যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বাড়ায় ঋণ ও জীবনযাত্রার ব্যয়ে চাপ আরো বাড়ছে
যুক্তরাষ্ট্রে আবারও বেড়েছে গৃহঋণের সুদের হার। ইরান যুদ্ধকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা, বন্ডবাজারের অস্থিরতা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ে নতুন উদ্বেগের কারণে ৩০ বছরের স্থায়ী সুদের মর্টগেজ হার গত নয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে। এতে করে বাড়ি কেনার খরচ আরো বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন হাউজিং মার্কেটে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি বর্তমানে এক মিশ্র পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে একদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে শেয়ারবাজারে অব্যাহত রয়েছে ইতিবাচক প্রবণতা।
মর্টগেজ ফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানফ্রেডি ম্যাক জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে ৩০ বছরের ফিক্সড রেট মর্টগেজের গড় সুদের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৫১ শতাংশে। গত বছরের আগস্টের পর এটি সর্বোচ্চ হার। ২০২৫ সালের এপ্রিলের পর এটিই ছিল সুদের হারে সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক ঊর্ধ্বগতি। ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা এবং দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বন্ডবাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। এর প্রভাব পড়েছে মার্কিন ট্রেজারি ইয়েল্ডে। বিশেষ করে ১০ বছরের ট্রেজারি বন্ডের ইয়েল্ড এক বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সাধারণত মর্টগেজ সুদের হার এই ট্রেজারি ইয়েল্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
গত সপ্তাহে প্রকাশিত কনজ্যুমার প্রাইস ইনডেক্স বা সিপিআই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৩ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২৩ সালের মে মাসের পর সর্বোচ্চ। একই সঙ্গে তিন বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো আমেরিকানদের মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতিকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি।
ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে মর্টগেজ সুদের হার সাময়িকভাবে ৬ শতাংশের নিচে নেমে গিয়েছিল। তখন যারা ঋণ নিয়েছেন, তারা এখনকার তুলনায় উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় পাচ্ছেন। উদাহরণ হিসেবে, ৪ লাখ ৫০ হাজার ডলারের একটি বাড়ির জন্য ২০ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে যদি ফেব্রুয়ারির শেষের ৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ সুদে ঋণ নেওয়া হতো, তাহলে মাসিক কিস্তি হতো প্রায় ২ হাজার ১৫৪ ডলার। কিন্তু বর্তমান ৬ দশমিক ৫১ শতাংশ সুদে সেই কিস্তি বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ২ হাজার ২৭৮ ডলারে। অর্থাৎ বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ হাজার ৪৮৮ ডলার এবং পুরো ঋণের মেয়াদে অতিরিক্ত ৪৪ হাজার ৬৪০ ডলারের বেশি গুনতে হবে ক্রেতাদের।
যদিও বর্তমান সুদের হার গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কিছুটা কম। গত বছরের মে মাসে ৩০ বছরের স্থায়ী মর্টগেজ হার ছিল ৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ। তবে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার তিনবার কমানোর পরও অর্থনীতিবিদদের প্রত্যাশামতো মর্টগেজ হার তেমন কমেনি। উচ্চ সুদের হার এবং মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এখন যুক্তরাষ্ট্রের হাউজিং মার্কেটেও প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। সাধারণত বসন্ত মৌসুমে বাড়ি কেনাবেচা বাড়লেও চলতি বছর বাজারে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে।
মর্টগেজ ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন এর তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে নতুন বাড়ি কেনার জন্য মর্টগেজ আবেদন আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে। মার্চ ২০২৬-এর তুলনায় আবেদন কমেছে ১০ শতাংশ। আবেদন কমে যাওয়ার প্রভাব পড়ছে বাড়ি বিক্রিতেও। ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব রিয়েলটরস জানিয়েছে, মার্চ থেকে এপ্রিলের মধ্যে বিদ্যমান বাড়ি বিক্রি মাত্র শূন্য দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। এর আগের মাসে বিক্রি কমেছিল ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এদিকে বাড়ির দামও রেকর্ডের কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। এপ্রিল মাসে বিদ্যমান বাড়ির মধ্যম মূল্য ছিল ৪ লাখ ১৭ হাজার ৭০০ ডলার। টানা ৩৪ মাস ধরে বছরওয়ারি ভিত্তিতে বাড়ির দাম বেড়েছে।
হাউজিং ওয়েবসাইট হোমস ডট কম এর প্রধান অর্থনীতিবিদ ব্র্যাড কেস বলেন, এ মুহূর্তে বাড়ির মালিক হওয়ার পথে দুটি বড় বাধা রয়েছে। একটি হলো উচ্চ মর্টগেজ সুদের হার, অন্যটি হলো অনিশ্চয়তা। মানুষ যখন বাড়ি কেনে, তখন জীবনের সবচেয়ে বড় চেকটি কাটে। তিনি আরো বলেন, এ ধরনের বড় সিদ্ধান্ত নিতে মানুষের স্থিতিশীল ভিত্তি প্রয়োজন। মার্চের শুরু থেকে সুদের হারের ওঠানামা সেই স্থিতিশীলতা নষ্ট করেছে, হার বাড়ুক বা কমুক, উভয় ক্ষেত্রেই মানুষ অনিশ্চয়তায় ভুগছে।