নবী মুসা (আ.)-এর মাজার
জেরুজালেমের সকালগুলো অন্যরকম। ফজরের পর শহরটা যেন কিছুক্ষণ নিঃশ্বাস বন্ধ করে থাকে, তারপর ধীরে ধীরে জেগে ওঠে। প্রথমে রুটির দোকানের চুল্লি জ্বলে, তারপর দূরে গির্জার ঘণ্টা, রাস্তায় ফেরিওয়ালার ডাক, ‘কাক! কাক!’ তিল ছড়ানো লম্বাটে রুটি, জেরুজালেমের সকালের পরিচয়। পূর্ব জেরুজালেমের শেখ জাররাহ এলাকায় অ্যাম্বাসাডর হোটেলের জানালা থেকে দেখা যাচ্ছিল পাহাড়ের ঢাল, জলপাই গাছ, আর দূরে জৈতুন পাহাড়, মানে মাউন্ট অব অলিভস। তার ওপারে, পূর্বদিকে, যেখানে আজ যাব, সেখানে পাহাড় ধাপে ধাপে নেমে গেছে এক গভীর উপত্যকায়, পৃথিবীর সবচেয়ে নিচু জনপদের দিকে।
নাস্তার টেবিলে উঠলোাফেল, হুমুস, জলপাই, তাজা কাক আর জাআতার। সঙ্গে পুদিনা পাতা ভাসানো চা। জানালা দিয়ে সকালের রোদ এসে পড়েছে সাদা টেবিলক্লথে।
সাড়ে ৭টায় লবিতে এলাম। সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালো এক যুবক। বয়স ত্রিশের কোঠায়, রোদে পোড়া তামাটে মুখ, ছোট করে ছাঁটা দাড়ি, চোখে সানগ্লাস মাথার ওপর তুলে রাখা। পরনে খাকি প্যান্ট আর হালকা নীল শার্ট। হাসিটা খোলা, উষ্ণ, মরুভূমির রোদের মতো।
আসসালামু আলাইকুম, আহলান ওয়া সাহলান!
সে হাত বাড়িয়ে দিলো। আমার নাম ওমর। ওমর আল-আরিহাওয়ি। আরিহাওয়ি মানে জেরিকোর মানুষ। আমাদের ভাষায় জেরিকোকে বলে আরিহা।
ওয়ালাইকুম আসসালাম। আরিহা... নামটার মানে কী?
অনেকে বলেন এসেছে ‘রিহ’ থেকে, মানে সুগন্ধ। কেউ বলেন, প্রাচীন কেনানীয় চন্দ্রদেবতা ‘ইয়ারিখ’ থেকে। আমার দাদা বলতেন, দুটোই ঠিক। জেরিকোর রাতের চাঁদ আর দিনের ফুলের সুগন্ধ, দুটোই পৃথিবীতে অতুলনীয়। সে হাসলো। বললো, চলুন, আজ আপনাকে দেখাব এমন এক শহর, যেখানে মানুষ দশ হাজার বছরেরও বেশি আগে থেকে ঘর বাঁধছে।
গাড়ি চলল পূর্বদিকে। প্রথমে জেরুজালেমের পাথরের বাড়ি, সরু রাস্তা, তারপর জৈতুন পাহাড়ের পাশ দিয়ে ঘুরে পেছনে পড়ে গেল আল-আকসার সোনালি গম্বুজ। আমি ঘাড় ফিরিয়ে যতক্ষণ দেখা যায় তাকিয়ে রইলাম। জেরুজালেম থেকে জেরিকো মাত্র চল্লিশ কিলোমিটারের মতো, ওমর বললো। কিন্তু এই অল্প পথে আমরা প্রায় ১২০০ মিটার নিচে নামবো। জেরুজালেম সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮০০ মিটার উঁচুতে। আর জেরিকো সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রায় ২৫০ মিটার নিচে। পৃথিবীর সবচেয়ে নিচু শহর।
সমুদ্রের নিচে শহর!
