০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, বুধবার, ০৫:০০:১৬ অপরাহ্ন


বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের ভিসা স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে ৭৫ ডেমোক্র্যাটের চিঠি
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৪-০২-২০২৬
বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের ভিসা স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে ৭৫ ডেমোক্র্যাটের চিঠি ভিসা স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি ক্রিস্টি নোয়েম ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর কাছে কংগ্রেসম্যানদের পাঠানো একটি যৌথ চিঠি


যুক্তরাষ্ট্রের বৈধ অভিবাসন নীতিকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ তৈরি হয়েছে ওয়াশিংটনে। অবৈধ নয়, বৈধ অভিবাসন ব্যবস্থাকেই ভেঙে দিচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। স্টেট ডিপার্টমেন্টের বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের জন্য অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়াকরণ সাময়িকভাবে স্থগিত করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এবার সরব হয়েছেন হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের ৭৫ জন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা। তারা এই সিদ্ধান্তকে বৈষম্যমূলক, পুরোনো ধ্যানধারণাভিত্তিক এবং অমানবিক অ্যাখ্যা দিয়ে অবিলম্বে তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। ডেমোক্র্যাটদের মতে, এটি শুধু অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন নয়, বরং বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে আসতে চাওয়া লাখো মানুষের স্বপ্ন ও পারিবারিক পুনর্মিলনের পথ রুদ্ধ করে দেওয়ার এক কঠোর রাজনৈতিক পদক্ষেপ।

এই দাবি জানিয়ে কংগ্রেস সদস্যরা গত মঙ্গলবার হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি ক্রিস্টি নোয়েম এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর কাছে একটি যৌথ চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে তারা বলেন, প্রশাসনের এ একতরফা সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অভিবাসন ঐতিহ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, পরিবার কাঠামো ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। নিউইয়র্কের কংগ্রেসম্যান রিচি টরেস ও ইয়েভেট ক্লার্কের যৌথ উদ্যোগে লেখা এই চিঠি মঙ্গলবার জরুরি ভিত্তিতে প্রেরণ করা হয়।

গত সপ্তাহ থেকে কার্যকর হওয়া এই ভিসা স্থগিতাদেশের আওতায় পড়েছে বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ দেশ। অর্থাৎ, বৈশ্বিক পরিসরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দেশের নাগরিক এখন যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের ফলে পরিবারভিত্তিক ভিসা, কর্মসংস্থানভিত্তিক ভিসা, ধর্মীয় কর্মী ভিসা, ডাইভারসিটি ভিসা এবং এমনকি মার্কিন নাগরিকদের নিকটাত্মীয়দের ভিসাও আটকে গেছে। ফলে হাজার হাজার পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে এবং বহু কর্মসংস্থানভিত্তিক আবেদন অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

কংগ্রেসম্যান রিচি টরেস বলেন, বিশ্লেষণে দেখা গেছে এই নীতি আগামী এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ অভিবাসন অর্ধেকে নামিয়ে আনতে পারে। তার ভাষায়, এটি স্পষ্টভাবে দেখায় ট্রাম্প প্রশাসনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী। তারা শুধু অনথিভুক্ত অভিবাসীদের লক্ষ্য করছে না, বরং পুরো বৈধ অভিবাসন ব্যবস্থাকেই ভেঙে ফেলতে চায়। তিনি আরো অভিযোগ করেন, যেসব দেশকে টার্গেট করা হয়েছে সেগুলোর বেশিরভাগই আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের যেখানে মূলত অশ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর বসবাস। এটি কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়, বরং পরিকল্পিত বৈষম্যমূলক নীতি।

চিঠিতে আইনপ্রণেতারা প্রশাসনের কাছে এই সিদ্ধান্তের পূর্ণ ব্যাখ্যা এবং একটি বিস্তারিত কস্ট-বেনিফিট বিশ্লেষণ কংগ্রেসে জমা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তারা প্রশ্ন তুলেছেন, পাবলিক চার্জ বা সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হওয়ার আশঙ্কা দেখিয়ে কেন সব আবেদনকারীর ওপর একযোগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে, যখন বিদ্যমান আইন অনুযায়ী প্রতিটি আবেদনকারীর ক্ষেত্রে পৃথক মূল্যায়নের সুযোগ রয়েছে। তাদের মতে, ব্যক্তিগত যাচাই-বাছাইয়ের বদলে সার্বিক স্থগিতাদেশ জারি করা প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং বৈষম্যমূলক মানসিকতার পরিচায়ক।

প্রশাসন অবশ্য এই সিদ্ধান্তকে জাতীয় স্বার্থের সুরক্ষা হিসেবে তুলে ধরছে। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, এসব দেশের অভিবাসীরা তুলনামূলকভাবে বেশি ‘পাবলিক চার্জ’ হয়ে ওঠেন, অর্থাৎ সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হন। তাই যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের অর্থ সুরক্ষিত রাখতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে ডেমোক্র‍্যাটরা বলছেন, এ ধরনের যুক্তি অতীতে বহুবার ব্যবহার করা হয়েছে এবং প্রায়শই তা বৈষম্যের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

স্টেট ডিপার্টমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ অর্থবছরে এই ৭৫টি দেশ থেকে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার ৬৭১টি অভিবাসী ভিসা ইস্যু করা হয়েছিল। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৮০ হাজার ১৫-এ। আর ২০২৫ অর্থবছরের অক্টোবর থেকে মে মাস পর্যন্ত ইতোমধ্যে ১ লাখ ৮৯ হাজারের বেশি ভিসা ইস্যু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হঠাৎ করে এই প্রক্রিয়া বন্ধ করে দিলে প্রায় অর্ধেক বৈধ অভিবাসন কার্যত স্থগিত হয়ে যাবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার ও জনসংখ্যাগত ভারসাম্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

নিউইয়র্কের আইনপ্রণেতারা বিশেষভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, কারণ তাদের নির্বাচনী এলাকায় এসব দেশের বিপুলসংখ্যক অভিবাসী বসবাস করেন। তারা বলেন, এই সিদ্ধান্ত হাজার হাজার পরিবারকে আলাদা করে দেবে, মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের পুনর্মিলন বিলম্বিত করবে, ছোট ব্যবসা ও উদ্যোক্তাদের ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনগুলোর কার্যক্রম ব্যাহত করবে। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘আমেরিকান ড্রিম’-এর মূল ভিত্তিই হলো অভিবাসন-এ নীতি সেই ভিত্তিকেই দুর্বল করছে।

কংগ্রেসম্যান ইয়েভেট ক্লার্ক বলেন, আমাদের সম্প্রদায়ে যারা বাস করেন, তাদের অনেকেই বছরের পর বছর ধরে বৈধভাবে আবেদন করে অপেক্ষা করছেন। এই সিদ্ধান্ত তাদের প্রতি চরম অবিচার। তিনি আরো বলেন, প্রশাসন টুইটের মাধ্যমে এমন গুরুত্বপূর্ণ নীতির ঘোষণা দিয়েছে, যা শত সহস্র মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলবে। এটি দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয়।

ডেমোক্র‍্যাটদের অভিযোগ, ট্রাম্প প্রশাসন ধীরে ধীরে অভিবাসন ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে কঠোরতা আরোপ করছে। তারা শুধু সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং বৈধ অভিবাসনকেও নিরুৎসাহিত করছে। তাদের মতে, এটি রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয়তা অর্জনের কৌশল হলেও দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও সমাজের ক্ষতি করবে। কারণ প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ, কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় অভিবাসীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অভিবাসন অধিকার কর্মীরা সতর্ক করে বলছেন, এই স্থগিতাদেশের ফলে ভিসা ব্যাকলগ আরো বেড়ে যাবে এবং ভবিষ্যতে প্রশাসনিক চাপ বাড়বে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও প্রভাব পড়তে পারে। কারণ যেসব দেশকে লক্ষ্য করা হয়েছে, তাদের অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মিত্র। আকস্মিক নিষেধাজ্ঞা কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন সৃষ্টি করতে পারে।

