০১ অক্টোবর ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ০৩:৩৫:১২ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
নর’ইস্টারের তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড নিউইয়র্কসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিউইয়র্কবাসীর ৬০ শতাংশ মামদানির পক্ষে অবৈধ জুয়ার অভিযোগে পলিমার্কেটের বিরুদ্ধে নিউইয়র্কের মামলা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকানদের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই মার্কিন সিনেটে প্রথম মুসলিম সদস্য হওয়ার লড়াইয়ে আবদুল এল-সাইয়েদ নিউইয়র্কে স্থায়ী ‘জবস এনওয়াইসি’ কেন্দ্র চালু দ্বিতীয় বাড়ির কর নিয়ে মামদানির উদ্যোগে আদালতের বাধা লোয়ার ম্যানহাটনে প্রায় ১ হাজার নতুন সাশ্রয়ী ইউনিট নির্মাণের পরিকল্পনা তৃতীয় দেশে নির্বাসনের পথ ফের খুলে দিল সুপ্রিম কোর্ট বৈদেশিক সম্পর্ক উন্নয়নে প্রাণান্ত চেষ্টায় তারেক রহমান


জনপ্রতিনিধিদের প্রতি আস্থাহীনতাই গ্রাম আদালতের চ্যালেঞ্জ
বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট করা হয়েছে : ৩০-০৯-২০২৬
জনপ্রতিনিধিদের প্রতি আস্থাহীনতাই গ্রাম আদালতের চ্যালেঞ্জ সভায় উপস্থিত নেতৃবৃন্দ


জনপ্রতিনিধিদের সম্পর্কে আস্থাহীনতার অভিয়োগই গ্রাম আদালতের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এই ধরনের বড়ো প্রতিবন্ধকতার কারণে গ্রাম আদালত সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারছে না। আর এর ফলে উচ্চ আদালতের মামলার জট বাড়ছে। তাই জনপ্রতিনিধিদের প্রতি আস্থাহীনতা এবং জনগণের মধ্যে গ্রাম আদালত সম্পর্কে সচেতনতার বাড়ানোর বিকল্প নেই। 

এসব বক্তব্য উঠে আসে যশোর জেলায় গ্রাম আদালত কার্যক্রম সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরিতে প্রচার প্রচারণা কার্যক্রম পরিচালনায় স্থানীয় অংশীজনদের সাথে সমন্বয় সভায়। দাতা সংস্থা ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও ইউএনডিপি এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের আওতায় স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক বাস্তবায়িত বাংলাদেশে গ্রাম সক্রিয়করণ তৃতীয় পর্যায় প্রকল্পের মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালতকে সক্রিয় করার লক্ষ্যে জেলা প্রশাসন ২৯ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার এই সভার আয়োজন করে। জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। 

সমন্বয় সভায় সভাপতি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকারের উপ-পরিচালক মোঃ রফিকুল হাসান। সভার শুরুতে তিনি বলেন, গ্রাম আদালত সক্রিয় হলে স্থানীয় বিরোধ স্থানীয়ভাবে নিষ্পত্তি হবে এবং উচ্চ আদালতের মামলার জট কমে আসবে। তবে দুইটি বড় প্রতিবন্ধকতা লক্ষ্য করা যায়। তার একটি হলো জনপ্রতিনিধিদের প্রতি আস্থহীনতা এভং জনগণের মধ্যে গ্রাম আদালত সম্পর্কে সচেতনতার অভাব। মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রচারণা বৃদ্ধির জন্যই এই সমন্বয় সভা আযোজন করা হয়। এখানে গ্রাম আদালতের অগ্রগতির তথ্য শেয়ার করা হবে এবং গ্রাম আদালত সম্পর্কে প্রচারণা বৃদ্ধিতে আপনাদের মূল্যবান মতামত ও পরামর্শ তুলে ধরবেন। 

সভায় বাংলাদেশে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ (৩য় পর্যায়) প্রকল্পের ডিস্ট্রিক্ট ম্যানেজার এ্যাড. মহিতোষ কুমার রায় প্রকল্প পরিচিতি, সভার উদ্দেশ্য, গ্রাম আদালত বিষয়ে প্রচার-প্রচারণায় অংশগ্রহণকারীদের করণীয়, গ্রাম আদালত আইন এবং প্রকল্পের অগ্রগতি বিষয়ে সেসন উপস্থাপনা করেন। 

সভার উন্মুক্ত আলোচনা পর্বে উপপরিচালক, যুব উন্নয়ণ অধিদপ্তর, যশোর বলেন, আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে প্রতিশোধমুলক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ প্রতিপক্ষকে জেল খাটানোর জন্য থানায় মামলা করতে বেশি আগ্রহী। অন্যদিকে জনপ্রতিনিধিদের সম্পর্কে একটি আস্থাহীনতার অভিয়োগ পাওয়া যায় যা গ্রাম আদালতের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। তবে গ্রাম আদালতের বিচারের সুবিধাগুলো যদি মানুষকে বুঝানো যায় তাহলে মানুষ থানা বা কোর্টে যাবে না বরং গ্রাম আদালতে আসবে। জনপ্রতিনিধিদের নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে। গ্রাম আদালতের প্রচারণা অব্যাহত রাখতে হবে। 

