১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ০৫:০৩:১৯ অপরাহ্ন
শিরোনাম :


গঙ্গা চুক্তি নিয়ে সরকারের তৎপরতা চোখে পড়ছে না
সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ
  • আপডেট করা হয়েছে : ১০-০৯-২০২৬
গঙ্গা চুক্তি নিয়ে সরকারের তৎপরতা চোখে পড়ছে না বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় পতাকা


গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি এই চুক্তিটি মেয়াদ শেষ হওয়ায় মেয়াদ বাড়ানোর বিষয় নিয়ে জোড়ালো কূটনৈতিক তৎপরতা নেই। কিংবা নতুন চুক্তি করার ক্ষেত্রে কোনো ধরণের সরকারের কোনো মন্ত্রণালয়ের দৌড়ঝাপ নেই। এসব তথ্য জানা গেছে মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে। 

১৯৯৬ সালে ভারতের নয়া দিল্লিতে ১২ ডিসেম্বর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবে গৌড়া এবং বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর এর মেয়াদ শেষ হবে। পশ্চিমবঙ্গের ফারাক্কা ব্যারেজে উপলব্ধ পানির প্রবাহের ওপর ভিত্তি করে এই পানি বণ্টন নির্ধারিত হয়। শুষ্ক মৌসুম অথ্যাৎ প্রতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে ১০ দিন মেয়াদী চক্রে পানি বন্টন করা হয়।

অন্যরা গুরুত্ব দিলেও বাংলাদেশ নিরব?

ভারতের বিহার রাজ্যের নেতৃবৃন্দ ও সরকার বহু বছর ধরে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির অধীনে থাকা ফারাক্কা বাঁধ ভেঙে ফেলার বা অপসারণের দাবি জানিয়ে আসছে। কেননা বিহারের অভিযোগ, ফারাক্কা বাঁধের কারণে গঙ্গার উজানে বিপুল পরিমাণ পলি জমে নদীর তলদেশ উচু হয়ে গেছে। ফলে স্বাভাবিক পানির প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। এদিকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে ১৯৯৬ সালের ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গা পানি চুক্তিটি নবায়নের সময় ঘনিয়ে আসার প্রেক্ষাপটে এই দাবিটি আরও জোরালো হয়েছে। বিহারের এমন দাবির প্রেক্ষিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি জানালেন বাংলাদেশের সঙ্গে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়নের আগে বিহারের পানির প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে ভারত সরকার। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর জানিয়েছেন, চুক্তিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বিহারের পানীয়জল ও শিল্পক্ষেত্রে পানির প্রয়োজনসহ সংশ্লিষ্ট সব বিষয় বিবেচনায় রাখা হবে।

বাংলাদেশ কি করছে?

পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ গঙ্গা পানি চুক্তিটি নবায়ণের সময় ঘনিয়ে আসলে-ও বর্তমানে সরকারের সংশ্লিস্ট মন্ত্রণালয়ে তেমন সাড়া-শব্দ নেই। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশের তরফ থেকে গঙ্গা পানি চুক্তিটি নবায়ণের ব্যাপারে তেমন কিছুই করা হয়নি। কিন্তু এখন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারে আমলে গঙ্গা পানি চুক্তিটি নিয়ে দেশের ভেতরে পানি নদী বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কোনো ধরনের কর্মকৈৗশলের লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। কেবলমাত্র কিছু কিছু গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকারে চুক্তির ব্যপারে রাজনৈতিক জ্বালাময়ী বক্তব্য রাখা হচ্ছে। কোথাও কোথাও জ্বালাময়ী রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া কোনো ধরণের হিসাব নিকাশ ছাড়াই। তবে মাস কয়েক আগে,পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ভারতের টিভি চ্যানেল এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় ন্যায্যতা ও জলবায়ু সহনশীলতার ভিত্তিতে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তিটি প্রথম পরীক্ষা হবে বলে মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে অতি সম্প্রতি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত ‘ট্রান্সবাউন্ডারি ওয়াটার শেয়ারিং ইস্যুস অ্যান্ড পদ্মা ব্যারেজ’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, পানিবণ্টন বিষয়গুলো কারিগরি হলেও এর সমাধান শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক এবং জাতীয় স্বার্থনির্ভর হতে হবে। তবে গঙ্গার পানির হিস্যা নিয়ে সরকারের জোড়ালো তৎপরতার মধ্যে পড়ে না বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞা। 

ডাকা হচ্ছে না বিশেষজ্ঞদের..

