২৩ জুলাই ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ০৫:১১:১৫ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
স্ত্রী-সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে দগ্ধ নোয়াখালীর সোহাগের মৃত্যু ব্রঙ্কসে ‘ডিটেকটিভ ফার্স্ট গ্রেড দিদারুল ইসলাম ওয়ে’ ফিলাডেলফিয়ার মসজিদে অগ্নিবোমা হামলা : গ্রেফতার ভিনসেন্ট ল্যাং নেতানিয়াহুকে গ্রেফতারের আইনি সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন মেয়র ইতিহাসের দ্বারপ্রান্তে আবদুল এল-সায়েদ নিউইয়র্কে ২.১ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি, পর্যটন ও ব্যবসায় বড় সাফল্য টেক্সাসে মুসলিম শিক্ষাবিদের মামলা গ্রিনকার্ড আবেদনকারীদের জন্য ১ লাখ ডলারের বন্ড বিবেচনায় ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসন অভিযানে ব্যাপক নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এসিএলইউর প্রতিবেদনে গ্রিনকার্ড মূল্যায়নে মেডিকেইড, ফুড স্ট্যাম্প ও আবাসন সহায়তা বিবেচনায় নেবে ট্রাম্প প্রশাসন


নতুন স্টার ইয়ামাল
স্প্যানিশদের বিশ্বসেরা হওয়ার নেপথ্যে
মাসউদুর রহমান
  • আপডেট করা হয়েছে : ২২-০৭-২০২৬
স্প্যানিশদের বিশ্বসেরা হওয়ার নেপথ্যে কাপ হাতে চ্যাম্পিয়ন স্পেন


অনেকের মনেই খটকা একটা আধটু হলেও! যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো, কানাডায় অনুষ্ঠিত ২৩ তম বিশ্বকাপে স্পেন কেন চ্যাম্পিয়ন হলো? নামী দামী সব দল ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, পর্তুগাল, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মেনির মত দলকে হটিয়ে স্পেন চ্যাম্পিয়ন হয় কিভাবে? নেপথ্যে আসলেই কী। কিন্তু বিশ্বকাপটা যারা আগা গোড়া দেখেছেন, খবর রেখেছেন তারা এ প্রশ্ন করবেন না একটুও। কারণ ফিফা যোগ্য দলটাকেই খুঁজে বের করে বিশ্বের দরবারে হাজির করে দিয়েছে। অভিজ্ঞ ও তারুণ্যের সংমিশ্রনে গড়া সে দলটার নাম স্পেন। 

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে- 

২০২৬ বিশ্বকাপে স্পেনের ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত স্কোয়াডের গড় বয়স ছিল প্রায় ২৬.২ বছর (বা ২৬ বছর ২৭৩ দিন)। আর ম্যাচগুলোতে একাদশে নামা খেলোয়াড়দের গড় বয়স ছিল প্রায় ২৬.৭৬ বছর।

ফলে বিশ্বকাপের দলগুলোর মধ্যে তারুণ্যের দিক থেকে দলটির অবস্থান ছিল (বিশ্বকাপের ৪৮টি দেশের মধ্যে) ৬ষ্ঠ সর্বনিম্ন গড় বয়সের দল। তবে এখানে বলে রাখা ভাল, টুর্নামেন্টের সবচেয়ে কম বয়সী দল ছিল আইভরি কোস্ট (গড় বয়স ২৫.৩৫ বছর)। 

স্পেনের তারুণ্যনির্ভর দলটির মূল বৈশিষ্ট্য

দলটিতে তরুণ খেলোয়াড়দের মধ্যে লামিনে ইয়ামাল (১৯ বছর), পাউ কুবারসি (১৯ বছর) ও পেদ্রি (২৩ বছর)-এর মতো তরুণ প্রতিভাদের ওপর ভিত্তি করে স্পেনের মূল একাদশ ও কৌশলের বিস্তার গড়ে উঠেছিল। এতে করে দলে অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের নিখুঁত ভারসাম্য ঘটে। পুরো ২৬ জনের স্কোয়াডে ৩০ বা তার বেশি বয়সী অভিজ্ঞ খেলোয়াড় ছিলেন মাত্র ৬ জন। অভিজ্ঞতা ও গতিময়তার চমৎকার সমন্বয়ে দলটি সর্বোচ্চ স্তরে ফুটবল শৈলী প্রদর্শন করতে পেরেছে। যাদের গতি ও শৈল্পিকতার কাছে পরাস্ত হয়েছে সব দল। 

অপরদিকে ২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়দের গড় বয়স ছিল প্রায় ২৮.৮ থেকে ২৯ বছর। অভিজ্ঞতা ও গতির সমন্বয়: এই বয়সটি আন্তর্জাতিক ফুটবলে আদর্শ ধরা হয়, কারণ স্কোয়াডের অধিকাংশ মূল ফুটবলারই (যেমন: এনজো, আলভারেজ, ম্যাক অ্যালিস্টার, রোমেরো) তাঁদের ক্যারিয়ারের সেরা সময়ে থেকে টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছেন।

