ডাকা সুরক্ষার দাবিতে সুপ্রিম কোর্টের সামনে সমাবেশে অংশ নেন অভিবাসী অধিকারকর্মী ও সমর্থকরা
যুক্তরাষ্ট্রে শিশু অবস্থায় আসা লাখো অভিবাসীর জন্য ২০১২ সালে চালু হওয়া ডিফার্ড অ্যাকশন ফর চাইল্ডহুড অ্যারাইভালস (ডাকা) কর্মসূচি একসময় নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও আশার প্রতীক ছিল। কিন্তু কর্মসূচিটির ১৪তম বছরে এসে অনেক ডাকা সুবিধাভোগী এখন নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। অভিবাসন অধিকারকর্মীরা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির ফলে ডাকা সুবিধাভোগীরা ক্রমেই আটক, বহিষ্কার এবং কর্মসংস্থানের অধিকার হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছেন। ডাকা কর্মসূচি চালুর আগে যুক্তরাষ্ট্রে বেড়ে ওঠা হাজার হাজার তরুণ-তরুণী প্রতিনিয়ত বহিষ্কারের ভয়ে জীবন কাটাতেন। ২০১২ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে চালু হওয়া এ কর্মসূচি তাদের জন্য সাময়িক সুরক্ষা এবং নবায়নযোগ্য কর্মসংস্থানের অনুমতি নিয়ে আসে। ফলে বহু তরুণ প্রথমবারের মতো ড্রাইভিং লাইসেন্স, বৈধ চাকরি, উচ্চশিক্ষা এবং স্বাভাবিক জীবনের সুযোগ পান।
তারা ডাকা পাওয়ার পর প্রথমবারের মতো তার বন্ধুদের মতো ড্রাইভিং লাইসেন্স অর্জন করতে সক্ষম হন। উচ্চবিদ্যালয় শেষ করে কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান। কিন্তু সে নিরাপত্তাবোধ এখন দ্রুত ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। অভিবাসন অধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যাপক বহিষ্কার কর্মসূচির আওতায় ডাকা সুবিধাভোগীরাও ক্রমবর্ধমানভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রথমদিকে বলা হয়েছিল যে কেবল গুরুতর অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে বলে দাবি করছেন অধিকারকর্মীরা।
তাদের মতে, বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী, কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড না থাকা ব্যক্তিরাও এখন আটক ও বহিষ্কারের মুখোমুখি হচ্ছেন। উদাহরণ হিসেবে মারিয়া নামের এক ডাকা সুবিধাভোগীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যিনি ২৭ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন এবং যার বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ নেই। অভিযোগ অনুযায়ী, বৈধ অভিবাসন মর্যাদা পরিবর্তনের জন্য সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে তিনি আটক হন এবং তার পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, ডাকা কর্মসূচিকে দুর্বল করার জন্য একাধিক দিক থেকে চাপ তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো আবেদন নবায়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘ বিলম্ব। অতীতে ডাকা নবায়নের প্রক্রিয়া তুলনামূলক দ্রুত সম্পন্ন হলেও বর্তমানে অনেক আবেদনকারীকে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
এ বিলম্বের ফলে অনেকের কর্মসংস্থানের অনুমোদনের মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে তারা বৈধভাবে কাজ করার অধিকার হারাচ্ছেন। একই সঙ্গে তারা এমন অবস্থায় পড়ছেন, যেখানে তাদের যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকে অননুমোদিত উপস্থিতি হিসেবে গণ্য করা হতে পারে। অভিবাসন আইন অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় অননুমোদিত উপস্থিতি ভবিষ্যতে গ্রিনকার্ড বা অন্য কোনো বৈধ অভিবাসন সুবিধা পাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে বোর্ড অব ইমিগ্রেশন আপিলসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। ওই সিদ্ধান্তে বলা হয়, শুধু ডাকা মর্যাদা থাকা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে চলমান বহিষ্কার কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য যথেষ্ট কারণ নয়। অভিবাসন আইনজীবীদের মতে, এ সিদ্ধান্ত ডাকা সুবিধাভোগীদের বহিষ্কার থেকে সুরক্ষার দীর্ঘদিনের ভিত্তিকে দুর্বল করেছে।