কান দুটো একটু খেয়াল রাখবেন, সে চোখ টিপলো। বিমানের মতো তালা লাগতে পারে। শহর পেরোতেই দৃশ্য পাল্টে গেল। সবুজ হারিয়ে গেল হঠাৎ, যেন কেউ ছবির রঙ মুছে দিয়েছে। সামনে জুডিয়ান মরুভূমি। হলুদ, বাদামি, ধূসর পাহাড়ের ঢেউ, একটার পর একটা, দিগন্ত পর্যন্ত। পাহাড়ের গায়ে বাতাস আর বৃষ্টির হাজার বছরের আঁচড়, ভাঁজে ভাঁজে ছায়া।
এই মরুভূমিতে হজরত ঈসা (আ.) ৪০ দিন নির্জনে ছিলেন বলে খ্রিস্টানরা বিশ্বাস করে, ওমর বললো। আর বহু শতাব্দী ধরে সন্ন্যাসী, দরবেশ, সাধকেরা এখানে আসতেন আল্লাহকে খুঁজতে। নীরবতা এখানে এতো গভীর যে নিজের হৃদস্পন্দন শোনা যায়। রাস্তার ডানদিকে পাহাড়ের চূড়া জুড়ে সারি সারি লাল টালির ছাদ, উঁচু দেয়াল, সবুজ বাগান, যা চারপাশের মরুভূমির সঙ্গে একেবারেই বেমানান।
মা’আলে আদুমিম, ওমর বললো, গলাটা একটু বদলে গেল। পশ্চিম তীরে ইহুদিদের সবচেয়ে বড় বসতিগুলোর একটা। প্রায় ৪০ হাজার মানুষ থাকে। ওদের বাগানে পানির অভাব নেই, সুইমিং পুল আছে। আর এই পাহাড়ের নিচে যারা হাজার বছর ধরে আছে, তাদের অনেকের পানির ট্যাংকার কিনে খেতে হয়। কয়েক কিলোমিটার পর রাস্তার ধারে পাহাড়ের ঢালে চোখে পড়লো কয়েকটা টিনের ছাপরা, ত্রিপল টানানো তাঁবু, পাশে কয়েকটা ছাগল-ভেড়া, আর একটা গাধা ছায়ায় দাঁড়িয়ে।
জাহালিন বেদুইন, ওমর বললো। ১৯৪৮ সালের পর নেগেভ মরুভূমি থেকে উচ্ছেদ হয়ে এসে এখানে বসতি গড়েছিল। এদের একটা গ্রাম আছে, খান আল-আহমার। বছরের পর বছর ধরে সেটা ভেঙে ফেলার আদেশ ঝুলছে। কারণ এই পুরো এলাকাকে ইসরায়েল ‘এরিয়া সি’ বলে, যেখানে ফিলিস্তিনিদের নির্মাণের অনুমতি প্রায় পাওয়াই যায় না। অনুমতি ছাড়া বানালে ভাঙা হয়। জাতিসংঘ আর বহু দেশ এর প্রতিবাদ করেছে। ওখানে একটা স্কুল আছে, টায়ার আর কাদা দিয়ে বানানো। সেটার জন্যও মামলা চলেছে।
টায়ার দিয়ে স্কুল?
হ্যাঁ, পাকা দেয়াল বানানোর অনুমতি নেই, তাই। বাচ্চারা তবু পড়ে। আমার এক বন্ধু সেখানে কিছুদিন পড়িয়েছিল। বলত, ওই বাচ্চাদের চোখে যে আলো, সেটা কোন বুলডোজার নেভাতে পারবে না। একটা ছোট্ট মেয়ে ছাগল চরাচ্ছিল রাস্তার ধারে। আমাদের গাড়ি দেখে হাত নাড়লো। আমিও নাড়লোাম। তার লাল ওড়না মরুভূমির হলুদে একফোঁটা আগুনের মতো জ্বলছিল। তারপর রাস্তার ধারে একটা বোর্ড, তাতে লেখা ‘সমুদ্রপৃষ্ঠ’, পাশে একটা উট দাঁড়িয়ে আছে, মালিক পর্যটকদের ছবি তোলার জন্য অপেক্ষা করছে।
এখান থেকে আমরা সমুদ্রের নিচে ঢুকছি, ওমর ঘোষণা করলো। মূল রাস্তা ছেড়ে ওমর একটা সরু পাহাড়ি পথে গাড়ি ঢোকাল। কয়েক মিনিট পর একটা পাহাড়ের কিনারায় থামলো।
নামুন। একটা জিনিস দেখাই। কিনারায় দাঁড়াতেই মাথা ঘুরে গেল। নিচে গভীর এক গিরিখাত, ওয়াদি কেল্ট। দু’পাশে খাড়া পাথরের দেয়াল। আর উল্টো দিকের পাহাড়ের গায়ে, যেন আঠা দিয়ে লাগানো, ঝুলে আছে একটা মঠ। সাদা আর নীল দেয়াল, গম্বুজ, খিলান, ঠিক পাথরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে।
সেন্ট জর্জ মঠ, ওমর বললো। পঞ্চম শতকে সন্ন্যাসীরা এখানে গুহায় থাকতে শুরু করেন। পরে মঠ বানানো হয়। পারস্যের আক্রমণে ধ্বংস হয়, ক্রুসেডাররা মেরামত করে, আবার পরিত্যক্ত হয়, তারপর ঊনিশ শতকে গ্রিক অর্থোডক্সরা নতুন করে গড়ে তোলে। এখনো কয়েকজন সন্ন্যাসী থাকেন। গিরিখাতের তলায় একটা সরু সবুজ রেখা, খেজুর গাছ আর ঝোপ।