সব মিলিয়ে এ ইস্যু এখন কংগ্রেসে বড় রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা বলছেন, প্রশাসন যদি যথাযথ ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে এটি স্পষ্ট বৈষম্যের প্রমাণ হবে। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন এটিকে জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সুরক্ষার অংশ হিসেবে তুলে ধরছে। তবে বাস্তবতা হলো, এই সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রভাব পড়ছে হাজার হাজার পরিবার, শ্রমিক ও স্বপ্নবাজ মানুষের জীবনে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই অভিবাসীদের দেশ হিসেবে পরিচিত। বৈধ অভিবাসনের পথ সংকুচিত হলে তা শুধু মানবিক সংকটই তৈরি করবে না, বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেও বাধাগ্রস্ত করবে। তাই এই নীতির ভবিষ্যৎ কী দাঁড়ায়, তা নির্ধারণ করবে কংগ্রেসের চাপ, আদালতের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ এবং জনমতের প্রতিক্রিয়া।

এই মুহূর্তে ৭৫ জন ডেমোক্র্যাটের চিঠি একটি শক্ত রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে যে অভিবাসন শুধু আইন প্রয়োগের বিষয় নয়, এটি মানবাধিকার, সমতা এবং আমেরিকার মূল্যবোধের প্রশ্ন। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন তাদের দাবি মেনে নীতি পুনর্বিবেচনা করে কি না, নাকি এই স্থগিতাদেশ নিয়ে আরো বড় আইনি ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হয়।

চিঠিটিতে কংগ্রেসের মোট ৭৫ জন সদস্য স্বাক্ষর করেন। তাদের মধ্যে ছিলেন কংগ্রেশনাল এশিয়ান প্যাসিফিক আমেরিকান ককাস (ক্যাপ্যাক) এর চেয়ার গ্রেস মেং, কংগ্রেশনাল ব্ল্যাক ককাসের চেয়ার ইয়েভেট ক্লার্ক, এবং প্রতিনিধি রিচি টরেস, ইয়াসামিন আনসারি, গ্যাব আমো, ওয়েসলি বেল, শন্টেল এম. ব্রাউন, আন্দ্রে কারসন, গ্রেগ কাসার, শন কাস্টেন, ক্যাথি কাস্টর, শীলা শেরফিলাস-ম্যাককরমিক, গিলবার্ট রে সিসনেরোস জুনিয়র, জিম কস্তা, ড্যানি কে ডেভিস, ডেবি ডিঙ্গেল, ডায়ানা ডিগেট, রোজা এল ডিলরো, মার্ক ডি-সোলনিয়ার, ন্যানেট দিয়াজ বারাগান, আদ্রিয়ানো এসপাইয়াত, ভেরোনিকা এসকোবার, ডুইট ইভান্স, সিলভিয়া আর. গার্সিয়া, আল গ্রিন, অ্যাডেলিটা এস. গ্রিহালভা, জিমি গোমেজ, পাবলো হোসে হার্নান্দেজ, জাহানা হেইস, ক্রিসি হুলাহান, এলেনর হোমস নর্টন, রবিন এল. কেলি, জনাথন এল. জ্যাকসন, রাজা কৃষ্ণমূর্তি, সিডনি কামলাগার-ডোভ, জো লফগ্রেন, জর্জ ল্যাটিমার, লা-মোনিকা ম্যাকআইভার, সারা ম্যাকব্রাইড, এপ্রিল ম্যাকক্লেইন ডিলেনি, বেটি ম্যাককলাম, গ্রেগরি ডব্লিউ মিকস, কওয়েসি এমফিউমে, গওয়েন এস মুর, কেভিন মুলিন, জেরোল্ড ন্যাডলার, আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ, চেলি পিংরি, ব্রিটানি পিটারসেন, মার্ক পোকান, আইয়ানা প্রেসলি, জিমি প্যানেটা, সেথ মোল্টন, ডেভিড স্কট, ব্র‍্যাড শেরম্যান, হ্যালি এম স্টিভেন্স, ড্যারেন সোটো, সুহাস সুব্রামানিয়াম, এরিক সোয়ালওয়েল, রাশিদা তালিব, শ্রী থানেদার, ডিনা টাইটাস, লরি ট্রাহান, মার্ক এ ভিসি, হুয়ান ভার্গাস, ডেবি ওয়াসারম্যান শুলৎস, নাইডিয়া এম. ভেলাজকেজ এবং বনি ওয়াটসন কোলম্যান।

শেয়ার করুন