০৯ জুলাই ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ৬:০৬:৫১ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
অপহরণ ও নির্যাতন : লুবনা দুই অপহরণ মামলায় দোষী সাব্যস্ত নিউইয়র্কে ১ হাজার ২৫০ কিউনি শিক্ষার্থীর জন্য বিনামূল্যে অমনি কার্ড পাইলট কর্মসূচি মসজিদে ইসলামবিরোধী ও প্রাণনাশের হুমকিতে এক ব্যক্তি অভিযুক্ত সুলতানা রাজিয়া ও সৈয়দ রুবেল অপহরণ মামলায় দোষী সাব্যস্ত যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ বছর উদযাপনে ধর্মীয় ইতিহাস ঘিরে বিতর্ক দুর্বৃত্তের অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত নর্থ ইস্ট ফিলাডেলফিয়া ইসলামিক সেন্টার ওজনপার্কের বৈঠকখানা রেস্টুরেন্টে হাতবোমা নিক্ষেপ নিউইয়র্কে আইনশৃঙ্খলার উন্নয়নে ১০০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ঘোষণা কঠোর অভিবাসন নীতিতে বিপাকে মার্কিন নাগরিকদের বিদেশি স্বামী-স্ত্রী আগাম বন্যার পদধ্বনি, আশঙ্কার ছায়া চট্টগ্রাম-সিলেটে


খালেদা জিয়ার সঙ্গে বিতর্কে জড়ানো সেই শামসুন্নাহার বাধ্যতামূলক অবসরে
বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৮-০৭-২০২৬
খালেদা জিয়ার সঙ্গে বিতর্কে জড়ানো সেই শামসুন্নাহার বাধ্যতামূলক অবসরে শামসুন্নাহার


বাংলাদেশের গত দেড় দশকের রাজনীতিতে এমন কিছু নাটকীয় ও নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে, যা দেশের শাসনব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইতিহাসে গভীর দাগ কেটে গেছে। বিশেষ করে ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ে বিরোধী দলের আন্দোলন দমন ও ক্ষমতা সুসংহত করার প্রক্রিয়ায় ‘বালুর ট্রাক’, ‘গোপালী’ তকমা এবং মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের অতি-উৎসাহী ভূমিকা দেশজুড়ে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।

‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ এবং রাজধানী অবরুদ্ধকরণ

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি শেখ হাসিনা সরকার কতৃক একতরফা সাধারণ নির্বাচন করার যে ঘোষনা সেটা বর্জনের ঘোষণা দিয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোট ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ (গবেষণায় যা ‘গণতন্ত্রের অভিযাত্রা’ হিসেবে পরিচিত) কর্মসূচির ডাক দেয়। ২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ছিল সারা দেশ থেকে লাখ লাখ নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে ঢাকায় এনে নয়াপল্টনে সমবেত করা এবং সরকারের ওপর নির্বাচন স্থগিতের চাপ সৃষ্টি করা।

বিএনপির সেই কর্মসূচি রুখতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ঢাকাকে কার্যত সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। বাস, ট্রেন ও লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে কঠোর পুলিশি বেষ্টনী তৈরি করা হয় এবং শাসক দলের নেতাকর্মীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে ঢাকার প্রবেশপথগুলো দখল করে রাখে। ফলে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা ঢাকায় পৌঁছাতে না পারায় কর্মসূচিটি সফল হতে পারেনি।

খালেদা জিয়ার বাসার সামনে বালুর ট্রাক

কর্মসূচি সফল করতে পল্টনে যাবার কথা বেগম খালেদা জিয়ার। কিন্তু বাসার সামনে বালুর ট্রাক রেখে বাধা দেয়া হয়। সেখানে পুলিশ সদস্যের সঙ্গে যে বাকবিতান্ডা হয় তার এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে ছিলেন আলোচিত ওই পুলিশ কর্মকর্তা শামছুন্নাহার। 

২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বরের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচিতে যোগ দিতে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া যেন তাঁর গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’ থেকে বের হতে না পারেন, সেজন্য ২৮ ডিসেম্বর গভীর রাতেই তাঁর বাড়ির চারপাশের প্রবেশপথে ৫টি বড় বড় বালু ভর্তি ট্রাক আড়াআড়িভাবে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়।

তৎকালীন পুলিশ প্রশাসন ও সরকারি দল দাবি করেছিল, খালেদা জিয়ার “নিরাপত্তা জোরদার” করার স্বার্থে এগুলো রাখা হয়েছিল। তবে দেশী-বিদেশী গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এটিকে “নজিরবিহীন গৃহবন্দিত্ব” হিসেবে আখ্যা দেন। (অনুরূপভাবে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতেও তাঁর গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়ের সামনে ডজনখানেক বালুর ট্রাক রেখে তাঁকে অবরুদ্ধ করা হয়েছিল)।

খালেদা জিয়ার ‘গোপালী’ মন্তব্য 

২৯ ডিসেম্বর ২০১৩ তারিখ সকালে অবরুদ্ধ খালেদা জিয়া তাঁর গাড়ি নিয়ে নয়াপল্টনের উদ্দেশ্যে রওনা হতে চাইলে পুলিশ তাঁর গেটের সামনে বাধা দেয়। তখন কর্তব্যরত নারী পুলিশ কর্মকর্তা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সাথে তাঁর তীব্র বাকবিতণ্ডা হয়।

