শিক্ষাবিদ শায়মা আলজুবি
মুসলিম ও ফিলিস্তিনি বংশগতির কারণে ডানপন্থী অনলাইন সমালোচনা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাপের কারণে পদ হারানোর অভিযোগ তুলে টেক্সাসের এক মুসলিম নারী শিক্ষাবিদ শায়মা আলজুবি ফোর্ট ওয়ার্থ ইন্ডিপেনডেন্ট স্কুল ডিস্ট্রিক্টের বিরুদ্ধে ফেডারেল আদালতে মামলা করেছেন। তার অভিযোগ, ওয়েস্টার্ন হিলস হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগের পর তার ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে স্কুল ডিস্ট্রিক্ট তাকে পদ থেকে সরিয়ে দেয়।
শায়মা আলজুবি, যিনি মুসলিম এবং হিজাব পরেন, আগে ফোর্ট ওয়ার্থের সাউথওয়েস্ট হাই স্কুলে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। চলতি বছরের মে মাসে তাকে ওয়েস্টার্ন হিলস হাই স্কুলের নতুন প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ঘোষণা দেয় ফোর্ট ওয়ার্থ ইনডিপেনডেন্ট স্কুল ডিস্ট্রিক্ট।
নিয়োগ ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। সমালোচকদের একটি অংশ তার অতীতের কিছু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট তুলে ধরে, যেখানে ফিলিস্তিনি পতাকার ছবি, অভিবাসীদের সমর্থন এবং ডাকা সুবিধাভোগীদের পক্ষে বক্তব্য ছিল বলে অভিযোগ করা হয়।
এরপর ফোর্ট ওয়ার্থ ইনডিপেনডেন্ট স্কুল ডিস্ট্রিক্টে জানায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত আলজুবিকে অন্য পদে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবে আলজুবির আইনজীবীদের দাবি, স্কুল জেলার সিদ্ধান্তের প্রকৃত কারণ কোনো নীতিমালা লঙ্ঘন নয়; বরং অনলাইন ট্রল এবং ডানপন্থী রাজনৈতিক চাপ। তারা অভিযোগ করেছেন, আলজুবির সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে।
আলজুবি ইউএস ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট অব নর্দার্ন টেক্সাস আদালতে মামলা করেছেন। ৯ জুলাই দাখিল করা মামলার নথিতে তার আইনজীবীরা অভিযোগ করেন, ফোর্ট ওয়ার্থ ইন্ডিপেনডেন্ট স্কুল ডিস্ট্রিক্ট তার প্রথম সংশোধনী অধিকার অর্থাৎ মত প্রকাশের স্বাধীনতা লঙ্ঘন করেছে। একই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর সমান সুরক্ষা বিধান লঙ্ঘনের অভিযোগও এনেছেন। মামলায় আলজুবিকে অবিলম্বে ওয়েস্টার্ন হিলস হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের পদে পুনর্বহাল এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
আলজুবির আইনজীবীরা আদালতের নথিতে উল্লেখ করেছেন, স্কুল ডিস্ট্রিক্টের কর্মচারী নীতিমালায় বলা আছে, কোনো কর্মচারির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার যদি তার পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করে, তবে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তবে তাদের দাবি, এই নীতিমালা আলজুবির ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সময়ে করা সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত মত প্রকাশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে।
মামলার নথিতে বলা হয়েছে, অনলাইন প্রভাবশালীদের প্রচারণার পরই স্কুল ডিস্ট্রিক্ট কর্তৃপক্ষ আলজুবির নিয়োগ পুনর্বিবেচনা করে। আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এর ফলে তার পেশাগত অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং তার সুনামের ক্ষতি হয়েছে। আদালতের নথি অনুযায়ী, ১৭ জুন ডিস্ট্রিক্ট কর্মকর্তারা আলজুবিকে তার কিছু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এসব পোস্টের মধ্যে ছিল মুসলিমদের জন্য শরিয়া আইনের অর্থ ব্যাখ্যা করা এবং ডাকা সুবিধাভোগীদের সমর্থনে বক্তব্য। তার আইনজীবীদের দাবি, মে মাসের ৩১ তারিখের আগে আলজুবির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কার্যক্রম নিয়ে স্কুল ডিস্ট্রিক্টের কাছে কোনো অভিযোগ জমা পড়েনি।
ঘটনাটি টেক্সাসজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি করেছে। আলজুবিকে পদ থেকে সরানোর পর টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে এ সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন। তিনি বলেন, টেক্সাসের মূল্যবোধ ও আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো আচরণ গ্রহণযোগ্য নয় এবং এ ধরনের ব্যক্তির স্কুল প্রধান হওয়া উচিত নয়। অন্যদিকে মুসলিম অধিকার সংগঠনগুলো আলজুবির পক্ষে আইনি সহায়তা দিচ্ছে।
এদিকে ফোর্ট ওয়ার্থ স্কুল ডিস্ট্রিক্ট এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা সব কর্মচারী, শিক্ষার্থী ও পরিবারের জন্য আস্থা, স্বচ্ছতা ও সম্মানের পরিবেশ বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।স্কুল ডিষ্ট্রিক্ট কর্তৃপক্ষ বলেছে, প্রকাশ্যে উত্থাপিত বিষয়গুলো নিয়ে তারা নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পর্যালোচনা করেছে। তবে কর্মচারীদের ব্যক্তিগত বিষয় গোপনীয় হওয়ায় তারা নির্দিষ্ট তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করবে না। আলজুবি বর্তমানে জেলা পর্যায়ে প্রধান শিক্ষক কর্মসূচি প্রশাসক হিসেবে কাজ করছেন। তবে আলজুবি বলেছেন, তিনি ওই পদ গ্রহণ করতে চান না এবং ওয়েস্টার্ন হিলস হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে পুনর্বহাল হতে চান।এদিকে, একই অনলাইন প্রচারণার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অভিযোগের পর আরেকজন ফোর্ট ওয়ার্থ স্কুল কর্মকর্তা আর্নি মরানকেও তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। আলজুবির মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, তাকে তার মুসলিম ধর্মীয় পরিচয় ও ফিলিস্তিনি বংশগতির কারণে বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে।