স্পীকারের কাছে পদত্যাগ পত্র জমা দিয়েছেন ফেরদৌস আহমেদ মিষ্টি
কঠোরতায় চমক দেখাচ্ছে বিএনপি। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনায় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ-সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগে বাধ্য করা হলো। এর পাশাপাশি ঢাকা মহানগর উত্তরের প্রেস্টিজিয়াস কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। রাজধানীর মিরপুরে সম্প্রতি রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় প্রতিক্রিয়া সরকারি দল বিএনপি এসব ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে পরবর্তী পদক্ষেপগুলি কেমন হবে বা হতে যাচ্ছে তা দেখার আগে সাধারণ জনগণের প্রশ্ন এমন হার্ড লাইন কতদিন?
কঠোরতার নেপথ্যে...
রাতে বেলায় রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে লুটপাট, ভাঙচুর এবং ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটরের কার্যালয় ভাঙচুরের ঘটনায় বলা চলে জনগণকে স্তম্ভিত করে ফেলে। আরও অবাক করেছে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের একজন সদস্যের পৃষ্ঠপোষকতায় পুলিশের উপস্থিতিতে ক্ষমতাসীন দল শত শত মানুষের সামনে এধরনের ঘটনা ঘটানোর সাহস দেখানোর বিষয়টি। আবার প্রায় একিই সময়ে একটি ঘটনার রেশ না কাটতে ঘটে যায় আরেক ঘটনাকে সবাইকে হতবাক করে দেয়।
এসব ঘটনাগুলো এমন সময় ঘটে যায় যখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের বিভিন্ন ধরনের ইতিবাচক দিক তুলে ধরতে ঘাম ঝরাচ্ছেন। একদিকে যখন তিনি দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও অগ্রাধিকারগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরছেন, ঠিক তখন দেশে তার দলের তথাকথিত বিএনপির সৈনিকদের দ্বারা এধরনের ঘটনাকে পার্টির হাইকমান্ড ভালোভাবে নেয়নি। কমপ্লিটিলি একটি গভীর ষড়যন্ত্র হিসাবেই দেখছেন বলে কারো কারো অভিমত। কেননা বিএনপি দাবি করছে যে নিউইয়র্কের সে-ই সফরে প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব সম্প্রদায়ের সামনে দেশের স্বার্থ ও সম্ভাবনাগুলো দৃঢ়ভাবে তুলে ধরেছেন এবং তিনি দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা সমুন্নত রেখেছেন। এখন দলের নানান ধরনের কথা শোনা যাচ্ছে।
তা না হলে কি আর্ন্তজাতিক অঙ্গনে ইতিবাচক ঘটনাগুলি ধামাচাপা দিতেই কারো গুপ্ত পরিকল্পনায় বিএনপির নেতাকর্মীরা জড়িয়ে পড়লো? কেউ কি তাহলে সরকারের ইতিবাচক সময়ে চাঁদাবাজি আর দখলদাররা ওই ঘটনাগুলো কারো ইশারায় সামনে নিয়ে আসতে তৎপর ছিল? না-কি কারো নিশানার শিকার হয়েছেন রাতের বেলা চাঁদাবাজি দখলে লিপ্ত থাকা এসব নেতাকর্মী?
অন্যদিকে এমনিতেই রাজনৈতিক দলের মাঠের কর্মসূচিতে বিএনপি বিব্রতকর পরিস্থিতিতে আছে। কেননা জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের মতো জনদাবি তুলে ধরে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন বিভাগভিত্তিক লংমার্চ ও বড় রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করছে। দলের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, এসব স্পর্শকাতর বিষয়গুলোকে সামনে রেখে বিএনপি হাইকমান্ড দলের চাঁদাবাজ-দখলদার মব সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে হার্ড লাইনে যেতে চড়াও হয়েছে। একারণে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশন শেষে প্রধানমন্ত্রী ২৭ সেপ্টেম্বর দেশে ফিরেই এই ব্যবস্থা নিতে তৎপর হন।
তারপরেও উল্টা চিত্র
রাজধানীর এই ঘটনায় যখন বিএনপি হার্ড লাইন চলমান। অন্যদিকে গত ১ অক্টোবর বৃহস্পতিবার ফেনীতে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, সরকার সর্বশক্তি দিয়ে সবার জন্য আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করবে। দেশের জনগণ বিএনপি সরকারের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করেছে। পূর্ববর্তী ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার ধ্বংস করা আইনের শাসন পর্যায়ক্রমে প্রতিষ্ঠা করা হবে। কিন্তু তিনি যখন এই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন তখন দেখা গেলো উল্টো চিত্র। ঠিক ওইদিনই রাজধানীর বাংলামোটরের একটি গলিতে সন্ধ্যায় যুবদলের বহিষ্কৃত নেতা বহিষ্কৃত যুবদল নেতা ফেরদৌস আহমেদ সায়মন আগ্নেয়াস্ত্রের আঘাতে মো. সোহান (৩৫) নামের একজন ওষুধ ব্যবসায়ী আহত হয়েছেন। তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। বাংলামোটর এলাকায় সোহানের ওষুধের দোকান রয়েছে। তাঁর ওপর হামলায় ক্ষুব্ধ ওই এলাকার বাসিন্দারা বাংলামোটরের রূপায়ণ টাওয়ারের উত্তর দিকের গলিতে জমায়েত হয়ে ঘটনার প্রতিবাদ জানান এবং হামলাকারীর সন্ত্রাসী কর্মকান্ড নিয়ে কথা বলেন। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গলো এ-ই যুবদল নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজি কর্মকান্ডে জড়িত অভিযোগে হাতিরঝিল থানা যুবদলের আহ্বায়কের পদ থেকে তাঁকে আগেই বহিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু বহিস্কারের পরও এলাকায় তার দাপট কমেনি। বরং শোনা যায় যে বহিষ্কৃত যুবদল নেতা ফেরদৌস দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় চাঁদাবাজি করছেন। এমন জনতার রোশানলে পড়ে পুলিশ আটক করলেও তাকে গ্রেফতার করতে বিব্রত বোধ করে।
আসলেই কি চমক?
শৃঙ্খলাভঙ্গের জোরালো অভিযোগে সম্প্রতি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি, উত্তর যুবদল এবং পশ্চিম ছাত্রদলের মতো গুরুত্বপূর্ণ বড় ৩টি কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। দলের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকান্ড যেমন-দখল, চাঁদাবাজি, জমি বা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, সন্ত্রাস সৃষ্টি কিংবা সাধারণ মানুষকে হয়রানি করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়ার পর এই ব্যবস্থাগুলো নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে বিএনপির হাইকমান্ড স্পষ্ট করেছে যে, অন্যায়ের ক্ষেত্রে শুধু সাংগঠনিক ব্যবস্থাই শেষ নয়; অপরাধ প্রমাণ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পুলিশকেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে লুটপাট, ভাঙচুর এবং ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটরের কার্যালয় ভাঙচুরের ঘটনার ব্যাপারে একটু সময় নিয়ে কঠোরতা দেখালোও অনেকে একে ইতিবাচক মনে করছেন। কেননা গত কয়েকদিনে সাধারণ জনগণের একধরনের হতাশা ক্ষোভ কাজ করছিল। তা হলো এতো ত্যাগ তিতিক্ষার পরে ক্ষমতায় বসে কি করে দেশ চালাচ্ছে বিএনপি সরকার। তবে এখনো কারো আশঙ্কা দেখা দিয়েছে দলটির এধরনের কঠোর পদক্ষেপ আসলে ঠিক-ঠাকভাবে চলবে তো? না-কি দলটি আসলে বহিষ্কার কিংবা মুচলেকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? তা