২০২৬ বিশ্বকাপে স্কালনির কৌশল দাঁড়িয়ে ছিল ২২ থেকে ২৭ বছর বয়সী ফুটবলারদের শক্তির ওপর। ২৫ বছর বয়সী এনজো ফার্নান্দেজ এবং ২৭ বছর বয়সী আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার পুরো টুর্নামেন্টে মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করেছেন। আক্রমণভাগে ২৬ বছর বয়সী হুলিয়ান আলভারেজ ছিলেন প্রধান স্ট্রাইকার। এছাড়া ২২ বছর বয়সী আলেহান্দ্রো গারনাচো এবং ২১ বছর বয়সী নিকো পাস-এর মতো তরুণদের স্কালনি দলের সাথে যুক্ত করে আক্রমণভাগে বৈচিত্র্য এনেছেন। ডিফেন্সে ২৮ বছর বয়সী ক্রিস্টিয়ান রোমেরো ও লিসান্দ্রো মার্তিনেজ দলের রক্ষণভাগ সামলানোর মূল দায়িত্বে ছিলেন। যার সুফল তারা পেয়েছে স্পেনের বিপক্ষে। 

কিন্ত ২০২৬ বিশ্বকাপে লিওনেল মেসি অধিনায়ক ও প্রধান রূপকার এর বয়স ছিল ৩৯ বছর, নিকোলাস ওতামেন্দি সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার ৩৮ বছর, এমিলিয়ানো মার্তিনেজ গোলরক্ষক ৩৩, রোদ্রিগো দে পল মিডফিল্ডার ৩২ বছর নিকোলাস তাগলিয়াফিকো লেফট ব্যাক ৩৩ বছর এদের উপর মুল ভরসা রেখেছিলেন। ফলে এখানে স্কলানি অভিজ্ঞতার উপর বেশি ভরসা করলেও সে কৌশল কাজে আসেনি। 

ফলে স্প্যানিশদের তরুর তুর্কির সম্মুখে ৯০ মিনিট সমতা রাখতে সক্ষম হলেও বহু অক্রমণ হজম করতে হয়েছে। এবং বেশিরভাগ সময় আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ সামলাতে ব্যস্ত ছিল। ফলে এখানে গতি ও স্ট্যামিনার একটা কম্পিটিশনও ছিল। যেখানে পিছিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। 

ফুটবল বিশ্বের যারা একটু আধটু হলেও খবর রাখেন তারা জানেন, স্প্যানিশ ফুটবল, স্প্যানিশ লীগের অবদান বিশ্বের তারকা ফুটবলারদের কাছে কত খানি। 

বিশ্বের সব নামী দামী ফুটবলাররা সেখানে খেলেন। এক কথায় ফুটবল নিয়ে স্পেনের চর্চা বহু পুরানো। ফুটবল কালচারে অনেক এগিয়ে দেশটি। তার প্রতিফলন ঘটালো তারা ২০১০ এর পর এবারও। 

এবার জয়জয়কার তরুণ তুর্কিদেরই। মেসি থেকে শুরু করে অনেক দলই সিনিয়র অভিজ্ঞ ফুটবলারের উপর নির্ভর করে নামের উপর ভর করে পার হতে চেয়েছিল। কিন্তু স্পেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, ফুটবল জিততে সব ধরনের টেকনিক, স্কিল, এনার্জি থাকা জরুরি। আপনি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হবেন আপনি হবেন অল রাউন্ডার। স্পেন তেমনই এক দল। যা শুরু থেকে শুরু করে সেমিফাইনাল ও ফাইনালে প্রমাণিত। অদম্য একটা দল জয়ের নেশায় বুদ হয়ে একের পর এক অ্যাটাক করে গোল বের করে যোগ্য দল হিসেবে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। ৯০ মিনিট একই দমে খেলে ১২০ মিনিটেও তারা ছিলেন অদম্য। বিন্দুমাত্র ক্লান্তি স্পর্শ করেনি। এছাড়া স্পানিশ কোচের মুন্সিয়ানার ছাপ, কখন কাকে মাঠে নামাতে হবে সেটাও দারুণ ভূমিকা ছিল। 

২০১০ সালেও দুর্দান্ত ক্রীড়া শৈলী প্রদর্শন করে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল স্পেন, নেদারল্যান্ডকে হারিয়ে। এ দলটাও দারুণ সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়ে চ্যাম্পিয়ন হলো, এবং যোগ্য খেলা খেলে।

ফলে ২৩তম (২০২৬) ফুটবল বিশ্বকাপে স্পেনের চ্যাম্পিয়ন হওয়া কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়, বরং এটি আধুনিক ফুটবলের টেকটিক্যাল বিপ্লব ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার এক অনন্য ফসল। ফুটবল বিশ্বের পরাশক্তি ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ফ্রান্স, পর্তুগাল ও ইংল্যান্ডকে পেছনে ফেলে স্পেনের এই ট্রফি জয় নিয়ে সাধারণ দর্শকদের মনে কিছু প্রশ্ন থাকলেও, ফুটবল বিশেষজ্ঞদের কাছে এটি ছিল এক অবধারিত পরিণতি।