এদিকে বাংলাদেশ গঙ্গা পানি চুক্তিটি নবায়ণের সময় ঘনিয়ে আসলেও সরকারের ভেতরে বাইরে চারিদিকে কোনো সাড়াশব্দ না থাকায় বিষয়টি নিয়ে নদী পানি পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা চিন্তিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির ব্যাপোরে আলোচনার টেবিলে দেন-দরবারের স্বার্থে কারিগরি বিষয় হালনাগাদ করে তা তুলে ধরার প্রস্তুতির ব্যাপার রয়েছে। এর পাশাপাশি সরকারের সংশ্লিস্ট ব্যক্তিদের দ্বারা হালনাগাদ তথ্য তৈরি করে তা যথাযথভাবে উপস্থাপনের জন্য ভোকাল প্রয়েন্টকে তৈরি রাখতে হবে। একিই সঙ্গে দেশের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বর্তমানের পাশাপাশি সাবেক ও বর্তমান অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের, এমনকি মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের পরামর্শ নিয়ে একটি তথ্যভান্ডার তৈরি রাখা দরকার। যে-নো কোনো একটি ইস্যু তৈরি করে ভারত চুক্তিটি নিয়ে আলোচনার টেবিলে কালক্ষেপণের সুযোগ না পেয়ে যায়। এছাড়া এবারে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে আলোচনা টেবিলে পানি সম্পদ বিষয়ক ‘প্রকৌশলী কূটনীতি’ বা ওয়াটার ডিপ্লোম্যাসি বোদ্ধাদের সাথে রাখারও বিষিয়টি প্রাধান্য দেওয়ার দরকার বলে কারো কারো জোরালো অভিমত। কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে সরকারের কোনো পর্যায়ে এসব বিষয়ে মাথাব্যাথা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না বলেই জানা গেছে। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে-ও কোনো পর্যায়ে কাউকে নিয়েই দেশের ভেতরে কর্মকৌশল নির্ধারণে তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। শুধু মাত্র বিষয়টিকে রাজনৈতিক বলে হালকা ভাবে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সর্বত্র। 

পানির হিস্যা কি সরকারের কাছে গুরুত্বহীন

বর্তমান সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের বয়স ছয় মাস পার করতে চলেছে। আর মাত্র কয়েকমাস পরেই শেষ হবে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ। ইতোমধ্যে ভারত তাদের জনগণের পানির দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে বক্তব্যও রেখেছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বিহারের অভিযোগ আমলে নিয়ে কথাও বলেছেন। অথচ ১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি বিশ্লেষণ করে জানা গেছে যে, পানি পাওয়ার সবচেয়ে জরুরি মুহূর্তে ৫৫ দশমিক ৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই চুক্তির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হয়েছে বাংলাদেশ। এর পাশাপাশি এ-ও বলা হয়েছে যে, গঙ্গার পানি নিয়ে দুই প্রতিবেশী দেশের বিরোধ নিয়ন্ত্রণে ১৯৯৬ সালের চুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও শুষ্ক মৌসুমে ভাটির দেশ বাংলাদেশের পানির অধিকার সুনিশ্চিত করতে এটি অনেকাংশেই ব্যর্থ হয়েছে। অথচ এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের কোনো পক্ষ থেকে চুক্তিটি নবায়ণ বা মেয়াদ বাড়াতে কি কি করণীয় তা আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সভা বা বৈঠক করছে না, আমলে-ও নিচ্ছে না। নদী পানি পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়ণের আলোচনার আগে বাংলাদেশের যথেষ্ট প্রস্তুতি দরকার, এবং তা করতে হবে দ্রুত। তাদের মতে, চুক্তির আগে অবশ্যই জানতে হবে বাংলাদেশের প্রকৃত প্রয়োজন কী, ভারত আসলে কী চায় এবং দুই পক্ষের স্বার্থের সমন্বয় কীভাবে হতে পারে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের ঠিক কতটা পানি প্রয়োজন আর ন্যূনতম প্রবাহ কীভাবে নিশ্চিত হবে, তা আগে নির্ধারণে করে দেশের ভেতরের বিশেষজ্ঞসহ নাগরিক সমাজের মধ্যে শক্ত প্রচার প্রচারণা জোরদারে নেমে পড়তে হবে। তবে অবশ্যই আলোচনায় দুই দেশের জনগণের বন্ধুত্বপূর্ণ স্বার্থের পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমের পানিপ্রবাহ, জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ভিন্ন ভিন্ন চাহিদা বিবেচনায় নিতে হবে। কিন্তু এসব নিয়ে সরকারের ভেতরে বাইরে কোনো ধরনের রাজনৈতিক, কূটনৈতিক তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না বলে কারো কারো অভিমত।

