জাতীয় সংসদ ভবন
বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে যাদের বিদেশ থেকে তলব করে দেশের কাজে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল তাদের প্রায় সবাই এবং উপদেষ্টা পরিষদের মধ্যে সবাই নিজেদের বিভাগের কাজকর্ম গুছিয়ে দায়িত্ব ত্যাগের পথে রয়েছেন। সম্ভবত প্রধান উপদেষ্টা, পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব না নেওয়ার আগ পর্যন্ত দায়িত্বে থেকে যেতে পারেন। সরকারের অভ্যন্তরে ওয়াকিবহাল মহল সূত্রে এ প্রতিবেদক জেনেছেন, কার্যত আগামী ১৬ কিংবা ১৭ ফেব্রুয়ারি এ অন্তর্বর্তী সরকার তাদের দায়িত্ব ছেড়ে দেবেন।
সূত্র থেকে জানা গেছে, নির্বাচন কমিশনকে চাপ দিয়ে নেওয়া হয়েছে বিশেষ সুবিধা। ক্ষমতায় যাওয়ার আগে নিজেদের অর্থ আত্মসাৎকারী মহল কিংবা দ্বৈত নাগরিকদের অনেকেই জোর করে মনোনয় বৈধতার জোর জবরদস্তিমূলক কাজ করেছেন। তবে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ যেভাবে নির্বাচনে অন্তর্ভুক্তিকরণের দাবি জানিয়েছিলেন সেভাবে আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এক নতুনত্ব পন্থা দেখা গেছে, অর্থ দিয়ে অন্য দল থেকে নিজেদের বিকল্প প্রার্থীদের দাঁড় করিয়ে দেওয়া। অনেক আওয়ামী লীগপন্থী কোনো কোনো দল থেকে মনোনয়ন পেয়ে আওয়ামী লীগকে সুযোগ করে দিয়েছে। যে দল থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন, সে দলের বিরুদ্ধে কেউ ক্ষোভ রচনা করতে চাইলে তা থামিয়ে দিচ্ছেন। শুধু তাই নয়, একতরফাভাবে সরকার গঠনের জন্য অনেকে মরিয়া হয়ে গেছেন। জুলাই বিপ্লবের অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে যারা রয়েছেন তাদের একদিকে অবমূল্যায়ন যেমন হচ্ছে তেমনি যারা শহীদ হয়েছেন তাদের মূল্যায়ন বেহাত হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় ক্ষমতায় রদবদলের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশ।
সরকারের অন্তর্নিহিত সূত্র থেকে বলা হয়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যেসব সংস্কার করেছে তা বাংলাদেশের মিডিয়াতে যথাযথ প্রতিফলন হয়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সকল সিদ্ধান্তকে নেতিবাচকভাবে উত্থাপন করা ছাড়াও এই সরকারের সিদ্ধান্তসমূহকে বুঝতে পর্যন্ত মিডিয়া ব্যর্থ হয়েছে। এই সরকার স্বল্প সময়ের মধ্যে ভারতের বিকল্প নিরাপত্তা কিভাবে সৃষ্টি করতে হবে তার পথ দেখিয়েছে। যা সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য অত্যন্ত জরুরি। ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনার পতনের পর ভারত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সকল প্রকার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবরোধ সৃষ্টি করে। যেমন খাদ্য রফতানি বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাণিজ্য বন্ধ করে দেওয়া হয়। ভারত থেকে বাংলাদেশ ১৪ বিলিয়ন ডলারের কাঁচা ও অন্যান্য পণ্যসামগ্রী আমদানি করে। বাংলাদেশ থেকে ভারত আমদানি করে ২ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভারত অনেক পণ্যসামগ্রী রফতানি বন্ধ করে দেয়। অন্তর্বর্তী সরকার বাধ্য হয়ে পাকিস্তান, চীন, মালয়েশিয়া