০৯ জুলাই ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ০১:০৫:০৭ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
অপহরণ ও নির্যাতন : লুবনা দুই অপহরণ মামলায় দোষী সাব্যস্ত নিউইয়র্কে ১ হাজার ২৫০ কিউনি শিক্ষার্থীর জন্য বিনামূল্যে অমনি কার্ড পাইলট কর্মসূচি মসজিদে ইসলামবিরোধী ও প্রাণনাশের হুমকিতে এক ব্যক্তি অভিযুক্ত সুলতানা রাজিয়া ও সৈয়দ রুবেল অপহরণ মামলায় দোষী সাব্যস্ত যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ বছর উদযাপনে ধর্মীয় ইতিহাস ঘিরে বিতর্ক দুর্বৃত্তের অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত নর্থ ইস্ট ফিলাডেলফিয়া ইসলামিক সেন্টার ওজনপার্কের বৈঠকখানা রেস্টুরেন্টে হাতবোমা নিক্ষেপ নিউইয়র্কে আইনশৃঙ্খলার উন্নয়নে ১০০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ঘোষণা কঠোর অভিবাসন নীতিতে বিপাকে মার্কিন নাগরিকদের বিদেশি স্বামী-স্ত্রী আগাম বন্যার পদধ্বনি, আশঙ্কার ছায়া চট্টগ্রাম-সিলেটে


অপহরণ ও নির্যাতন : লুবনা দুই অপহরণ মামলায় দোষী সাব্যস্ত
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৮-০৭-২০২৬
অপহরণ ও নির্যাতন : লুবনা দুই অপহরণ মামলায় দোষী সাব্যস্ত ইফফাত লুবনা


ব্যক্তিগত বিরোধ, প্রতিশোধের অভিযোগ এবং ভয়াবহ অপহরণ পরিকল্পনার ঘটনায় কুইন্সের বাসিন্দা ইফফাত লুবনাকে (২৬) দোষী সাব্যস্ত করেছে ব্রুকলিন ফেডারেল আদালতের একটি জুরি। আদালত তাকে দুটি অপহরণ এবং দুটি অপহরণের ষড়যন্ত্র অভিযোগে দোষী বলে রায় দিয়েছে। ফেডারেল প্রসিকিউটরদের অভিযোগ অনুযায়ী, লুবনা তার স্বামী আবু চৌধুরী, একজন কুইন্স সুপারমার্কেট ব্যবসায়ী এবং সহযোগীদের সঙ্গে মিলে দুই ব্যক্তিকে অপহরণ ও নির্যাতনের পরিকল্পনায় অংশ নেন। প্রসিকিউশনের দাবি, এ অপহরণের পেছনে ছিল ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও প্রতিশোধের উদ্দেশ্য। জুরি লুবনাকে চারটি অভিযোগেই দোষী সাব্যস্ত করে। এসব অপরাধে তার সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। 

তবে রায়ের পর তাকে তাৎক্ষণিকভাবে কারাগারে পাঠানো হয়নি। বিচারক নিনা মরিসন সাজা ঘোষণার আগ পর্যন্ত তাকে বন্ডে মুক্ত থাকার অনুমতি দিয়েছেন। আদালত বিবেচনা করেছে যে তিনি জামিনের শর্ত ভঙ্গ করেননি এবং তার ছোট সন্তানের যত্ন নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ফেডারেল প্রসিকিউটরদের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মে মাসে কুইন্সে দুই ব্যক্তিকে অপহরণের ঘটনায় লুবনা ও তার স্বামী জড়িত ছিলেন। 

প্রথম ভুক্তভোগী ছিলেন মাহোদ প্রিও। তিনি বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনার জন্য আসার পর লুবনার পরিচিত হওয়ায় কিছু সময় তাদের অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন। প্রসিকিউটরদের মতে, ২০২৩ সালের ৯ মে আবু চৌধুরী প্রিওকে লুবনার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। চৌধুরী জানতে চেয়েছিলেন, লুবনা তাকে ভালোবাসেন, নাকি তার অর্থের প্রতি আগ্রহী। প্রিও লুবনার বিষয়ে কিছু মন্তব্য করেন, যা পরে চৌধুরী মোবাইল ফোনের মাধ্যমে লুবনাকে জানিয়ে দেন। 

প্রসিকিউশনের দাবি, এসব মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে লুবনা ও চৌধুরী প্রিওকে অপহরণের পরিকল্পনা করেন। পরদিন তাকে একটি গাড়িতে তুলে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়। আদালতে বলা হয়, প্রিওকে হুমকি দেওয়া হয়, মারধর করা হয় এবং প্রায় ৩৬ ঘণ্টা ধরে কুইন্সের বিভিন্ন স্থানে আটকে রাখা হয়। প্রসিকিউটররা বলেন, অপহরণের সময় নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করা হয়েছিল। 

সহকারী যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি স্টেফানি পাক আদালতে বলেন, ভুক্তভোগীর চিৎকার, মারধরের শব্দ এবং নির্যাতনের রেকর্ডিং জুরিরা নিজেরাই শুনেছেন। দ্বিতীয় ভুক্তভোগী ছিলেন মাজহারুল ইসলাম। আদালতের সাক্ষ্য অনুযায়ী, ইসলাম একটি অনলাইন ইংরেজি শেখার ক্লাসে লুবনার সঙ্গে পরিচিত হন এবং তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চেয়েছিলেন। 

