০৯ জুলাই ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ৬:০৬:১৫ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
অপহরণ ও নির্যাতন : লুবনা দুই অপহরণ মামলায় দোষী সাব্যস্ত নিউইয়র্কে ১ হাজার ২৫০ কিউনি শিক্ষার্থীর জন্য বিনামূল্যে অমনি কার্ড পাইলট কর্মসূচি মসজিদে ইসলামবিরোধী ও প্রাণনাশের হুমকিতে এক ব্যক্তি অভিযুক্ত সুলতানা রাজিয়া ও সৈয়দ রুবেল অপহরণ মামলায় দোষী সাব্যস্ত যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ বছর উদযাপনে ধর্মীয় ইতিহাস ঘিরে বিতর্ক দুর্বৃত্তের অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত নর্থ ইস্ট ফিলাডেলফিয়া ইসলামিক সেন্টার ওজনপার্কের বৈঠকখানা রেস্টুরেন্টে হাতবোমা নিক্ষেপ নিউইয়র্কে আইনশৃঙ্খলার উন্নয়নে ১০০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ঘোষণা কঠোর অভিবাসন নীতিতে বিপাকে মার্কিন নাগরিকদের বিদেশি স্বামী-স্ত্রী আগাম বন্যার পদধ্বনি, আশঙ্কার ছায়া চট্টগ্রাম-সিলেটে


বন্ড শুনানি ছাড়া ৯০ দিনের বেশি অভিবাসীদের আটক রাখা যাবে না
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৮-০৭-২০২৬
বন্ড শুনানি ছাড়া ৯০ দিনের বেশি অভিবাসীদের আটক রাখা যাবে না ইউএস ফিফথ সার্কিট কোর্ট অব আপিলস


যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ এক রায় দিয়েছে নিউ অরলিন্সভিত্তিক ইউএস ফিফথ সার্কিট কোর্ট অব আপিলস। রায়ে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে অভিবাসন অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া অনেক ব্যক্তিকে সরাসরি দীর্ঘমেয়াদি আটক রাখা যাবে না। সরকারকে তাদের ৯০ দিনের মধ্যে বন্ড শুনানির সুযোগ দিতে হবে, যাতে একজন বিচারক নির্ধারণ করতে পারেন ওই ব্যক্তি জামিনে মুক্তি পাওয়ার যোগ্য কি না। গত ২ জুলাই তিন বিচারকের একটি প্যানেল এ রায় দেয়। আদালত বলেছে, অভিবাসন মামলায় আটক ব্যক্তিদের সাংবিধানিক ন্যায়বিচারের অধিকার (ডিউ প্রসেস) রয়েছে এবং সরকার তাদের কোনো ধরনের বিচারিক শুনানির সুযোগ না দিয়ে অনির্দিষ্টকাল আটক রাখতে পারে না।

এ রায়টি সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের বাধ্যতামূলক অভিবাসী আটক নীতির ওপর বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। নতুন নীতির অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে অভিবাসন অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের বন্ড শুনানির সুযোগ না দিয়ে আটক রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। আদালতের রায়টি টেক্সাসে বসবাসকারী তিন অভিবাসী পুরুষের মামলার ভিত্তিতে এসেছে। তারা হলেন ইগনাসিও সোসনাভা রদ্রিগেজ, আলেহান্দ্রো ভিলেগাস অ্যাঞ্জেল এবং মিগেল অ্যাঞ্জেল গোমেজ আলভারাদো।

আদালতের নথি অনুযায়ী, তিনজনই এক দশকেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছিলেন। তারা আগে বৈধ অনুমতি ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন এবং পরে অভিবাসন মামলায় আটক হন। তারা দাবি করেন, তাদের বন্ড শুনানির সুযোগ না দিয়ে আটক রাখা সাংবিধানিক অধিকারের লঙ্ঘন। তিনজনই ফেডারেল জেলা আদালতে তাদের আটক চ্যালেঞ্জ করে সফল হন। পরে সরকার সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ফিফথ সার্কিট কোর্টে আপিল করে।

ফিফথ সার্কিট কোর্টের বিচারক লেসলি এইচ সাউথউইক, যিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারক, সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামত লিখেছেন। বিচারক সাউথউইক তার রায়ে বলেন, অভিবাসন আইনের নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নিয়ে সরকারের যুক্তি গ্রহণযোগ্য হলেও শুধু আইনের ব্যাখ্যার ভিত্তিতে সংবিধান প্রদত্ত ন্যায়বিচারের অধিকার অগ্রাহ্য করা যায় না।

তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে দীর্ঘদিন বসবাসকারী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে তাদের শারীরিক উপস্থিতি তাদের সাংবিধানিক সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। অভিবাসন অবস্থান অনিয়মিত হলেও তারা এমন কোনো ব্যক্তি নন যাদের কোনো বিচারিক সুরক্ষা ছাড়াই অনির্দিষ্টকাল আটক রাখা যাবে।

