১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ০৫:০৩:৬ অপরাহ্ন
শিরোনাম :


তারেকের কূটনৈতিক চালে ধরাশায়ী হাসিনা
সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ
  • আপডেট করা হয়েছে : ১০-০৯-২০২৬
তারেকের কূটনৈতিক চালে ধরাশায়ী হাসিনা তারেক রহমান ও শেখ হাসিনা


২০২৬ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের মাটিতে বসে একটি ভার্চুয়াল গণমাধ্যম অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন, যা তার পদত্যাগের দুই বছর পূর্তির দিনে অনুষ্ঠিত হয়। ওই বক্তব্যে তিনি চলতি বছেরর আগামী ডিসেম্বর মাসকে ‘বিজয়ের মাস’ উল্লেখ করে সে সময় দেশে ফেরার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। আর এরপরপরই তার দেশে ফেরা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে অনিশ্চয়তা ও নানা আলোচনা তৈরি হয়। এদিকে ক্ষমতা গ্রহণের অল্পকাল পরেই বিএনপির চেয়ারপারসন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজ দলের বাইরে বাকি সব রাজনৈতিক দলের তোপের মুখে পড়েন। এ-নিয়ে ভারতের সাথে সম্পর্ক এক ধরনের হোঁচট খায়। দ্রুত সেক্ষেত্রে অবনতি-ও দেখা দেয়। ভারত থেকে শেখ হাসিনার এই রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় বাংলাদেশ সরকার। ঢাকা এ বিষয়ে নয়াদিল্লির অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বান জানায়।

ভার্চুয়াল গণমাধ্যম অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখার পর থেকে ভারত বাংলাদেশের মধ্যে এনিয়ে পরিস্থিতি এতোটাই অমসৃণ হয়ে উঠে যে শুধু দু’দেশের সরকার নয়, জনগণের সাথে সম্পর্ক ভালো করার বড়ো সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। কেননা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে যে, উপযুক্ত সময় ও অনুকূল পরিবেশ তৈরি না হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক ভারত সফরে যাবেন না। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কেও উন্নয়ন ও ফলপ্রসূ আলোচনার স্বার্থেই ঢাকা দিল্লির প্রতি সহায়ক বা অনুকূল পরিবেশ তৈরির তাগিদ দিতে থাকে। এরপরপরই বাংলাদেশে ভারতের বর্তমান হাই কমিশনার প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও সাবেক মন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদীর দৌড়ঝাপ বেড়ে যায়। ছুটে যান দিল্লিতে তিনি। এরপরপরইই বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইতিবাচক কিছু ঘটনা ঘটে যায়। ভারতের নয়াদিল্লিতে ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব বা এফসিসি বাংলাদেশের কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকে নিয়ে একটি সেমিনার আয়োজন করেছিল। পরে দিল্লি পুলিশের বাধার কারণে শেষ পর্যন্ত সেই সেমিনার বাতিল করে আয়োজকরা। এছাড়া-ও দেখা গেলো ভারত থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বড়ো পরিসরে ঢালাও অডিও বার্তা দিচ্ছেন না। এদিকে ভারতে আওয়ামী লীগের কর্মীদের একটি অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়াকে ইতিবাচক বিষয় হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় বার্তা দেয়। এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন বলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানান।

শেখ হাসিনা নেতৃত্ব নিয়ে

এাদিকে সর্বশেষ যে তথ্যটি মিললো তা হচ্ছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তার অনুপস্থিতিতে শেখ ফজলুল করিম সেলিম আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন যা, গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়ালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘এখন শেখ সেলিম সিনিয়র মোস্ট প্রেসিডিয়াম সদস্য। আমার অনুপস্থিতিতে তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। অন্যদিকে ছোট বোন শেখ রেহানা সম্পর্কে শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘রেহানা সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত নয়।’

এখন প্রশ্ন শেখ হাসিনার অনুপস্থিতি ও রেহানা প্রসঙ্গ?