ইসলাম আদালতে জানান, তিনি লুবনাকে আকর্ষণীয় মনে করেছিলেন এবং বাংলাদেশি হওয়ার কারণে তার সঙ্গে পরিচয় বাড়াতে চেয়েছিলেন। কথোপকথনের সময় তিনি লুবনার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন করেন। 

প্রসিকিউটরদের মতে, ইসলামের কিছু মন্তব্যে লুবনা ক্ষুব্ধ হন। আদালতে উপস্থাপিত অডিও রেকর্ডে তাকে বলতে শোনা যায়, আমি তার মৃতদেহ দেখতে চাই। ফেডারেল প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, এরপর লুবনা ইসলামের সঙ্গে দেখা করার কথা বলে তাকে ফাঁদে ফেলেন। ২০২৩ সালের ১১ মে রাত ১টার দিকে বাড়ি ফেরার পথে ইসলামকে দুই ব্যক্তি একটি হোন্ডা ওডিসি মিনিভ্যানে তুলে নেয় বলে অভিযোগ করা হয়। 

আদালতে বলা হয়, ওই ব্যক্তিদের একজন ছিলেন আবু চৌধুরী। প্রসিকিউটরদের দাবি, গাড়ির ভেতরে ইসলামের ফোন কেড়ে নেওয়া হয়, তাকে মারধর করা হয়, লোহার রড দিয়ে আঘাত করা হয় এবং তার ব্যাংক কার্ড ব্যবহার করে ১ হাজার ডলার তুলে নেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, পরে ইসলামের বাবার কাছে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। তাকে জোর করে মাদক সেবন, অ্যালকোহল পান এবং একটি বড়ি খাওয়ানো হয় বলেও প্রসিকিউটররা জানান। এরপর ইসলাম ও প্রিও দুজনকেই কুইন্সের করোনা হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়। প্রসিকিউটররা বলেন, প্রিওকে বাধ্য করা হয় ইসলামকে আঘাত করতে, না হলে তাকেও আবার নির্যাতনের হুমকি দেওয়া হয়। 

পরে ইসলামকে একটি পরিত্যক্ত বাড়ির বেসমেন্টে নিয়ে গিয়ে চোখ, হাত ও পা বেঁধে রাখা হয় বলে অভিযোগ করা হয়। তবে ইসলাম নিজের হাতের বাঁধন দাঁত দিয়ে কেটে মুক্ত হন, জানালা ভেঙে বের হয়ে আসেন এবং পরে একটি বাড়িতে গিয়ে ৯১১ নম্বরে ফোন করেন। পুলিশ তাকে আঘাতের চিহ্ন, ময়লা এবং টেপের অবশিষ্টাংশসহ উদ্ধার করে বলে আদালতে বর্ণনা করা হয়। অন্যদিকে প্রিওর পরিস্থিতি আরো কঠিন ছিল বলে প্রসিকিউটররা জানান। কারণ তিনি ওই দম্পতির সঙ্গে বসবাস করতেন এবং তার পাসপোর্ট ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র তাদের কাছে ছিল। লুবনার আইনজীবী নোয়াম বিয়ালে আদালতে দাবি করেন, তার মক্কেল মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন না। তিনি বলেন, লুবনা মানসিক চাপ, ভয় এবং স্বামীর প্রভাবের কারণে পরিস্থিতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন। 

বিবাদীপক্ষের যুক্তি ছিল, শুধু কারো স্ত্রী হওয়া বা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার কারণে তাকে অপরাধী করা যায় না। তবে প্রসিকিউটররা যুক্তি দেন, লুবনা শুধু উপস্থিত ছিলেন না; তিনি অপহরণ ও নির্যাতনের সময় সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন এবং প্রতিশোধের উদ্দেশ্য থেকেই ঘটনাগুলো ঘটেছে। জুরি শেষ পর্যন্ত প্রতিরক্ষা পক্ষের যুক্তি গ্রহণ করেনি এবং লুবনাকে চারটি অভিযোগেই দোষী সাব্যস্ত করে। এই মামলায় আবু চৌধুরীর বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের মে মাসের দুটি অপহরণের পাশাপাশি ২০২৩ সালের মার্চ মাসে কুইন্সে আরেকটি পৃথক অপহরণের অভিযোগ রয়েছে। তার বিচার পরবর্তী সময়ে হওয়ার কথা রয়েছে। 

ফেডারেল কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, অভিযুক্তরা একই বাংলাদেশি কমিউনিটির পরিচয় ব্যবহার করে ভুক্তভোগীদের ভয় দেখানো ও নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছিলেন। এ মামলা কুইন্সের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিরোধ, ব্যক্তিগত প্রতিশোধ ও বাস্তব জীবনের সহিংসতার সম্পর্ক নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। 

আইনের দৃষ্টিতে, যেসব আসামির বিচার এখনো শেষ হয়নি, তারা আদালতে দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হবেন। 

শেয়ার করুন