স্প্যানিশ ফুটবলারদের বৈশিষ্ট্য 

স্পেনের ফুটবলের চর্চা ও সাফল্য রাতারাতি গড়ে ওঠেনি। স্প্যানিশ ফুটবল লা লিগার মাধ্যমে যুগের পর যুগ ধরে বিশ্বমানের ফুটবলার তৈরি করে আসছে। বিশ্বের সেরা তারকারা এই লিগে খেলার কারণে স্থানীয় তরুণ ফুটবলাররা বিশ্বমানের পেশাদারিত্ব, হাই-প্রেসার ম্যাচ হ্যান্ডলিং এবং আধুনিক ফুটবলের গতি ও কৌশলের সঙ্গে অত্যন্ত অল্প বয়সে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। এই সমৃদ্ধ ফুটবল সংস্কৃতি ও উন্নত অ্যাকাডেমি ব্যবস্থা তাদের জাতীয় দলের ভিত্তি মজবুত করেছে।

যেখানে অনেক বড় দল (যেমন আর্জেন্টিনা বা পর্তুগাল) তাদের সাবেক বিশ্বখ্যাত ও বয়োজ্যেষ্ঠ তারকাদের নামের ওপর নির্ভর করে টুর্নামেন্ট পার হতে চেয়েছিল, সেখানে স্পেন বাজি ধরেছিল তাদের উদীয়মান ‘তরুণ তুর্কিদের’ ওপর। অদম্য গতি, গতিময় ড্রিবলিং এবং বল দখলের ক্ষুধা নিয়ে এই তরুণরা পুরো টুর্নামেন্টে প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করে রাখে। আধুনিক ফুটবল যে কেবল ‘নাম’ বা ‘অতীত ঐতিহ্য’ দিয়ে জেতা যায় না। বরং মাঠের ক্ষিপ্রতা ও আধুনিক স্কিলের প্রয়োজন, স্পেন সেটাই প্রমাণ করেছে।

বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে হলে কোনো একটি নির্দিষ্ট বিভাগে সেরা হলেই চলে না, হতে হয় নিখুঁত ‘অল-রাউন্ডার’। স্পেন সেমিফাইনাল এবং ফাইনালের মতো মহা-গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে এটি প্রমাণ করেছে।

টোটাল ফুটবলের বৈশিষ্ট্য হলো কেবল পজেশন ধরে রাখা নয়, সরাসরি এবং একের পর এক ধারালো কাউন্টার অ্যাটাক। এবং সেখানে যে যার সুবিধামত পজিশন নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। প্রয়োজনে স্ট্রাইকারও নেমে পড়তে হয় ডিফেন্সে। 

অবিশ্বাস্য ফিজিক্যাল ফিটনেস ও স্ট্যামিনা ছিল স্পেনের 

৯০ মিনিট একই গতিতে খেলার পর অতিরিক্ত ১২০ মিনিটেও স্প্যানিশ খেলোয়াড়দের মধ্যে ক্লান্তির কোনো ছাপ দেখা যায়নি। আধুনিক ফুটবলে টেকনিকের পাশাপাশি ‘হাই-ইন্টেনসিটি প্রেসার’ ধরে রাখতে যে শারীরিক শক্তির প্রয়োজন, তা স্পেন শতভাগ প্রদর্শন করেছে। ম্যাচ যতই গড়িয়েছে, স্পেনের প্রেসার ফুটবল প্রতিপক্ষ দলকে ততই দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছে। এরপেছনে বড় ভূমিকা স্পেনের কোচের। তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে ম্যাচ রিডিং এবং সময়োপযোগী কৌশলগত পরিবর্তন ট্রফি জয়ে নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছে। কখন কাকে মাঠে নামাতে হবে, প্রতিপক্ষের দুর্বলতা অনুযায়ী কীভাবে ফরমেশন পরিবর্তন করতে হবে, তা তিনি অসাধারণ মুন্সিয়ানার সঙ্গে পরিচালনা করেছেন। বেঞ্চ থেকে আসা খেলোয়াড়রাও মাঠে নেমে মূল একাদশের মতোই সমান প্রভাব বিস্তার করেছেন।

২০১০ সালে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে স্পেন যখন প্রথমবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল, তখন যেমন বিশ্ব ফুটবল এক নতুন ‘টিকি-টাকা’ শৈলীর সাক্ষী হয়েছিল; ২০২৬ সালের এই চ্যাম্পিয়ন স্পেন দলটিও ঠিক তেমনই এক নতুন ও রোমাঞ্চকর ফুটবলের বার্তা দিল। 

ফুটবলের নিখুঁত ছন্দ, শৈল্পিক ফুটবল এবং অবিশ্বাস্য টেকটিক্যাল শক্তির যে মিশ্রণ স্পেন উপহার দিয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই যে ফুটবল বিশ্ব তার সেরা এবং সবচেয়ে যোগ্য দলকেই বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট পরিয়েছে। 

শেয়ার করুন