কর্মসূচিতে যেতে খালেদা জিয়া বাসার বাইরে এসে নিজ গাড়ীতে উঠতে গেলে বাধা দেয়া হয়। পুলিশ সদস্যরা তার সঙ্গে বাকবিতান্ডা করেন। খালেদা জিয়া এটাকে ‘বেয়াদবি’ হিসেবে দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বিশেষ করে আলোচিত ওই পুলিশ কর্মকর্তা শামছুন্নাহার এসবের ছিলেন অগ্রভাগে। ওই সময় বাসার পকেট গেটটিতে খালেদা জিয়ার পথরোধ করেছিলেন তৎকালীন ডিএমপির এডিসি শামসুন্নাহার। খালেদা জিয়া পুলিশ সদস্যদের কিছুটা ঠেলে বের হতে চাইলে শামসুন্নাহার অন্যন্য নারী পুলিশদের শাসিয়ে বলেন, ‘এই প্রাচীর তৈরি করো শক্তভাবে। কোনোভাবেই যেন তিনি বের হতে না পারেন।’ এ ছাড়া, শামসুন্নাহার বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘স্যার, আপনি কোনোভাবেই বের হতে পারবেন না। সব পথ বন্ধ। আপনাকে ভেতরেই থাকতে হবে।’

বাসা থেকে বের হতে না পেরে ও পুলিশের এডিসি শামসুন্নাহারের আচরণের জবাব দিতেই এক সময় বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ‘আপনি কে? আপনার মুখটা এখন বন্ধ কেন? এই যে মহিলা, বলেন তো আপনি যেন কি বলছিলেন। দেশ কোথায়? গোপালি?’ এর পর থেমে থেকে বলেন, ‘গোপালগঞ্জ জেলার নামই বদলে যাবে। গোপালগঞ্জ থাকবে না। আল্লাহর গজব পড়বে আপনারা যা শুরু করে দিয়েছেন। আমাদের যেতে দিন, আমাদের গায়ের ওপরে উঠে পড়বেন না। দূরে থাকেন।’

খালেদা জিয়া আরো বলেন, ‘আপনারা আপনাদের জায়গায় থাকেন। আপনাদের তো রাস্তায় থাকার কথা। আপনারা বাড়ির ভেতরে এসে পড়েছেন কেন? আপনাদের মেয়েরা (নারী পুলিশ) এত কথা বলে কেন? এই মেয়েরা চুপ করো। কয়দিনের চাকরি হয়েছে। কীসের জন্য এত কথা বলো, চুপ থাকো। বেয়াদব কোথাকার।’

সেদিন পুলিশের কারণে বেগম খালেদা জিয়া গুলশানের বাসা থেকে বের হতে পারেননি। সড়কে বালির ট্রাক আর ভেতরে বিপুল সংখ্যক পুলিশের ব্যারিকেড সেদিনের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি, চলো চলো ঢাকা চলো’ মহাসমাবেশ আর হয়নি। ফলে খালেদা জিয়া এক পর্যায়ে বাসার ভেতরে চলে যান। 

শামছুন্নাহার: সেই সময়ের আলোচিত মুখ

বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তা শামছুন্নাহার (সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি) আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মাঠপর্যায়ের অত্যন্ত প্রভাবশালী কর্মকর্তা ছিলেন। বিশেষ করে চাঁদপুর ও গাজীপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে রাজনৈতিক আন্দোলন দমন এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের গুডবুকে থাকার কারণে তিনি গণমাধ্যমে বেশ আলোচিত ও বিতর্কিত হন। বিরোধীদের রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ নিয়ন্ত্রণে তাঁর কঠোর অবস্থান নিয়ে সে সময় মানবাধিকার সংগঠন ও বিরোধী দলগুলো তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল।

বাধ্যতামূলক অবসর 

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের পুলিশ-১ শাখা থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি ও এসপিসহ মোট ৩৩ জন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাকে জনস্বার্থে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৫ ধারার বিধান অনুযায়ী জারি করা এ আদেশ ৫ জুলাই ২০২৬ থেকে অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে। অবসরে পাঠানো কর্মকর্তাদের তালিকায় পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি ড. শামসুন্নাহার বিউটি ও রয়েছেন। 

সবশেষ 

বালুর ট্রাক, অবরুদ্ধ বিরোধী দল কিংবা অতি-দলীয়করণের প্রশাসনিক সংস্কৃতি দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে দিয়েছিল। ইতিহাসের পাতায় এই ঘটনাগুলো যেমন তৎকালীন সরকারের কঠোর দমনপীড়নের উদাহরণ হিসেবে রয়ে গেছে, ঠিক তেমনি ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর সেই ঘটনার কুশীলবদের আইনি পরিণতি ও বাধ্যতামূলক অবসর এটিই প্রমাণ করে রাজনীতিতে কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়।

শেয়ার করুন