রায়ে তিনি বলেন, সরকারের কাছে কাউকে আটক রাখার ক্ষমতা থাকলেও সে ক্ষমতার ওপর সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং আটক ব্যক্তিকে অন্তত একজন বিচারকের সামনে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ দিতে হবে।

তবে আদালতের তিন বিচারকের প্যানেলে ভিন্নমতও ছিল। ট্রাম্পের নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারক কোরি টি. উইলসন একমাত্র ভিন্নমত প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বাদীপক্ষ প্রমাণ করতে পারেনি যে বন্ড শুনানি ছাড়া তাদের আটক রাখা সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন করেছে।বিচারক উইলসন তার মতামতে লিখেছেন, জেলা আদালতগুলো হেবিয়াস করপাসের মাধ্যমে যে স্বস্তি দিয়েছিল তা যথাযথ ছিল না এবং সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করা উচিত।

অন্যদিকে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারক জেমস ই গ্রেভস সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হলেও আটক ব্যক্তিদের জন্য আরো দ্রুত শুনানির পক্ষে মত দেন। তিনি বলেন, ৯০ দিন অপেক্ষা করার সময়সীমা আরো কম হওয়া উচিত। তার মতে, বর্তমানে আটক থাকা অভিবাসীদের ৩০ দিনের মধ্যে বন্ড শুনানির সুযোগ দেওয়া উচিত এবং ভবিষ্যতে আটক করার ক্ষেত্রেও আগেই যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইনে সাধারণত দুই ধরনের পরিস্থিতি বিবেচনা করা হতো। যারা সীমান্তে প্রবেশের সময় আটক হতেন, তাদের ক্ষেত্রে সরকার বাধ্যতামূলক আটক ব্যবস্থা প্রয়োগ করতে পারত। কিন্তু যারা দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করার পর অভিবাসন কর্মকর্তাদের হাতে আটক হতেন, তারা সাধারণত বন্ড শুনানির সুযোগ পেতেন।

বন্ড শুনানিতে বিচারক বিবেচনা করতেন, ওই ব্যক্তি সমাজের জন্য হুমকি কিনা বা পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে কি না। যদি তাকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে না করা হতো, তাহলে মামলা চলাকালে জামিনে মুক্তি পাওয়ার সুযোগ থাকত। কিন্তু ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) নতুন নীতি গ্রহণ করে। এতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ অনুমতি ছাড়া থাকা সব অভিবাসীকে এমন একটি শ্রেণিতে রাখা হবে যেখানে তারা বন্ড শুনানির সুযোগ পাবেন না।

এ নীতির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্টে একাধিক মামলা দায়ের হয়। অভিবাসন অধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হওয়ার পর হাজার হাজার আটক অভিবাসী বাধ্যতামূলক আটক নীতির বিরুদ্ধে আদালতে আবেদন করেছেন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন আটক কেন্দ্রগুলোতে থাকা মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাইডেন প্রশাসনের শেষ দিকে যেখানে আটক অভিবাসীর সংখ্যা ৪০ হাজারের নিচে ছিল, পরে তা বেড়ে ৬০ হাজারের বেশি হয়েছে। এ রায়ের প্রভাব বিশেষ করে টেক্সাস, লুইজিয়ানা এবং মিসিসিপি স্টেটে পড়বে, কারণ এসব এলাকায় ফিফথ সার্কিট কোর্টের এখতিয়ার রয়েছে এবং সেখানে বিপুল সংখ্যক অভিবাসী আটক রয়েছেন।

মামলায় অভিবাসীদের পক্ষে যুক্তি দেওয়া ন্যাশনাল ইমিগ্রেশন প্রজেক্টের সিনিয়র অ্যাটর্নি এলি নর্টন বলেন, এ সিদ্ধান্ত হাজার হাজার আটক অভিবাসীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনবে। তিনি বলেন, ইগনাসিও, আলেহান্দ্রো এবং মিগেল দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী পরিবারপ্রধান। তাদের মামলার মাধ্যমে আদালতকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে, সরকার কোনো ধরনের বিচারিক যাচাই ছাড়া কাউকে আটক রাখতে পারে কিনা।

অন্যদিকে ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস) এ রায়ের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি বলেছে, বাধ্যতামূলক আটক নীতির পক্ষে তাদের আইনি অবস্থান শক্তিশালী এবং তারা এ বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ বিবেচনা করছে। ডিএইচএস ইতোমধ্যে একই ধরনের একটি মামলায় ইউএস সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে ফিফথ সার্কিট কোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে আপিল করবে কিনা, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

আদালতের এ সিদ্ধান্তের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন আটক ব্যবস্থা, সরকারের ক্ষমতা এবং আটক ব্যক্তিদের সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে নতুন করে আইনি লড়াই শুরু হতে পারে। অভিবাসন অধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এ রায়ের মূল বার্তা হলো অভিবাসন মামলায় জড়িত হলেও কোনো ব্যক্তির মৌলিক সাংবিধানিক অধিকার বাতিল হয় না এবং আটক রাখার আগে সরকারের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

শেয়ার করুন