ওখানে পানি আছে, ওমর বললো। প্রাচীন রোমান যুগের একটা জলনালির অবশেষও আছে এই উপত্যকায়। রাজা হেরোদ এই পানি জেরিকোর প্রাসাদে নিয়ে যেতেন। আর এই পথটাই ছিল জেরুজালেম থেকে জেরিকোর প্রাচীন রাস্তা। বাইবেলের সেই বিখ্যাত ‘দয়ালু সামারিটানের’ গল্প এই পথের ওপরেই। একজন পথিক ডাকাতের হাতে আহত হয়ে পড়ে ছিল, অনেকে পাশ কাটিয়ে গেল, শুধু একজন অচেনা মানুষ থেমে তার সেবা করলো।
দুই হাজার বছর আগের গল্প, কিন্তু আজও কত প্রাসঙ্গিক। আমি বললাম। ওমর মাথা নাড়লো। আমি প্রায়ই ভাবি, আজকের দুনিয়া আমাদের পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে, কিন্তু থামছেনা। আবার মূল রাস্তা। মরুভূমি ঢালু হয়ে নামতে লাগলো। তারপর হঠাৎ, যেন জাদুর মত, সামনে ভেসে উঠলো সবুজ। বিশাল এক মরূদ্যান। সারি সারি খেজুর গাছ, তাদের পাতার ঝালর বাতাসে দুলছে। কলা বাগান, কমলা আর লেবুর গাছ, বোগেনভিলিয়ার গোলাপি ঝাড় দেয়াল বেয়ে উঠেছে। আর দূরে, পূর্বদিকে, একটা ঝাপসা নীল রেখা। তার ওপারে আবার পাহাড়, বেগুনি রঙের।
ওই যে নীল রেখা, এটা মৃত সাগর,ওমর বললো। আর ওপারের পাহাড়গুলো জর্ডান। ওখানেই মাউন্ট নেবো, যেখান থেকে হজরত মুসা (আ.) প্রতিশ্রুত ভূমি দেখেছিলেন বলে বাইবেলে আছে। আর ডানদিকে, সবুজের ওই সরু রেখা, জর্ডান নদী।
গাড়ির জানালা খুলতেই গরম বাতাসের ঝাপটা। কিন্তু তাতে মিশে আছে কমলা ফুল আর পাকা খেজুরের মিষ্টি গন্ধ। এখন বুঝলেন কেন নাম আরিহা? ওমর হাসলো।‘সুগন্ধ’। তাওরাতে জেরিকোকে বলা হয়েছে ‘খেজুর গাছের নগরী’। এখানকার মাজহুল খেজুর আজ পৃথিবীর সেরা খেজুরগুলোর একটা। শীতকালেও এখানে উষ্ণ। তাই প্রাচীনকাল থেকে রাজারা শীতকালীন প্রাসাদ বানাতেন এখানে। হেরোদের প্রাসাদ, উমাইয়া খলিফার প্রাসাদ, সব এখানে। আর ক্লিওপেট্রা পর্যন্ত একসময় জেরিকোর বাগানের মালিক হয়েছিলেন, মার্ক অ্যান্টনির উপহার হিসেবে।
শহরে ঢুকলাম। নিচু বাড়ি, চওড়া রাস্তা, রাস্তার ধারে ফলের দোকানে পাহাড়ের মতো সাজানো কলা, কমলা, খেজুর। মোড়ে একটা বিশাল খেজুর গাছের ভাস্কর্য।
শহরে ঢোকার আগে আরো একটা জিনিস চোখে পড়েছিল। একটা হলুদ লোহার গেট, পাশে কংক্রিটের ব্লক। জেরিকো শহরটা এরিয়া এ, মানে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অধীনে, ওমর বললো। ১৯৯৪ সালে অসলো প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গাজার পাশাপাশি জেরিকোই ছিল প্রথম শহর, যেখানে ফিলিস্তিনি স্বশাসন শুরু হয়। কী আশা ছিল তখন! আমার বাবা বলতেন, মানুষ রাস্তায় নেচেছিল। ভেবেছিল, এটা শুরু, কয়েক বছরে স্বাধীন রাষ্ট্র হবে।
তারপর?
তারপর শহরটা হয়ে গেল একটা দ্বীপ। চারপাশে এরিয়া সি। জর্ডান উপত্যকার বেশিরভাগ জমি ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে, সেখানে বসতি আর সামরিক এলাকা। শহরে ঢোকা-বেরোনোর পথে চেকপয়েন্ট। অস্থির সময়ে গেট বন্ধ হয়, শহর ঘিরে ফেলা হয়। কৃষকরা নিজের জমিতে যেতে পারে না। প্রথম গন্তব্য শহরের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে। একটা বিশাল মাটির ঢিবি, দেখতে সাধারণ পাহাড়ের মতো। কিন্তু কাছে যেতেই দেখা গেল, ঢিবির গায়ে গভীর খাদ কাটা, তাতে স্তরে স্তরে মাটি, পাথর, দেয়ালের অবশেষ। ”তেল আস-সুলতান,” ওমর বললো, আর তার গলায় একধরনের শ্রদ্ধা। প্রাচীন জেরিকো। ২০২৩ সালে ইউনেস্কো এটাকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় তুলেছে।
বিস্তারিত : https://deshusa.com/m/50742/6abd2e3a5c1e7