ইউএস আর্মি
যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধকালীন সামরিক ড্রাফট বা বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার জন্য যোগ্য পুরুষদের নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় বড় পরিবর্তন আসছে। সামরিক বাহিনীতে জনবল বাড়ানোর লক্ষ্যে আগামী ডিসেম্বর থেকে দেশজুড়ে তরুণদের নাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামরিক সেবার জন্য নিবন্ধিত করা হবে। ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ নির্দিষ্ট বয়স ও যোগ্যতাসম্পন্ন সব মার্কিন তরুণ এ প্রক্রিয়ার আওতায় আসবেন। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ১৮ থেকে ২৬ বছর বয়সী যোগ্য পুরুষদের আর আলাদাভাবে আবেদন করে নিবন্ধন করতে হবে না; বরং তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামরিক ড্রাফটের ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত হবেন। সরকারি সূত্রে জানা গেছে, এ পরিবর্তন আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কার্যকর হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সিলেকটিভ সার্ভিস সিস্টেম এ নিবন্ধন ব্যবস্থার দায়িত্বে রয়েছে। সংস্থাটি ইতোমধ্যে নতুন নিয়ম বাস্তবায়নের জন্য একটি প্রস্তাব অফিস অব ইনফরমেশন অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্সে জমা দিয়েছে, যা বর্তমানে পর্যালোচনাধীন। এ পরিবর্তনের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে ব্যয় কমানো এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করার কথা বলা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় বিভিন্ন সরকারি ডাটাবেস থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য সংগ্রহ করে যোগ্য ব্যক্তিদের নিবন্ধন সম্পন্ন করা হবে। ফলে ব্যক্তিগতভাবে ফরম পূরণ করে নিবন্ধনের প্রয়োজন থাকবে না।
এ নীতিগত পরিবর্তনটি ২০২৬ অর্থবছরের ন্যাশনাল ডিফেন্স অথরাইজেশন অ্যাক্টের অংশ হিসেবে অনুমোদিত হয়েছে, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আইনে স্বাক্ষর করেন। এই আইনের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় নিবন্ধন ব্যবস্থার অনুমোদন দেওয়া হয়।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, যোগ্য পুরুষদের ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিলেকটিভ সার্ভিস সিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং তাদের লিখিতভাবে বিষয়টি জানানো হবে। এটি বর্তমান ব্যবস্থার তুলনায় একটি বড় পরিবর্তন, যেখানে নাগরিকদের নিজ উদ্যোগে অনলাইনে গিয়ে নিবন্ধন করতে হয়।বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী পুরুষ নাগরিকদের জন্য সিলেক্টিভ সার্ভিসে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। তবে ১৯৭৩ সালের পর থেকে দেশটিতে কোনো সক্রিয় সামরিক ড্রাফট চালু হয়নি এবং সামরিক বাহিনী সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবী ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে।
নতুন নিয়মে কিছু ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে। যারা ১৮ থেকে ২৬ বছর বয়স পর্যন্ত পুরো সময় হাসপাতালে ভর্তি, কারাগারে আটক বা বিশেষভাবে ঘরবন্দি অবস্থায় থাকবেন, তারা নিবন্ধন থেকে অব্যাহতি পাবেন। এছাড়া যারা প্রমাণ করতে পারবেন যে তারা দীর্ঘ সময় এমন অবস্থায় ছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় বিবেচনা করা হবে। এ পরিবর্তনের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে আবারও সামরিক ড্রাফট চালুর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, বর্তমানে ড্রাফট পুনরায় চালুর কোনো পরিকল্পনা নেই, তবুও ভবিষ্যতের জন্য বিষয়টি পুরোপুরি বাতিল করা হয়নি।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, সামরিক ড্রাফট বর্তমানে প্রশাসনের পরিকল্পনায় নেই। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় সব বিকল্প খোলা রাখা হয়। তার এ মন্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। আইন অনুযায়ী, শুধু প্রেসিডেন্ট এককভাবে ড্রাফট চালু করতে পারেন না। এজন্য কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন এবং বিদ্যমান মিলিটারি সিলেকটিভ সার্ভিস অ্যাক্ট সংশোধন করতে হয়। ফলে এটি একটি জটিল আইনগত প্রক্রিয়া।
তবে ড্রাফট নিবন্ধন না করা যুক্তরাষ্ট্রে একটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। যারা নিবন্ধন করতে ব্যর্থ হন, তারা ফেডারেল শিক্ষাঋণ, সরকারি চাকরি এবং বিভিন্ন প্রশিক্ষণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে এটি নাগরিকত্ব প্রক্রিয়াতেও প্রভাব ফেলে। এছাড়া সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং বড় অঙ্কের জরিমানার বিধান রয়েছে। অভিবাসীদের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব রয়েছে। নিবন্ধন না করলে নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়ায় জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব হারানোর ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, নারীরা সামরিক ড্রাফটের আওতায় নেই। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আইন প্রণেতাদের একটি অংশ নারীদেরও এ ব্যবস্থার আওতায় আনার প্রস্তাব দিয়েছে, তবে তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে নারীরা স্বেচ্ছায় সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে পারেন এবং সক্রিয় যুদ্ধে অংশ নিতে পারেন।নতুন ব্যবস্থার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬টিরও বেশি অঙ্গরাজ্যে ইতোমধ্যে ড্রাইভিং লাইসেন্স বা স্টেট আইডি তৈরির সময় স্বয়ংক্রিয় নিবন্ধনের সুবিধা চালু হয়েছে। ফলে নতুন নিয়ম কার্যকর হলে প্রক্রিয়াটি আরো কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত হবে।
এ পরিবর্তন মূলত প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে আনা হলেও এর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে সামরিক প্রস্তুতি ও ড্রাফট ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা আবারও সামনে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রে সর্বশেষ সামরিক ড্রাফট চালু ছিল ১৯৭৩ সালে, ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়। এরপর থেকে স্বেচ্ছাসেবী সামরিক ব্যবস্থা চালু রয়েছে। তবে জরুরি পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ও কংগ্রেসের অনুমোদন সাপেক্ষে লটারির মাধ্যমে নাগরিকদের ড্রাফটের আওতায় আনার ব্যবস্থা রয়েছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ভবিষ্যতে ড্রাফট চালু হলে নিবন্ধিত ব্যক্তিদের মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে নির্বাচন করা হবে। পরে নির্বাচিতদের শারীরিক, মানসিক ও নৈতিক যোগ্যতা যাচাই করে সামরিক সেবার জন্য চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা হবে।সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রে স্বয়ংক্রিয় সামরিক ড্রাফট নিবন্ধন ব্যবস্থা একটি বড় নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে দেশটির প্রতিরক্ষা নীতি ও জনমনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।