশের বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে যোগাযোগ করেছেন। তবে অভিবাসী ভিসা সংকটের সময় তাদের ভূমিকা নিয়ে এখন প্রশ্ন তুলছেন অনেক আবেদনকারী।
সমালোচকদের অভিযোগ, বাংলাদেশি আমেরিকান নেতাদের একটি অংশ বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচন, মানবাধিকারসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লবিং করলেও নিজেদের কমিউনিটির হাজারো পরিবারের অভিবাসন সমস্যাকে একই গুরুত্ব দিয়ে সামনে আনেননি।
তাদের দাবি, ছয় মাস ধরে চলা ভিসা স্থবিরতার সময় কমিউনিটি সংগঠনগুলোর উচিত ছিল মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা, কংগ্রেস সদস্যদের বিষয়টি অবহিত করা, একটি যৌথ বিবৃতি দেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো।
সংগঠনগুলোর ভূমিকা নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন
বাংলাদেশি আমেরিকান কমিউনিটিতে বহু সংগঠন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে। কিন্তু অভিবাসী ভিসার মতো সরাসরি হাজারো পরিবারের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত একটি বিষয়ে বড় ধরনের সংগঠিত উদ্যোগ কেন দেখা যায়নি, এ প্রশ্ন এখন কমিউনিটির ভেতরেই আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
অনেক আবেদনকারীর অভিযোগ, রাজনৈতিক কর্মসূচি ও বিভিন্ন ইস্যুতে সক্রিয় সংগঠনগুলো নিজেদের কমিউনিটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোর একটি নিয়ে যথেষ্ট উদ্যোগ নেয়নি। তবে অন্যদিকে অনেকে মনে করেন, অভিবাসন নীতি একটি জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং এর সমাধানে তথ্যভিত্তিক যোগাযোগ, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
অপেক্ষার শেষ কোথায়?
বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্য একটি ভিসা শুধু একটি প্রশাসনিক অনুমোদন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবার পুনর্মিলন, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা এবং বহু বছরের অপেক্ষা। ২১ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া স্থবিরতার পর ১ জুন পুনরায় কার্যক্রম চালুর ঘোষণা আবেদনকারীদের মধ্যে আশা তৈরি করলেও বাস্তব অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।
এখন অপেক্ষমাণ পরিবারগুলোর প্রধান দাবি, জমে থাকা আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি করা, ভিসা কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘ অনিশ্চয়তার অবসান ঘটানো। একই সঙ্গে বাংলাদেশি আমেরিকান কমিউনিটির নেতৃবৃন্দ ও সংগঠনগুলোর কাছেও প্রশ্ন রয়ে গেছে, কমিউনিটির সংকটের সময় তারা কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করবেন এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতিতে হাজারো পরিবারের পাশে কীভাবে দাঁড়াবেন।