থেকে পণ্য আমদানি করে। বিকল্প অর্থনৈতিক পন্থায় যে কৌশল এ সরকার উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশের মিডিয়া তা বুঝতে অক্ষম অথবা তারা কোনোভাবে ভারতের বিরাগভাজন হতে চায়নি। অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্নভাবে যেমন বিচার বিভাগের সচিবালয় স্থাপন, তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণে চীনের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন, তুরস্কের সঙ্গে ড্রোন চুক্তি, চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক চুক্তি, জাপানের সঙ্গে বিশেষ অর্থনৈতিক চুক্তি, পাকিস্তানের সঙ্গে সমন্বয় করে সৌদি আরবের অর্থায়নে পাকিস্তান থেকে কমবেটিভ বিমান ক্রয় চুক্তি, আমেরিকার সঙ্গে স্বল্প ট্যারিফ চুক্তি, বাংলাদেশের জলসীমায় নজরদারি- ইত্যাদির ক্ষেত্রে যেভাবে অগ্রগতি সাধিত হয়েছে, তা নিয়ে বাংলাদেশের মিডিয়া নীরব। অপপ্রচারে লিপ্ত মিডিয়া চলছে সমানে, রাষ্ট্র সম্পর্কে ধারণা নেই অথচ সমানে দিয়ে যাচ্ছে উপদেশ। সাংবাদিকতার জগত আজ মসি দিয়ে সিক্ত নয় যেন মসি অসি হয়ে সরকারকে কর্তন করতে চায়।
আগামী দিনের বাংলাদেশে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের স্বল্প সময়ের অবদান সর্বত্র অনুভূত হবে। চট্টগ্রাম বন্দরের বেহাল অবস্থার সদগতি, আদানির বৈদ্যুতিক চুক্তির বেলাল্লাপনা, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে ভারতের হাতে গচ্ছিত না রেখে স্বাধীন পথচলার দিকনির্দেশনা, শরীফ ওসমান হাদির কণ্ঠস্বরকে বাংলাদেশের আপামর জনগণের মুক্তির দিশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা, বাংলাদেশের শূন্যপ্রায় রিজার্ভকে ভরিয়ে তোলা, অর্থনীতির স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার গৃহীত কার্যকলাপ, প্রবাসীদের ভোটাধিকার কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি আজ লোকমুখের কথা। এই সরকারের আমলে প্রেস ব্রিফিং ছিল। প্রেস অ্যাডভাইস ছিল না। কাজেই বাংলাদেশের মিডিয়াকে আজ হতে হবে দায়িত্বশীল। অযথা সমালোচনা, অন্তর্বর্তীমূলক নির্বাচনের নামে খুনি সরকারকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বিচারের অগ্রগতিকে ফানুসে পরিণত করতে আজ মিডিয়া জগত সোচ্চার। এসবের ইতি না টানলে স্বচ্ছ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
আজ দেখি যেখানে এক সময় বাংলাদেশের মিডিয়া পাকিস্তানের রক্তচক্ষুকে ভয় পায়নি। আজ দেখি মিডিয়ার রতি-মহারথীদের পা কাঁপা বক্তব্য। যে মিডিয়ায় দালালি স্বার্থজনিত। যে মিডিয়া সরকারের ফ্যাসিবাদী চরিত্রকে সমালোচনা না করে সমর্থন করে সে মিডিয়া মিডিয়া নয় তা ‘স্বপ্ন চিকিৎসার প্রচারপত্র’ হতে পারে।
বাংলাদেশকে তা থেকে মুক্ত হতে হবে। ফেব্রুয়ারি মাসের তৃতীয় সপ্তাহের শুরুতেই সম্ভবত নতুন নির্বাচিত সরকারের যাত্রা শুরু হবে যদি ভালোভাবে নির্বাচন সম্ভব হয়। আগামীর ক্ষমতাসীনরা কি করবে তা নিয়ে মহড়ার প্রয়োজন আছে বৈকি? কোনো কোনো মিডিয়াতে প্রচার পাচ্ছে নির্বাচনের পর আরো ৬ মাস এ সরকার থেকে যেতে চায়। বিষয়টা আসলে এ সরকারকে বিপদে ফেলার প্রক্রিয়া। এসব গুজব বলে সরকারিই সূত্র উড়িয়ে দিয়েছে।