না হলে এতো কঠোর পদক্ষেপের মধ্যে দেখা গে-লো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলার অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। এতে চার সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। কিন্তু এই ধরনের ঘটনায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) কর্মরত সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের তিন নেতাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই সাথে সংগঠনের আরও ছয় নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ৫ অক্টোবর সোমবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মামলা করলেও এজাহারে অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতাদের নাম নেই। কারো কারো মতে, এক্ষেত্রে সরকার সর্বশক্তি দিয়ে সবার জন্য আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিতের খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আশ্বাসকে বিতর্কিত করা হচ্ছে না? প্রশ্ন কেনোই-বা তাহলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় শহীদ জিয়াউর রহমান হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মাহবুবুর রহমানকে ইতোমধ্যে পদ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে অব্যাহতি দেওয়া হয়। কেনো শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রদলের হামলার পর, হামলাকারীদের বাঁচাতে হলের সিসিটিভি ফুটেজ ডিলিট বা মুছে ফেলার একটি গুরুতর অভিযোগ ওঠে সংশ্লিষ্ট প্রাধ্যক্ষের বিরুদ্ধে? এখানে প্রাধ্যক্ষের ওপর কি কোনো ভয়-ভীতি প্রশাসনের চাপ কাজ করেছে?
উল্টো চিত্রের আরও নমুনা..
এদিকে আবার দেখা গেছে, রাজধানীর দক্ষিণখানে চাঁদা না পেয়ে ব্যবসায়ীর ওপর নির্মম নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে এক স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার বিরুদ্ধে। ঘটনার বিবরণে দেখা যায়, দিনদুপুরে প্রকাশ্যে রড দিয়ে পিটিয়ে ও ধারালো চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে নৃশংসভাবে আহত করা হয়। তাকে বাঁচাতে তার বোনরা এগিয়ে এলে তাদের ওপরও চড়াও হয়ে পোশাক ছিঁড়ে শ্লীলতাহানি করে হামলাকারীরা। একপর্যায়ে রক্তাক্ত ব্যবসায়ীকে মৃত ভেবে ফেলে যায়। ১৪ সেপ্টেম্বর ঘটনার পর থেকে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী সুমন হাসান মুমূর্ষু অবস্থায় চিকিৎসাধীন। তবে অন্যদিকে ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক এসএ খোকনসহ অভিযুক্ত হামলাকারীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বলে শোনা যায়। আর এজন্যই প্রশ্ন রয়েছে বিএনপির হাইকমান্ডের এমন হার্ড লাইন কি শুধু বহিষ্কার আর মুচলেকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে কি-না? কেননা ইতোমধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ঘটনায় আটকের পর বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীদের মুচলেকা দিয়ে থানা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজত থেকে ছেড়ে দেওয়ার কিছু ঘটনা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি গণমাধ্যমে এসেছে। অন্যদিকে মুচলেকার পর ছেড়ে দেওয়ার পাশাপাশি দল থেকে বহিষ্কারের পরেও বিএনপির নামে তথাকথিত এক শ্রেণীর নেতাকর্মীদের দ্বারা সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির মতো ঘটনা থামানো যাচ্ছেই না। কেন্দ্রীয়ভাবে এসব বহিষ্কৃতরা এলাকায় দলের বড়ো ভাইদের দয়ায় বহাল তবিয়তে চাঁদাবাজি দখল কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে.. বলে এলাকায় এলাকায় অভিযোগের পাহাড়। কারো কারো অভিমত বহিষ্কৃতদের শুধু দল থেকে বহিষ্কারই নয়, এর পাশাপাশি কঠোর আইনী পদক্ষেপ না নেওয়া হলে শুধু মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দিয়ে জনগণের মধ্যে আস্থা তৈরি হবে না। অন্যদিকে দেশে বিএনপির নেতাকর্মী পরিচয় দেওয়া এসব তথাকথিত নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজি দখলবাজি বন্ধ হবে না বলে অনেকে মনে করেন।