সর্বশেষ

গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির নবায়ন নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের কর্মকর্তারা আলোচনা শুরু করেছেন। ইতিমধ্যেই একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হয়েছে। এই ওয়ার্কিং গ্রুপ তাদের রিপোর্ট পেশ করার পর চুক্তিটির নবায়নের কাজ শুরু হবে। আগামী ডিসেম্বরে চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। ১৯৯৬ সালের ১২ই ডিসেম্বর বাংলাদেশে ও ভারতের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে শুষ্ক মৌসুমে কীভাবে গঙ্গার পানি বণ্টন হবে তা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবেগৌড়া। এখন চুক্তিটি কীভাবে নবায়ন হবে? ঢাকার কর্মকর্তারা বলছেন, দু’দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকের পরেই এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরকালে এটি প্রধান আলোচ্য বিষয় হবে। তখনই চুক্তিটির নবায়নের ব্যাপারে দু’দেশের মধ্যে সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

এই চুক্তির অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে- ফারাক্কা বাঁধে গঙ্গার পানিবণ্টন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। পশ্চিমবঙ্গের ফারাক্কায় গঙ্গা নদীর উপর ১৯৭৫ সালে এই বাঁধ নির্মাণ করা হয়। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদী রয়েছে। যেগুলোর পানি বাংলাদেশের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়। এসব নদীর মধ্যে গঙ্গার পানি প্রবাহ ঋতুভেদে ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়। চুক্তিটির মেয়াদ ৩০ বছর হলেও প্রতি পাঁচ বছর পরপর পর্যালোচনা করার কথা রয়েছে। তবে দুই দেশের যেকোনো সরকার চাইলে এর আগেও পর্যালোচনার উদ্যোগ নিতে পারে। চুক্তির প্রভাব মূল্যায়নের জন্য যেকোনো পক্ষ দুই বছর পর পর্যালোচনার দাবি জানাতে পারে।

প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে পয়লা জানুয়ারি থেকে ৩১শে মে পর্যন্ত প্রতি দশদিন অন্তর পানিবণ্টন করা হয়। ফারাক্কায় পানির প্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেকের কম হলে বাংলাদেশ ও ভারত সমান অনুপাতে পানি পাবে। আর যদি পানির প্রবাহ ৭০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার কিউসেক হয় তাহলে বাংলাদেশ পাবে নির্দিষ্ট ৩৫ হাজার কিউসেক। ভারত পাবে অবশিষ্ট পানি। পানির প্রবাহ ৭৫ হাজার কিউসেকের বেশি হলে ভারত রাখবে ৪০ হাজার কিউসেক। আর বাকি পানি পাবে বাংলাদেশ। পানির প্রবাহ যদি ৫০ হাজার কিউসেকের নিচে নেমে যায় তাহলে দুই দেশের মধ্যে জরুরি বৈঠকের কথা রয়েছে। উল্লেখ্য যে, ফারাক্কা ফিডার ক্যানেলে পানির প্রবাহ এবং হার্ডিঞ্জ ব্রিজ নেভিগেশন লক-এ পানির প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করে যৌথ কমিটি। এরপর এই কমিটি দু’দেশের সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়।

শেয়ার করুন