১৩ অগাস্ট ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ০৪:২৮:৩৯ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচন ১৮ অক্টোবর মাইর শুরু হয়েছে কেবল, আসল মারই তো শুরুই হয়নি সাবওয়ে স্টেশন ঠান্ডা রাখতে নতুন পরিকল্পনা শিশুদের টিকা নীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ শতবর্ষী চেম্বারস স্ট্রিট সাবওয়ে স্টেশন সংস্কারে বড় প্রকল্প মুসলিম হওয়ায় মৃত্যুর হুমকি, অভিযোগ ফ্লোরিডার রিপাবলিকান কংগ্রেস প্রার্থীর হিজাব পরা নারীকে হামলার অভিযোগ : জোনাথন স্ট্রিপের বিরুদ্ধে হেট ক্রাইমের মামলা ইসলাম ও মুসলিম খ্রিস্টান সম্পর্কের অগ্রণী গবেষক এস্পোসিতোর মৃত্যু মসজিদে অগ্নিসংযোগের চেষ্টা, ৪০ বছর কারাদণ্ডের মুখে ভিনসেন্ট তারেক রহমানের ভারত সফরে প্রাণান্ত চেষ্টা মোদী সরকারের


হেফাজত কী বিএনপির ইসলামপন্থী মিত্র
মাসউদুর রহমান
  • আপডেট করা হয়েছে : ১২-০৮-২০২৬
হেফাজত কী বিএনপির ইসলামপন্থী মিত্র প্রধানমন্ত্রীর সাথে হেফাজতের আমির


চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ঐতিহ্যবাহী বাবুনগর মাদ্রাসায় গত ৯ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং কওমিপন্থী আলেম ওলামাদের মুরব্বী ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর মধ্যে অনুষ্ঠিত একান্ত বৈঠক ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপির ক্রমবর্ধমান দূরত্বের প্রেক্ষাপটে এই সাক্ষাৎ কেবল সৌজন্যমূলক, নাকি এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কৌশল তা নিয়ে চলছে বিস্তর বিশ্লেষণ।

শেখ হাসিনা-বিরোধী আন্দোলনের এক পর্যায়ে বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়। জামায়াতের প্রতি আস্থার ঘাটতি থেকে যুগপৎ আন্দোলনে বিএনপি জোটের শরিকদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, এবং জামায়াতকে কার্যত পৃথক রাখা হয়। তা সত্ত্বেও যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গে সংযোগ রেখে জামায়াত নিজস্ব কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছে।

জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। জামায়াত আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের পৃথক অবস্থান ঘোষণা করে, এবং এরপর থেকে বিএনপির বিরুদ্ধে দলটির সমালোচনা ক্রমশ তীব্র হতে থাকে। শুরুতে বিএনপি প্রায় নীরব থাকলেও আক্রমণাত্মক প্রবণতা বাড়তে থাকায় দলটিও পাল্টা জবাব দেওয়া শুরু করে। অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে এই বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নেয়।

নির্বাচনী মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ফলাফলে জামায়াতের উত্থান

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে। নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, বিএনপি একাই প্রায় ৫০ শতাংশ ভোট পেয়েছে, আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট ও আসন পেয়েছে জামায়াতে ইসলামী, প্রায় ৩২ শতাংশ ভোট নিয়ে। এই ফলাফল জামায়াতকে সংসদে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যা দলটির সাংগঠনিক শক্তি ও রাজনৈতিক গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

নির্বাচনের মাঠে দুই দলের মধ্যে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং একাধিক আসনে সহিংস সংঘাতের ঘটনা সম্পর্কের তিক্ততাকে আরও গভীর করে। ক্ষমতায় আসার পর সাংবিধানিক সংস্কার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়েও দুই পক্ষের অবস্থানে স্পষ্ট ফারাক দেখা গেছে। জামায়াত অভিযোগ করছে, ক্ষমতায় যাওয়ার পর বিএনপি নির্বাচনের আগের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছে। 

