০৬ অগাস্ট ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ০৩:২৭:৪০ পূর্বাহ্ন


নিউইয়র্কের পাঁচ বরো ও লং আইল্যান্ডে আইস অভিযানের তৎপরতা বেড়েছে
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৫-০৮-২০২৬
নিউইয়র্কের পাঁচ বরো ও লং আইল্যান্ডে আইস অভিযানের তৎপরতা বেড়েছে আইস কার্যক্রমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিরোধ বিক্ষোভকারীদের


নিউইয়র্ক সিটিতে ইউএস ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস)-এর তৎপরতা বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গত ৩০ জুলাই বৃহস্পতিবার থেকে নিউইয়র্কের পাঁচটি বরো এবং লং আইল্যান্ডের বিভিন্ন এলাকায় আগের তুলনায় বেশিসংখ্যক আইস এজেন্টের উপস্থিতি দেখা গেছে বলে দাবি করেছেন অভিবাসন অধিকারকর্মী ও স্থানীয় সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায়, কিছু এজেন্ট বডি আর্মার ও মুখোশ পরা অবস্থায় রাস্তায় কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। অভিবাসন অধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, কয়েকটি ঘটনায় এজেন্টরা সাধারণ মানুষকে থামিয়ে তাদের পরিচয় ও অভিবাসন সংক্রান্ত তথ্য জানতে চেয়েছেন।

স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গত ৩০ জুলাই ম্যানহাটন, কুইন্স ও ব্রুকলিনের কয়েকটি এলাকায় একাধিক আইস কর্মকর্তাকে দেখা যায়। ব্রুকলিনের বুশউইক এলাকায় একটি পরিবারের গাড়ি থামিয়ে এজেন্টরা তাদের পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট দেখতে চেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে ওই পরিবারকে আটক করা হয়নি বলে জানা গেছে।

একই দিনে কুইন্সের ইস্ট এলমহার্স্ট এবং ম্যানহাটনের ইনউড এলাকাতেও আইস কর্মকর্তাদের উপস্থিতির খবর পাওয়া যায়। ইনউডের সিম্যান ও ইশাম অ্যাভিনিউ এলাকায় এক নারী আইস কর্মকর্তাদের ভিডিও ধারণ করার সময় তাকে মরিচের স্প্রে করা হয়েছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাটি নিয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিবাসন অধিকারকর্মীরা।

নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের সদস্য কারমেন দে লা রোসা ফেডারেল অভিবাসন অভিযানের ধরন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, অভিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় আদালতের অনুমোদিত ওয়ারেন্ট ছাড়া এ ধরনের উপস্থিতি সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি তৈরি করতে পারে।

এদিকে নিউইয়র্ক ইমিগ্রেশন কোয়ালিশন এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে অভিবাসন আইনপ্রয়োগকারী কার্যক্রম বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অভিযান আরো বাড়তে পারে। অভিবাসন অধিকার সংগঠনগুলোর মতে, নিউইয়র্কে আইসের সাম্প্রতিক তৎপরতা ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির অংশ হতে পারে। তারা বলছে, প্রশাসনের অভিবাসনবিষয়ক কর্মকর্তারা বড় শহরগুলোতে অভিযান জোরদারের কথা আগেই জানিয়েছিলেন।

এদিকে টেম্পোরারি প্রোটেক্টেড স্ট্যাটাস (টিপিএস)-এর ভবিষ্যৎ নিয়েও অভিবাসী কমিউনিটিতে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে কিছু দেশের নাগরিকদের সুরক্ষা সুবিধা বাতিলের সিদ্ধান্তের পর নিউইয়র্কের অভিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবে আইসের কার্যক্রমকে সমর্থনকারীরা বলছেন, সংস্থাটি শুধু অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছে। তাদের মতে, ফেডারেল আইন কার্যকর করা আইসের দায়িত্ব। অন্যদিকে সমালোচকরা বলছেন, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি অভিযানের পদ্ধতি, স্বচ্ছতা এবং সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

নিউইয়র্কের বর্তমান পরিস্থিতি অভিবাসন নীতি, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা এবং অভিবাসী কমিউনিটির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। অভিবাসী সংগঠনগুলো বাসিন্দাদের নিজেদের আইনি অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকার এবং কোনো ঘটনার শিকার হলে আইনগত সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন অভিযানে গতি, জুলাইয়ে রেকর্ড সংখ্যক অভিবাসী আটক

ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসনবিরোধী অভিযান আরো জোরদার হয়েছে। ইউএস ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস)-এর অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে জুলাই মাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক অভিবাসী আটক করা হয়েছে। বিমানবন্দর, ইমিগ্রেশন চেক ইন অফিস এবং বিভিন্ন কমিউনিটিতে অভিযান বাড়িয়ে এ কার্যক্রম চালানো হয়। অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে আইস ৪৬ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে আটক করেছে। তাদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অবস্থান বা অন্যান্য অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। জুলাইয়ের এ সংখ্যা জুন মাসের প্রায় ৪৩ হাজার আটকের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে। একই সময়ে আইস হেফাজতে থাকা অভিবাসীর সংখ্যা প্রায় ৬৮ হাজারে পৌঁছেছে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেশজুড়ে প্রতিদিন ২ হাজার গ্রেফতারের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। বছরের শুরুতে কিছুটা ধীরগতির পর গ্রীষ্মে আবার অভিযান বাড়ানো হয়েছে। তবে আগের মতো বড় ধরনের প্রকাশ্য অভিযান না চালিয়ে তুলনামূলক নীরব কৌশলে গ্রেফতার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে বলে অভিবাসন বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে বিমানবন্দরে সাদা পোশাকের আইস কর্মকর্তাদের অভিযান নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে গেট ও চেক ইন কাউন্টার থেকে অভিবাসীদের আটক করা হচ্ছে। ট্রান্সপোর্টেশন সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (টিএসএ) এবং আইসের তথ্য বিনিময়ের কারণে অভিবাসন স্ট্যাটাস সমস্যায় থাকা যাত্রীদের শনাক্ত করা সহজ হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন বিভিন্ন দেশের অভিবাসীদের জন্য বিদ্যমান সুরক্ষা সুবিধা পুনর্বিবেচনা করছে। সম্প্রতি ৩ লাখের বেশি হাইতিয়ান অভিবাসীর টেম্পোরারি প্রোটেক্টেড স্ট্যাটাস (টিপিএস) বাতিলের সিদ্ধান্ত নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্ট (ডিএইচএস) দাবি করেছে, প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপের ফলে বিপুল সংখ্যক অবৈধ অভিবাসী যুক্তরাষ্ট্র ছেড়েছে এবং লাখো মানুষকে আটক করা হয়েছে। তবে সমালোচকদের মতে, এ অভিযানের প্রভাব অনেক দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত অভিবাসী ও তাদের পরিবারের ওপরও পড়ছে। অভিবাসন বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান প্রশাসনের লক্ষ্য গণবহিষ্কার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতি, আইন প্রয়োগ এবং মানবাধিকার নিয়ে বিতর্ক আরো তীব্র হচ্ছে।

অভিবাসন ইস্যুতে ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডে আমেরিকানদের সমর্থন কমেছে

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি নিয়ে জনসমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বলে নতুন এক জরিপে উঠে এসেছে। গত ২৩ থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত পরিচালিত অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) ও নরক সেন্টার ফর পাবলিক অ্যাফেয়ার্স রিসার্চের যৌথ জরিপ অনুযায়ী, ট্রাম্পের অভিবাসন-সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে বর্তমানে ৩৯ শতাংশ আমেরিকান সমর্থন জানিয়েছেন, যেখানে ৫৮ শতাংশ তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে এ সমর্থনের হার ছিল ৪৯ শতাংশ।

জরিপে দেখা যায়, রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যেও ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির প্রতি সমর্থন কিছুটা কমেছে। দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে যেখানে ৮৮ শতাংশ রিপাবলিকান তার পদক্ষেপকে সমর্থন করেছিলেন, বর্তমানে তা কমে ৮১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, ইন্ডিপেনডেন্ট ও ডেমোক্র্যাট ভোটারদের সমর্থন শুরু থেকেই তুলনামূলকভাবে কম ছিল।

অভিবাসন নীতির বিভিন্ন দিক নিয়েও জনমনে অসন্তোষ দেখা গেছে। প্রায় অর্ধেক উত্তরদাতা মনে করেন, বৈধ অভিবাসনের ওপর কড়াকড়ি আরোপের ক্ষেত্রে ট্রাম্প অতিরিক্ত দূর এগিয়ে গেছেন। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী আইনি মর্যাদা না থাকা অভিবাসীদের বহিষ্কারের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট তার সাংবিধানিক ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছেন বলে মত দিয়েছেন ৪৭ শতাংশ অংশগ্রহণকারী।

জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৩০ শতাংশ উত্তরদাতা ট্রাম্পের পদক্ষেপকে ‘যথাযথ’ বলে মনে করেন, আর প্রায় ২০ শতাংশের মতে তিনি অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে আরো কঠোর হওয়া উচিত ছিল। অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা (আইসিই)-এর কার্যক্রম নিয়েও জনমত বিভক্ত। প্রায় অর্ধেক আমেরিকান আইসিইর অভিযান ও কৌশল নিয়ে কিছুটা বা জোরালোভাবে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। বিপরীতে প্রায় ৩০ শতাংশ এসব কার্যক্রমকে সমর্থন করেছেন।

দলীয় বিভাজনও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। জরিপে দেখা যায়, রিপাবলিকানদের প্রায় ৬০ শতাংশ আইসিইর কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করেন। স্বতন্ত্র ভোটারদের মধ্যে এ হার প্রায় ২০ শতাংশ এবং ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে মাত্র ৪ শতাংশ।

গত এক বছরের বেশি সময় ধরে লস অ্যাঞ্জেলেস, মিনিয়াপোলিসসহ বিভিন্ন ডেমোক্র‍্যাট-নিয়ন্ত্রিত শহরে ফেডারেল অভিবাসন অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এসব অভিযানের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে একাধিক মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে, যা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরো তীব্র হয়েছে।

এদিকে নিউইয়র্ক সিটির কুইন্স এলাকায়ও আইসিই নতুন অভিযান শুরু করেছে। নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি সংস্থাটির কঠোর সমালোচনা করে আইসিই বিলুপ্তির আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা আইসিই কর্মকর্তাদের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে বডি ক্যামেরা ব্যবহারের দাবি আরো জোরালো করেছেন।

শেয়ার করুন