সান দিয়েগো ইসলামিক সেন্টারে হামলায় নিহত (বাঁ থেকে) নাদির আওয়াদ, আমিন আবদুল্লাহ ও মানসুর কাজিহা।
যুক্তরাষ্ট্রে মসজিদ ও অন্যান্য ইসলামিক উপাসনালয়কে লক্ষ্য করে হামলা, হত্যা, হুমকি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক ঘটনার সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। মার্কিন মুসলিম অধিকারবিষয়ক সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (কেয়ার) জানিয়েছে, চলতি বছরের মে, জুন ও জুলাই এই তিন মাসে ইসলামিক উপাসনালয়কে লক্ষ্য করে সংঘটিত ঘটনার সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮৩ শতাংশ বেড়েছে। সংগঠনটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ তিন মাসে মসজিদ ও ইসলামিক উপাসনালয়কে লক্ষ্য করে মোট ১৭টি ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এমন ঘটনার সংখ্যা ছিল ছয়টি। এই তিন মাসেই ২০২৫ সালে নথিভুক্ত মোট ঘটনার ৫১ শতাংশ সংঘটিত হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে সশস্ত্র হামলা, হত্যাকাণ্ড, বোমা ও গুলি করার হুমকি, অগ্নিসংযোগের চেষ্টা, ঘৃণামূলক ফোনকল, ভয়ভীতি প্রদর্শন, ছুরি নিয়ে মসজিদে প্রবেশের চেষ্টা, কোরআন পোড়ানো এবং ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে মসজিদ নির্মাণে বাধা দেওয়ার উদ্যোগ। সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটে ১৮ মে ক্যালিফোর্নিয়ার ইসলামিক সেন্টার অব সানডিয়েগোতে। শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ দুই হামলাকারী মসজিদে হামলা চালালে নিরাপত্তারক্ষী আমিন আবদুল্লাহ (৫১), মানসুর কাজিহা (৭৮) ও নাদির আওয়াদ (৫৭) শিশুদের রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হন। তদন্তে হামলাটিকে ঘৃণাজনিত অপরাধ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
একই মাসে মিনেসোটার লেকভিল মসজিদে জ্যাকব হেনরি এথিংটন নামে এক ব্যক্তি নিজেকে ফেডারেল এজেন্ট পরিচয় দিয়ে মসজিদে প্রবেশের চেষ্টা করেন। তার কাছে একটি ছুরি ছিল। এর আগে তিনি নামাজ চলাকালে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল ও হুমকি দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। টেনেসির মাসজিদ আল-সালামে এক সশস্ত্র ব্যক্তি প্রবেশ করলেও নিরাপত্তাকর্মীদের মুখোমুখি হয়ে চলে যান। মিশিগানের ইসলামিক সেন্টার অব আমেরিকার সামনে জ্যাক ল্যাং নামের এক ব্যক্তি কোরআন পোড়ানোর দাবি করে সামাজিক মাধ্যমে মুসলিমবিদ্বেষী বার্তা ছড়ান।
জুন মাসে মিশিগানের আমেরিকান ইসলামিক কমিউনিটি সেন্টারে ফোন করে এক ব্যক্তি বলেন, আমি তোমাদের হত্যা করব। পরে ক্রিস্টোফার অ্যান্ড্রু লর্ড নামে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী হুমকি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। কানেকটিকাটের ইসলামিক সেন্টার অব ভার্নন এবং ব্রিজপোর্ট ইসলামিক কমিউনিটি সেন্টার ঘৃণামূলক একাধিক ফোনকলের শিকার হয়। একই ব্যক্তি ধারাবাহিকভাবে এসব ফোন করেছিলেন বলে তদন্তে জানা যায়।
জুনে নিউ মেক্সিকোর আলবুকার্ক ইসলামিক সেন্টার নতুন মসজিদ নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে সহিংসতার হুমকি পায়। ফলে পরিকল্পনা কমিশনের বৈঠক বিলম্বিত করতে হয়। পরবর্তীতে একই প্রকল্পের বিরোধীরা প্রকাশ্যে ইসলামবিরোধী বক্তব্য দিলেও কমিশন প্রকল্পটি অনুমোদন করে।
টেক্সাসের ফ্রিসকো শহরে একটি মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনার বিরোধিতা করে সিটি কাউন্সিলের শুনানিতে ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দেওয়া হয়। ক্যালিফোর্নিয়ার লস গ্যাটোসে ওয়েস্ট ভ্যালি মুসলিম অ্যাসোসিয়েশন অভিযোগ করে, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তাদের ওপর এমন শর্ত আরোপ করেছে, যা অন্য কোনো উপাসনালয়ের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়নি।
জুলাই মাসে নর্থ ক্যারোলাইনার ইসলামিক সেন্টার অব উইলমিংটনে এক ব্যক্তি দরজায় আঘাত করে অশ্লীল ভাষায় গালাগাল দেন এবং মসজিদটি ভেঙে ফেলার হুমকি দেন। তিনি আগে থেকেই একাধিক সংস্থার তদন্তের আওতায় ছিলেন। পেনসিলভানিয়ার নর্থইস্ট ফিলাডেলফিয়া ইসলামিক সেন্টারে অগ্নিসংযোগকারী একটি যন্ত্র ব্যবহার করে হামলার অভিযোগে ভিনসেন্ট ল্যাংকে গ্রেফতার করা হয়। তদন্তকারীরা তার গাড়িতে হাতে লেখা মুসলিমবিদ্বেষী বার্তা পান।
নিউইয়র্কের সানিসাইড মুসলিম সেন্টারে ফোন করে এক ব্যক্তি মুসল্লিদের গুলি করার হুমকি দেন। অন্যদিকে নর্থ ক্যারোলাইনার ইসলামিক অ্যাসোসিয়েশন অব র্যালিতে বোমা হামলার ভুয়া হুমকি দেওয়ায় মসজিদ খালি করে সবাইকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়। টেক্সাসের লা পোর্তে ইসলামিক সেন্টার নির্মাণের বিরোধিতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে একটি অনলাইন আবেদনপত্র তৈরি করা হয়, যেখানে ইসলামকে সম্প্রদায়ের জন্য হুমকি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। আবেদনটিতে ১ হাজার ৬০০-এর বেশি স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয়।
কেয়ারের গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি বিভাগের পরিচালক কোরি সেলর বলেন, ইসলামবিদ্বেষ এখনও যুক্তরাষ্ট্রে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য এক ধরনের ঘৃণার রূপ। মুসলিমদের উপাসনালয়গুলো রাজনৈতিক বিদ্বেষ ও সহিংসতার সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। কেয়ার জানায়, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত মসজিদ, ইসলামিক কমিউনিটি সেন্টার ও অন্যান্য মুসলিম উপাসনালয়কে লক্ষ্য করে ৩৩টি ঘটনার তথ্য তারা নথিভুক্ত করেছে। এসব তথ্য গণমাধ্যম, আদালতের নথি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত যাচাইযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে সংগ্রহ করা হয়েছে।
মুসলিম উপাসনালয়ের নিরাপত্তা জোরদারে কেয়ার ও নর্থ আমেরিকান ইসলামিক ট্রাস্ট আগামী আগস্টের শেষ দিকে একটি হালনাগাদ নিরাপত্তা নির্দেশিকা প্রকাশ করবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে মসজিদ পরিচালনাকারীদের নিরাপত্তা পরিকল্পনা আরো শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।