হেফাজতের সঙ্গে বিএনপির পুরনো সখ্য

ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবেই তুলনামূলক উষ্ণ। এর একটি বড় কারণ, হেফাজত দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতের রাজনৈতিক-ধর্মীয় ভাবাদর্শের কড়া সমালোচক, দলটির নেতারা জামায়াতের চিন্তাধারা ও আকিদা নিয়ে প্রকাশ্যে তীক্ষè ভাষায় আপত্তি জানিয়ে এসেছেন। গত নির্বাচনে হেফাজতের একটি বড় অংশ প্রকাশ্যে বিএনপি জোটকে সমর্থন দিয়েছিল, এবং বিজয়ী হলে হেফাজত নেতৃত্বের সঙ্গে সাক্ষাতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তারেক রহমান নিজেই।

সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে গত ৯ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফটিকছড়ির বাবুনগর মাদ্রাসায় গিয়ে আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে দীর্ঘ একান্ত বৈঠক করেন এই বৈঠকে হেফাজত নেতৃত্বের পক্ষ থেকে ৯ থেকে ১০ দফা দাবি তুলে ধরা হয়, যার মধ্যে ধর্মীয় অবমাননা রোধে কঠোর আইন প্রণয়ন, ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনার বিচার এবং কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন পাস না করার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী আগামী দিনেও হেফাজতের সঙ্গে একযোগে কাজ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সাক্ষাৎ শেষে দুই পক্ষের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ পরিলক্ষিত হয়, যা স্থানীয় সাংবাদিক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি এড়ায়নি।

কৌশলগত মেরুকরণ, নাকি নিছক সৌজন্য?

এই বৈঠককে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে মূলত দুই ধরনের ব্যাখ্যা উঠে এসেছে। এক পক্ষের যুক্তি হলো, নির্বাচন-পূর্ব প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং যেসব ইসলামপন্থী ভোটার বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সাধারণ সৌজন্যতা ছাড়া এতে বাড়তি কিছু নেই। ক্ষমতাসীন যেকোনো দলই বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় শক্তির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে, এবং হেফাজতের বিপুল কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক নেটওয়ার্ক ও সামাজিক প্রভাবের কারণে যেকোনো সরকারের পক্ষেই এই শক্তিকে উপেক্ষা করা কঠিন।

অন্য পক্ষের বিশ্লেষণ বলছে, জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি যেভাবে ক্রমাগত নিন্মমুখী হচ্ছে, তাতে বিএনপি সচেতনভাবেই একটি বিকল্প ইসলামি মিত্র তৈরির চেষ্টা করছে, যাতে সংসদের বাইরে ধর্মভিত্তিক জনমতের ক্ষেত্রে জামায়াতের একচ্ছত্র প্রভাব থেকে ভারসাম্য তৈরি করা যায়। কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক শিক্ষক-ছাত্রদের বিশাল নেটওয়ার্ক নিয়ে হেফাজত সারাদেশে যে সাংগঠনিক প্রভাব রাখে, তা রাজনৈতিক মাঠে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে বহুদিন ধরে। এই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হেফাজতের সঙ্গে প্রকাশ্য ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে বিএনপি ভবিষ্যতের রাজনৈতিক ও নির্বাচনী মেরুকরণে জামায়াতবিরোধী একটি ইসলামপন্থী পাল্টা কেন্দ্র দাঁড় করানোর কৌশল নিতে পারে।

সবশেষ 

তবে এখনই একে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বলা যাবে না। হেফাজত মূলত একটি অরাজনৈতিক, ধর্মভিত্তিক সামাজিক সংগঠন হিসেবে পরিচিত হলেও এর রাজনৈতিক প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। বাবুনগর বৈঠকে হেফাজতের পক্ষ থেকে তোলা দাবিগুলো সরকার কতটা আমলে নেয়, আগামী দিনে দুই পক্ষের সম্পর্ক কোন দিকে গড়ায়, এবং জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির দূরত্ব আরও বাড়ে নাকি কোনো পর্যায়ে সমঝোতার পথ খোলে- সব বিষয়ের ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের আগামী রাজনৈতিক মেরুকরণের চিত্র। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আসছে সপ্তাহ ও মাসগুলোতে এই তিন পক্ষের- বিএনপি, জামায়াত ও হেফাজত অবস্থান স্পষ্ট হতে থাকবে, যা দেশের ইসলামপন্থী রাজনীতির ভবিষ্যৎ কাঠামো অনেকাংশে নির্ধারণ করে দেবে।

শেয়ার করুন