এদিকে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা জমে উঠেছে কেনো শেখ হাসিনা একেবারে চরম সময়ে এই তথ্য দিলেন যখন মোটামুটি একটা আওয়াজ শোনা গেলো যে তিনি ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন। তা-ও এমন বক্তব্যে আওয়ামী লীগ শিবিরে তোলপাড় বয়ে যায়। দেশে ভেতরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে চাঙ্গাভাব লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু সর্বশেষ দেয়া সাক্ষাৎকারে তার অনুপস্থিতি ও দেখা ফেরার ব্যাপারে তার বিপদের কথা তুলে ধরায় একটা বড়ো ধরনের ধোয়াশা দেখা দেয়। এর পাশাপাশি শেখ রেহানাকে একেবারে তুচ্ছ করে ফেলার বিষয়টি প্রচন্ডভাবে দল ও একিই সাথে রাজনৈতিক মাঠকে ঝাকুনি দিয়েছে। কেননা দ্য ওয়ালের এক্সিকিউটিভ এডিটর অমল সরকারের সঙ্গে দীর্ঘ কথোপকথনে দেশে ফেরা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে কথা বলেন শেখ হাসিনা। সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফেরার সিদ্ধান্তের কথা পুনর্ব্যক্ত যেমন করেছেন তেমনি বিপদের বাণীও শুনিয়েছেন। জানালেন পানিতে নামলে কুমির আর ডাঙ্গায় থাকলে বাঘের ভয়ের কথা। কেননা দেশে ফিরলে বিমানবন্দরেই তাকে হত্যার আশঙ্কা রয়েছে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। 

চাপে পড়ছেন শেখ হাসিনা?

প্রশ্ন এই দ্বি-মুখী বার্তায় তিনি কি বুঝিয়েছেন? তা-হলে তিনি তা-র মত পাল্টালেন? না-কি দিল্লির শক্ত চাপ পড়েছে তার ওপর। কারো কারো অভিমত ২০২৬ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের মাটিতে বসে একটি ভার্চুয়াল গণমাধ্যম অনুষ্ঠানে বক্তব্যের পর বাংলাদেশে তারেক রহমানের সরকার কঠোর কূটনৈতিক অবস্থান নেন। এসময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান-ও বেশ দৃঢতার সাথে কূটনৈতিক মাঠ চষে বেড়ান। ফলে সবদিকে তারেকের কঠোর অবস্থান টের পেয়েই বাংলাদেশে ভারতের বর্তমান হাই কমিশনার হলেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও সাবেক মন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদী ছুটে যান দিল্লিতে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো মনে করে, এই সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে ‘সহায়ক পরিবেশ’ তৈরির বিষয়ে ঢাকার কঠোর বার্তা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে পৌঁছে দিয়েছেন দেশটির হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। কারো কারো মতে, ওই বৈঠকের পরপরই ভারত বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় যা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারের জন্য কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বিরাট প্রভাব ফেলে। 

শেখ রেহানার নাম মুখে কেনো?

এদিকে দ্য ওয়ালের এক্সিকিউটিভ এডিটর অমল সরকারের সঙ্গে দীর্ঘ কথোপকথনে কেনো ছোট বোন শেখ রেহানা সম্পর্কে শেখ হাসিনা মুখ খুললেন? কেনোই বা শেখ সেলিমের প্রসঙ্গ আনলো-তা নিয়ে রহস্যের শেষ নেই। কারো কারো মতে, এখানেও তারেক রহমানে কূটনৈতিক চাল মারাত্মকভাবে কাজ করেছে। কারো কারো মতে, তারেকের কূটনৈতিক ধাক্কায় কি শেখ হাসিনা ভবিষ্যত নেতৃত্ব ধরে রাখতেও সঙ্কটে পড়েছেন? 

কিংবা তা-র নেতৃত্বে কি কেউ বাগড়া দিতে যাচ্ছে? আর এজন্যই দলের ভবিষ্যত নেতৃত্ব প্রশ্নে শেখ হাসিনা নিজ মুখে বলেছেন, ‘রেহানা সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত নয়।’ রাজনেতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়ালকে দেওয়া ও-ই সাক্ষাৎকারে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার অনুপস্থিতিতে শেখ ফজলুল করিম সেলিম আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালল এবং তার আদরের বোন শেখ রেহানার প্রসঙ্গ চলে আসার বিষয়টি বেশ ইঙ্গিতপূর্ণ। কারো কারো মতে, আগামীতে আওয়ামী লীগে কি কি পরিবর্তন পরিবর্ধন আসে তা দেখতে বেশি সময় লাগবে না। এর পাশাপশি একথা পরিস্কার হয়ে গেলো যে তারেকের কূটনৈতিক চালে হাসিনা যে ধরাশায়ী তা স্পস্ট হয়ে গেলো।

শেয়ার করুন