সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বৈশ্বিক আমদানির ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক পুনরায় কার্যকর করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের রায়ে আগের শুল্কনীতি আংশিকভাবে বাতিল হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বৈশ্বিক আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ নির্ধারণ করেন। এরপর মাত্র একদিনের মধ্যে বৈশ্বিক আমদানি শুল্ক আবারও বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২০ ফেব্রুয়ারি শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি জানান, সদ্য ঘোষিত ১০ শতাংশের বিশ্বব্যাপী শুল্ক বাড়িয়ে তা ১৫ শতাংশে উন্নীত করা হচ্ছে এবং এটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে।
আগে ২০ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ৬-৩ ভোটে বিভক্ত রায়ে প্রেসিডেন্টের আরোপিত বিস্তৃত শুল্কনীতির বড় অংশকে অবৈধ ঘোষণা করে। আদালত বলেন, ১৯৭৭ সালের ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ার্স অ্যাক্ট (আইইইপিএ) আইনের অধীনে সারা বিশ্বের পণ্যের ওপর এভাবে ব্যাপক শুল্ক আরোপের ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের নেই। ফলে আইইইপিএ আইনের ভিত্তিতে কার্যকর থাকা অধিকাংশ শুল্ক বাতিল হয়ে যায়। তবে অটোমোবাইল, গাড়ির যন্ত্রাংশ ও সেমিকন্ডাক্টর চিপসের মতো কিছু খাতভিত্তিক শুল্ক বহাল থাকে।
এই রায়ের পরপরই ট্রাম্প নতুন পথ বেছে নেন। তিনি ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্ট অব ১৯৭৪ এর ১২২ ধারার অধীনে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত অস্থায়ী আমদানি সারচার্জ আরোপের ক্ষমতা ব্যবহার করছেন। ওই আইনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে বড় ও গুরুতর ভারসাম্যহীন বাণিজ্য ঘাটতি দেখা দিলে অথবা বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের তাৎপর্যপূর্ণ অবমূল্যায়ন ঠেকাতে প্রেসিডেন্ট সাময়িক শুল্ক আরোপ করতে পারেন। তবে এই শুল্ক সর্বোচ্চ ১৫০ দিন পর্যন্ত বহাল থাকতে পারে। এরপর তা বাড়াতে কংগ্রেসের পদক্ষেপ প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে, ১৫০ দিন শেষে প্রশাসন নতুন নির্বাহী আদেশে আবার শুল্ক জারি করতে পারবে কি না সেটিও আইনে স্পষ্ট নয়।
ট্রাম্প তাঁর পোস্টে দাবি করেন, বহু দেশ দশকের পর দশক যুক্তরাষ্ট্রকে ঠকিয়েছে এবং তিনি দায়িত্ব নেওয়ার আগে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়নি। তাই আইনগতভাবে পরীক্ষিত ১৫ শতাংশ স্তরেই শুল্ক বাড়ানো হচ্ছে বলে জানান তিনি। তবে সংশোধিত এই ১৫ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হলেও বাস্তবে অনেক দেশের ক্ষেত্রে এটি আগের তুলনায় কম হার নির্দেশ করতে পারে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আগে জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্যদেশ থেকে আমদানিকৃত অধিকাংশ পণ্যের ওপর প্রায় ১৫ শতাংশ শুল্ক কার্যকর ছিল। ফলে তাদের ক্ষেত্রে হার প্রায় একই পর্যায়ে থাকতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার মেক্সিকো, কানাডা ও চীনের ওপর আরোপিত মোট শুল্কহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। একইভাবে ভারত ও ব্রাজিলের মতো বড় অর্থনীতির দেশগুলোর ক্ষেত্রেও শুল্ক কমতে পারে।
এদিকে নতুন এই বৈশ্বিক শুল্ক কার্যকর করার পাশাপাশি মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর আরও কঠোর পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছে। ইউ এস ট্রেড রিপ্রেসেন্টেটিভ জেমিসন গ্রিয়ার জানান, প্রশাসন দ্রুতগতিতে ১৯৭৪ সালের আইনের ৩০১ ধারার অধীনে বেশিরভাগ বড় বাণিজ্য অংশীদার দেশের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করবে। এই তদন্তে যদি দেখা যায় যে কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তির অধিকার লঙ্ঘন করছে বা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যকে অযৌক্তিকভাবে সীমিত বা ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তাহলে ওই ধারার অধীনেও অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সুপ্রিম কোর্টের রায়ে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার সীমা নির্ধারিত হলেও ট্রাম্প প্রশাসন বিকল্প আইনি কাঠামো ব্যবহার করে একই ধরনের নীতি বাস্তবায়নের পথ খুঁজছে। এতে করে বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উচ্চমাত্রার রপ্তানিনির্ভর বাণিজ্যে যুক্ত, তাদের অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে, সমালোচকরা বলছেন, অস্থায়ী শুল্ক আরোপের মাধ্যমে প্রশাসন কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যনীতি নির্ধারণের চেষ্টা করছে কি না তা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হতে পারে। ১৫০ দিনের সীমা শেষ হলে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, কংগ্রেস কী অবস্থান নেবে এবং আন্তর্জাতিক অংশীদাররা কী প্রতিক্রিয়া জানাবে, এসব প্রশ্ন এখনো খোলা রয়ে গেছে।
সব মিলিয়ে, সুপ্রিম কোর্টের রায়, নতুন আইনি ভিত্তিতে ১৫ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক এবং সম্ভাব্য ৩০১ তদন্ত এই তিনটি পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতিকে আবারও বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।