২০২৩ সালের নভেম্বরে ভারমন্টের বার্লিংটনে গুলিবিদ্ধ তিন ফিলিস্তিনি কলেজ শিক্ষার্থী বাম থেকে তাহসিন আলী আহমাদ, কিনান আবদেলহামিদ ও হিশাম আওয়ারতানি
যুক্তরাষ্ট্রের ভারমন্ট স্টেটের বার্লিংটনে তিন ফিলিস্তিনি কলেজ শিক্ষার্থীকে গুলি করার ঘটনায় প্রায় তিন বছরমামলা চলার পর আসামি জেসন ইটনকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেছে জুরি। গত ২১ সেপ্টেম্বরের এই রায় ২০২৩ সালের নভেম্বরে সংঘটিত বহুল আলোচিত হামলার বিচারিক প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি হিসেবে এসেছে।
২০২৩ সালের ২৫ নভেম্বর থ্যাঙ্কসগিভিং ছুটির সপ্তাহান্তে ২০ বছর বয়সী কিনান আবদেলহামিদ, তাহসিন আলী আহমাদ ও হিশাম আওয়ারতানি বার্লিংটনে হাঁটছিলেন। তারা ফিলিস্তিনি জাতীয় পোশাক কেফিয়েহ পরা ছিলেন এবং ইংরেজি ও আরবি ভাষায় কথা বলছিলেন। এ সময় নিজেদের অ্যাপার্টমেন্টের কাছ থেকে তাদের দেখতে পান আসামি জেসন ইটন।
অভিযোগ অনুযায়ী, ইটন শিক্ষার্থীদের দিকে এগিয়ে গিয়ে কাছ থেকে গুলি করেন। এতে তিনজনই আহত হন। হিশাম আওয়ারতানি গুরুতরভাবে আহত হয়ে কোমর থেকে নিচের অংশে স্থায়ীভাবে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হন। ১৪ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া বিচারে ইটনের আইনজীবীরা দাবি করেন, হামলার সময় তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন এবং বিভ্রমের মধ্যে বিশ্বাস করেছিলেন যে তাকে ওই তিন শিক্ষার্থীকে গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই বলা হয়ে আসছে, হামলার পেছনে ফিলিস্তিনিবিরোধী বিদ্বেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
বিচারে প্রসিকিউশন ইটনের ব্যবহৃত কিছু বর্ণনাও তুলে ধরে। সেখানে শিক্ষার্থীদের কেফিয়েহ পরা নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য এবং তাদের সন্ত্রাসীর মতো পোশাক পরা বলে উল্লেখ করার বিষয় আসে।রায়ের পর তিন শিক্ষার্থীর পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, এই রায় হামলার ক্ষত বা পরিবারের দীর্ঘদিনের মানসিক যন্ত্রণা মুছে দিতে পারবে না। তবে এটি নিশ্চিত করেছে যে জেসন ইটন তার কর্মকাণ্ডের জন্য দায়ী।
হিশাম আওয়ারতানির মা এলিজাবেথ প্রাইস বলেন, বিচারের সময় তাদের ছেলেদের সম্পর্কে ইটনের ঘৃণামূলক মন্তব্য বারবার শুনতে হয়েছে। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের ছেলেরা কেন হামলার শিকার হয়েছিল, সে বিষয়ে তাদের কাছে ইটনের নিজের বক্তব্যই যথেষ্ট ছিল।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম, আরব ও ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বৈষম্য, ঘৃণামূলক বক্তব্য ও সহিংসতার অভিযোগ বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটেও এই মামলাটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। নাগরিক অধিকার সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস বা সিএআইআর ওই সময় এ ধরনের অভিযোগের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির কথা জানিয়েছিল।
রায়ের পর ভারমন্টের ফিলিস্তিনপন্থী বিভিন্ন সংগঠনও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ভারমন্ট কোয়ালিশন ফর প্যালেস্টিনিয়ান লিবারেশন ইটনের হামলাকে ঘৃণাজনিত অপরাধ হিসেবে বর্ণনা করে এবং তিন শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের পাশে স্থানীয় জনগণের দীর্ঘদিনের সংহতির কথা উল্লেখ করেছে।
বিচার চলাকালে আদালতে উপস্থিত কয়েকজন সমর্থকের কেফিয়েহ পরা নিয়েও বিতর্ক হয়। আসামি পক্ষের যুক্তির পর বিচারক আদালতকক্ষে কেফিয়েহ পরার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেন, কারণ এতে জুরিদের ওপর প্রভাব পড়তে পারে বলে দাবি করা হয়েছিল।তিন শিক্ষার্থীর পরিবার জানিয়েছে, সন্তানদের সুস্থ হয়ে ওঠার লড়াইয়ের সঙ্গে একই সময়ে গাজা ও পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান সহিংসতা ও মানবিক বিপর্যয়ের খবরও তাদের দেখতে হয়েছে। তারা স্থানীয় সম্প্রদায় ও সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।
ইটনের বিরুদ্ধে এই রায় অবশ্য ফিলিস্তিন ইস্যু ঘিরে ভারমন্টের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের অবসান ঘটায়নি। ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠনগুলো বলছে, তারা ভবিষ্যতেও ‘অ্যাপার্টহাইড ফ্রি কমিউনিটিজ’ উদ্যোগ এবং ইসরায়েলবিরোধী বয়কট, ডিভেস্টমেন্ট অ্যান্ড স্যাংশনস বা বিডিএস আন্দোলন চালিয়ে যাবে।তবে মামলার বিচারিক রায়ের মূল বিষয় হলো, তিন বছর আগে গুলিবিদ্ধ তিন তরুণের ওপর হামলার ঘটনায় জুরি জেসন ইটনকে হত্যাচেষ্টার জন্য দোষী সাব্যস্ত করেছে।