এদিকে ডাকা কর্মসূচির বৈধতা নিয়েও আদালতে দীর্ঘদিন ধরে আইনি লড়াই চলছে। টেক্সাসসহ কয়েকটি অঙ্গরাজ্য বহু বছর ধরে কর্মসূচিটির বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনা করছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পঞ্চম সার্কিট আপিল আদালত একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ে ডাকার আওতায় কর্মসংস্থানের অনুমতি দেওয়ার অংশকে আইনসম্মত নয় বলে মত দেয়। তবে একই সঙ্গে আদালত বহিষ্কার থেকে সাময়িক সুরক্ষার অংশটি বহাল রাখে।
রায়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এর প্রভাব মূলত টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়। ফলে টেক্সাসের বাইরে বসবাসকারী ডাকা সুবিধাভোগীরা এখনো তাদের কর্মসংস্থানের অনুমতি নবায়ন করতে পারছেন। কিন্তু টেক্সাসে বসবাসকারীদের জন্য পরিস্থিতি অনেক বেশি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। মামলাটি এখনো নিম্ন আদালতে বিচারাধীন রয়েছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। অন্যদিকে ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি স্বীকার করেছে যে ইতোমধ্যে ২৬০ জনের বেশি ডাকা সুবিধাভোগীকে আটক করা হয়েছে এবং ৮০ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। যদিও এ সংখ্যাগুলো ডাকা কর্মসূচির মোট সুবিধাভোগীর তুলনায় কম, তবুও অধিকারকর্মীরা বলছেন, এটি একটি উদ্বেগজনক প্রবণতার ইঙ্গিত বহন করে।
অভিবাসন অধিকার সংগঠনগুলোর ভাষায়, ডাকা কর্মসূচিকে এক ধাক্কায় বাতিল করা না হলেও বিভিন্ন প্রশাসনিক, আইনি ও নীতিগত পদক্ষেপের মাধ্যমে ধীরে ধীরে দুর্বল করে ফেলা হচ্ছে। তারা এ প্রক্রিয়াকে হাজার ক্ষতের মাধ্যমে মৃত্যু হিসেবে বর্ণনা করছেন। তবে জনমত জরিপগুলো ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে। ২০২৫ সালের একটি গ্যালাপ জরিপ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ৮০ শতাংশ নাগরিক শিশু অবস্থায় দেশে আসা অভিবাসীদের জন্য স্থায়ী বৈধ মর্যাদা বা নাগরিকত্বের পথ তৈরির পক্ষে মত দিয়েছেন। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলের ভোটারদের মধ্যেই এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য সমর্থন রয়েছে।
অর্থনীতিতেও ডাকা সুবিধাভোগীদের অবদান কম নয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, তারা প্রতিবছর প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে অবদান রাখেন। তারা শুধু কর্মী নন; অনেকেই ব্যবসার মালিক, বাড়ির মালিক, শিক্ষার্থী, স্বাস্থ্যকর্মী, শিক্ষক এবং করদাতা। যুক্তরাষ্ট্রের অসংখ্য সম্প্রদায়ে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। কিন্তু ডাকা শুরু থেকেই একটি অস্থায়ী সমাধান ছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল কংগ্রেসে অভিবাসন সংস্কার আইন পাস না হওয়া পর্যন্ত তরুণ অভিবাসীদের সুরক্ষা দেওয়া। কিন্তু ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও কংগ্রেস স্থায়ী সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
ফলে আজও লাখো ড্রিমার অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করছেন। তারা যুক্তরাষ্ট্রে বেড়ে উঠেছেন, এখানেই পড়াশোনা করেছেন, কাজ করছেন এবং পরিবার গড়েছেন। অনেকের জন্মভূমির সঙ্গে বাস্তবিক কোনো সম্পর্কও নেই। তবুও কাগজ-কলমে তারা এখনো পূর্ণ আইনি স্বীকৃতি পাননি। অভিবাসন অধিকারকর্মীদের মতে, ড্রিমাররা কাগজপত্র ছাড়া প্রায় সব দিক থেকেই আমেরিকান। তাদের দাবি, কংগ্রেসের উচিত দ্রুত এমন একটি আইন পাস করা, যা ডাকা সুবিধাভোগীদের জন্য স্থায়ী বৈধ মর্যাদা এবং নাগরিকত্বের একটি সুস্পষ্ট পথ তৈরি করবে।
ডাকা কর্মসূচির ১৪তম বার্ষিকীতে হাজারো তরুণ-তরুণীর একটি প্রশ্ন, যে কর্মসূচি একসময় তাদের স্বপ্ন দেখার সাহস দিয়েছিল, সেটি কি ভবিষ্যতেও তাদের সুরক্ষা দিতে পারবে, নাকি সেই স্বপ্নই ধীরে ধীরে দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে?