০৩ জুন ২০২৬, বুধবার, ০৪:০৯:২৭ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
আরবি ভাষা ও শিক্ষা যুক্তরাষ্ট্রে জনপ্রিয় হচ্ছে গ্রিনকার্ডের আবেদন নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অপব্যাখ্যার পর পুনঃব্যাখ্যা, মামলার প্রস্তুতি বিশ্ব কূটনীতির সর্বোচ্চ মঞ্চে আবারো বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন ভিসা : দুইবারের বেশি দূতাবাসে যেতে হবে না অনলাইন জুয়ার বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে বড়রা এ প্রজন্মকে হাটে নিয়ে বিক্রি করে দিয়েছে খালেদা জিয়ার নামে নামকরণ : তারেক রহমানের ‘না’ সাক্ষাৎকার ছাড়াই দ্রুত আশ্রয় আবেদন বাতিলের পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রশাসনের নিউ জার্সির আইস ডিটেনশন সেন্টারে অমানবিক আচরণের অভিযোগ শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আজ ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী


ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ-১৩
দেবতার নগরী ডেলফি
হাবিব রহমান
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৩-০৬-২০২৬
দেবতার নগরী ডেলফি দেবতার নগরী ডেলফি


ভোরের আলো তখন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে প্রাচীন শহর অ্যাথেন্সের আকাশে। শহরের কোলাহল তখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। আমরা রওনা হলাম গ্রিসের আরেক কিংবদন্তি-দেবতার নগরী ডেলফি দেখতে। (Archaeological site of Delph)

অ্যাথেন্স থেকে প্রায় দুই ঘণ্টার পথ। গাড়ি শহর ছেড়ে পাহাড়ি পথে উঠতেই দৃশ্য বদলে গেল। দুই পাশে অলিভ গাছের বাগান, দূরে পাহাড়ের ধূসর রেখা। আমার সঙ্গে ছিলেন তরুণী গ্রিক গাইড সোফিয়া। গাড়ির জানালা দিয়ে পাহাড় দেখিয়ে সে বললো, ডেলফি শুধু একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান নয়। প্রাচীন গ্রিকরা বিশ্বাস করত এটি পৃথিবীর কেন্দ্র।

আমি অবাক হয়ে বললাম, পৃথিবীর কেন্দ্র? সে হাসলো-হ্যাঁ। এখানে ছিল দেবতা অ্যাপোলোর পবিত্র মন্দির এবং বিখ্যাত ওরাকল। কিছুক্ষণ পর আমরা পৌঁছে গেলাম পারনাসাস পাহাড়ের ঢালে অবস্থিত ছোট শহর ডেলফিতে। উঁচু পাহাড় আর গভীর উপত্যকার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে ডেলফির ধ্বংসাবশেষ। চারদিকে এমন এক নীরবতা, যেন হাজার বছরের ইতিহাস এখনো বাতাসে ভাসছে।

এ ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণেই ইউনেসকো ১৯৮৭ সালে ডেলফিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। সোফিয়া বললো, প্রাচীন গ্রিসে রাজা, সেনাপতি, এমনকি সাধারণ মানুষও বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এখানে আসতো। আমরা ধীরে ধীরে পাহাড়ি পথ ধরে উঠতে লাগলাম। সামনে দেখা গেল প্রাচীন স্তম্ভের সারি-এটাই বিখ্যাত ডেলফির অ্যাপোলো টেম্পল (Temple of Apollo at Delphi)।

সোফিয়া জানায়, খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতক থেকে এখানে দেবতা অ্যাপোলোর পূজা হতো। মন্দিরের ভেতরে বসতেন পুরোহিতী ‘পিথিয়া’-যিনি দেবতার বাণী শুনে ভবিষ্যদ্বাণী করতেন। আমি চারদিকে তাকিয়ে বললাম, অদ্ভুত এক পরিবেশ। সোফিয়া মৃদু হেসে বললো, অনেকেই এখানে এসে এমনটাই অনুভব করেন।

মন্দিরের পাশ দিয়ে উপরে উঠলে দেখা যায়, প্রাচীন স্টেডিয়াম। এখানেই অনুষ্ঠিত হতো পিথিয়ান গেমস, যা ছিল অলিম্পিকের মতো একটি বড় ক্রীড়া উৎসব। দূরে পাহাড়ের নিচে বিস্তৃত উপত্যকা। অলিভ গাছের সবুজ সমুদ্রের মতো দৃশ্য। আমি বললাম, এমন জায়গায় বসে ভবিষ্যদ্বাণী করলে তো সত্যিই দেবতার কণ্ঠস্বর শোনা যায় মনে হয়। সোফিয়া বললো, হয়তো সেই রহস্যই ডেলফিকে এতো বিখ্যাত করেছে।

ভ্রমণ শেষে আমরা একটি ছোট পাহাড়ি রেস্টুরেন্টে বসলাম। সামনে পুরো উপত্যকা দেখা যায়। সোফিয়া অর্ডার করলো গরম গ্রিক খাবার-গ্রিলড মাছ, সালাদ আর অলিভ অয়েল। খেতে খেতে সোফিয়া বললো, ডেলফি আমার প্রিয় জায়গা। এখানে এলে মনে হয় ইতিহাসের সঙ্গে কথা বলা যায়। আমি বললাম, আজ মনে হচ্ছে শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থান দেখলাম না, যেন দুই হাজার বছরের গল্প শুনে ফেললাম।

বিকালের দিকে এথেন্সে ফেরার জন‍্য আমরা গাড়িতে উঠলাম। পাহাড়ের গায়ে তখন সূর্যের শেষ আলো পড়ছে। মনে হচ্ছিলো সভ্যতার অনেক গল্প সময়ের স্রোতে হারিয়ে যায়। কিন্তু কিছু জায়গা আছে, যেখানে ইতিহাস এখনো জীবন্ত। ডেলফি তেমনই এক জায়গা, যেখানে পাহাড়, মন্দির আর বাতাসের নীরবতায় এখনো শোনা যায় প্রাচীন দেবতার কণ্ঠস্বর।

ফিরে আসতে আসতে মনে হলো, মানুষ ইতিহাস পড়ে, কিন্তু ডেলফিতে এসে ইতিহাসকে অনুভব করা যায়।

শেয়ার করুন