যশোর সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট মোঃ আকরাম হোসেন বলেন, গ্রাম আদালত অত্যন্ত কার্যকর একটি বিচার ব্যবস্থা। ইতোমধ্যে গ্রাম আদালতের সফলতার বিষয় উল্লেখ করে জাতীয় পত্রিকায় বেশ কয়েকটি রিপোর্ট করা হয়েছে। তবে একটা বড় প্রতিবন্ধকতা আছে সেটি হলো স্থানীয় দালালদের দৌরাত্ম্যের কারণে অনেক বিরোধ গ্রাম আদালতে না গিয়ে থানায় বা আদালতে চলে যায়। এক্ষেত্রে থানা পুলিশকে গ্রাম আদালতের গুরুত্ব ভালোভাবে বুঝাতে হবে। গ্রাম আদালত সম্পর্কে ব্যাপকভাবে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। 

যশোর প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এবং সিনিয়র রিপোর্টার ও জেলা প্রতিনিধি, দৈনিক মানব জমিন, যশোর মোঃ নুর ইসলাম বলেন, আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের কারণে মনে হয় গ্রাম আদালতের গতিটা একটু কমে গেছে। পাশাপাশি থানায় গ্রাম আদালতের এখতিয়ারভুক্ত মামলা দায়ের হচ্ছে। এ বিষয়ে পুলিশ বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসন কর্তৃক কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের পরামর্শ প্রদান করেন। 

রাইটস যশোরের নির্বাহী পরিচালক বলেন, গ্রাম আদালত প্রকল্পটি অত্যন্ত চমৎকার একটি প্রকল্প। প্রকল্পের ফেইজ আউট হওয়ার পূর্বে জেলা উপজেলা পর্যায়ে দক্ষ প্রশিক্ষক তৈরি করা যাতে তারা নতুন জনপ্রতিনিধিদের প্রশিক্ষিত করতে পারে। আর আমাদের কর্মসূচির মধ্যে গ্রাম আদালতের প্রচারণা চলমান আছে এবং এটা অব্যাহত থাকবে। 

ব্র্যাক এর জেলা প্রতিনিধি মোঃ আল আমিন বলেন, আমরা আমাদের বিভিন্ন প্রোগ্রামে গ্রাম আদালত বিষয়ে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছি। তবে এই তথ্যগুলো গ্রাম আদালতের প্রচার-প্র্রচারণা গ্রুপে শেয়ার করা হচ্ছে না। এখন থেকে গ্রাম আদালতের প্রচার-প্রচারণা কার্যক্রমের তথ্য হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে শেয়ার করা হবে। 

পুলিশ সুপারের প্রতিনিধি পুলিশ পরিদর্শক রোকসানা বেগম বলেন, আদালত থেকে কোন মামলা যখন গ্রাম আদালতে স্থানান্তর করা হয়, তখন বাদী পক্ষ গ্রাম আদালতে যেতে অনাগ্রহ প্রকাশ করে। জনপ্রতিনিধিদের প্রতি আস্থার সংকট থেকেই এ রকম আচরণ করে। সুতরাং গ্রাম আদালত পরিচালানায় জনপ্রতিনিধিদের আস্থা নিশ্চিত করতে হবে। জনগণের মধ্যে গ্রাম আদালত সম্পর্কে প্রচারণা বৃদ্ধি করতে হবে। 

বেসরকারী সংস্থা দলিত এর প্রতিনিধি বলেন, আমরা সমাজের পিছিয়ে পড়া জনাগোষ্ঠীর নিয়ে কাজ করছি। তাদের সাথে উঠান বৈঠক করার সময় গ্রাম আদালত বিষয়ে প্রচারনা করা হয় এবং এটা অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি যদি কোন বিরোধ ঘটে তাদেরকে গ্রাম আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হবে। 

বেসরকারী সংস্থা অর্পন মানব কল্যাণ সংস্থার প্রতিনিধি বলেন, আমরা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের নিয়ে কাজ করি। তারা মুলত তাদের সমস্যা নিয়ে সরচরাচর বাইরে আসতে চান না বা আমাদের সমাজও সেটা ভালো চোখে দেখেন না। আমি এখান থেকে গ্রাম আদালত বিষয়ে জানলাম, এগুলো সকলের মাঝে প্রচার করব এবং কোন বিরোধ ঘটলে গ্রাম আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দিব। 

এদিকে সভায় বলা হয়, প্রকল্প শুরুর পর ফেব্রুয়ারি ২০২৪ থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত যশোর জেলায় গ্রাম আদালতে মামলা দায়ের হয় ৭৬৯০ টি (তবে পূর্বের অপেক্ষমান ১২৪ টিসহ সর্বমোট মামলা ৭৮১৪ টি)। দাযেরকৃত মামলার মধ্যে সরাসরি ইউনিয়ন পরিষদে দায়ের হয় ৬৯৭৫ টি এবং জেলা আদালত থেকে পাঠানো হয় ৭১৫ টি। দায়েরকতৃ মামলার মধ্যে দেওয়ানি ৪২৪১ টি ও ফৌজদারি ৩৪৪৯ টি। এর মধ্যে আবেদনকারী পুরুষ ৪৯১৩ (৬৩.৮৯%) এবং নারী ২৭৭৭ (৩৬.১১%) জন। নিষ্পত্তিকৃত মামলার সংখ্যা ৭৭৪৩ টি (১০০.৬৯%)। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়েছে ৭২১০ টি মামলার। মোট ক্ষতিপূরণ আদায় ১৪,৬০,৯১,৩৪০/- (চৌদ্দ কোটি ষাট লক্ষ একানব্বই হাজার তিনশত চল্লিশ) টাকা যা ক্ষতিগ্রস্থ’ পক্ষকে দেওয়া হয়েছে। গ্রাম আদালতে গড়ে একটি মামলা নিস্পত্তি হতে ১০ দিন সময় লাগে।

শেয়ার করুন